কাজী আরেফ: মুক্তিযুদ্ধের চেতনার চিরবাহক

ফেব্রুয়ারির ১৬ তারিখ আমাদের পারিবারিক জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ দিন। ১৯৯৯ সালের এই দিনে আমার বাবা কাজী আরেফ আহমেদ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের কালিদাসপুর বাজারে প্রকাশ্য জনসভায় চার রাজনৈতিক সহযোগীসহ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন তিনি। কিছু ঘটনা রাজনৈতিক ইতিহাস বলার ক্ষমতা রাখে। কখনও প্রত্যক্ষ, কখনও পরোক্ষভাবে। এ রকম ঘটনার তীব্রতা সব সময় বেশির ভাগ মানুষ বুঝতে পারে না। বুঝতে পারলে জীবনের পথচলা সহজ হতো। তৎকালে নৃশংস ঘটনাটি প্রচণ্ড আলোড়নের সৃষ্টি করে। দেশের বড় বড় মন্ত্রীর আমাদের বাসায় আসা ছিল সাধারণ ব্যাপার। ধীরে ধীরে আমাদের পরিবারকে কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে হয়। পরিচিতদের মুখোশের আড়ালের চেহারা সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার সুযোগ হয়। যেসব চেহারা সব সময় সৌজন্যভরা হাসি দিয়ে আতিথেয়তা করত, সেসব চেহারা হঠাৎ কঠোরভাবে অপমানজনক হয়ে উঠল। হয়তো এরই নাম বাস্তবতা। অদ্ভুত এক চক্র। কখনও চারপাশের মানুষ রূঢ় আচরণ করবে, কখনও করব আমরা। এভাবেই হয়তো জীবনযাপন সহজ হয়। যাই হোক, মনে রাখতে হবে, কাজী আরেফ আহমেদের নামের সঙ্গে রয়েছে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক।

যেই প্রজন্ম ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ দেখেছে, তারা আপনাদের চোখ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ এবং রাজনীতিকে খোঁজার চেষ্টা করছে। কিন্তু তারা কী দাবি করে? তারা শুনেছে মূলত দলীয় ও ব্যক্তিগত স্বার্থের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। তাহলে কি তাদের মিথ্যাবাদী বলা যায়? মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কি এভাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে লাঞ্ছিত হয়, নিপীড়িত হয়? তাহলে আমার বাবার সম্মানটুকু বাঁচল কোথায়? জাতীয় পতাকার রূপকার হলে কখনও কখনও বৈপ্লবিক প্রথাগতভাবে জাতীয় পতাকার রূপকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক ও বাহক হয়ে ওঠেন। যদিও সাধারণত এ রকম মানুষ রাজনীতির পরোক্ষ নিয়ন্ত্রক হন; প্রকাশ্যে নয় এবং এ রকম মানুষ পরিচিতি হয় কিংমেকার হিসেবে। এই অবস্থায় এমন একজন মানুষের সহযোদ্ধাদের ইতিহাস নিয়ে স্বার্থপর আচরণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও প্রজন্মের অর্জনকে অস্পষ্ট করে দেয়। যেই প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি, তারা যদি আমার বাবার মুক্তিযুদ্ধের অবদানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তাহলে এই প্রজন্মকে কি দোষ দেওয়া যায়? ওরা কীভাবে বুঝবে আস্থা ও বিশ্বাসের অবস্থান?

আমার বাবার জীবনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অর্জন সম্ভবত নিউক্লিয়াসের অংশ হওয়া। এ রকম বন্ধুত্বের খোঁজ পাওয়াই জীবনের বিশাল সফলতা। যদিও সিরাজুল আলম খানের রাজনৈতিক অবস্থানই নিউক্লিয়াস নামে পরিচিত। যেখান থেকে বাংলাদেশের বিখ্যাত রাজনৈতিক তরুণ নেতৃত্ব আবদুর রাজ্জাকের পরিণত রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা। এর মধ্যে আমার বাবার অবস্থান অনেকটা নিঃশব্দ। কিন্তু সেটা কি অসাধারণ বিপ্লবী আচরণে মহিমান্বিত বা সম্মানিত নয়? ঐতিহাসিক সফলতা মানুষ বন্ধুত্বের মাধ্যমেই অর্জন করে নেয়। এই পিছিয়ে থাকা রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়; রাজনৈতিক বাস্তবতা। নিদারুণ বাস্তবতাকে সামলে প্রগতির পথে অবিচল থাকা অসাধারণ খেলোয়াড়ি কৌশল বা শৈল্পিক বিমূর্ততার চেয়ে কম নয়।

ঐতিহাসিক অর্জনকে পরীক্ষা দিতেই হয় বারবার। বিশেষ করে যারা ওই ঐতিহাসিক অর্জনের সময় জন্মায়নি, কিন্তু ওই ঐতিহাসিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভেতর প্রজন্মান্তরে বড় হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের স্পষ্ট দায়িত্ববোধের খোঁজে প্রশ্ন করার পূর্ণ অধিকার এই প্রজন্মের আছে। কারণ, প্রগতির চেতনা সম্পূর্ণ করার অধিকার ও দায়িত্ব রাজনৈতিক ধারাবাহিকায় এই প্রজন্মের ওপরেই চলে আসে।

আপনারা নিশ্চয় শুনেছেন, ‘ইতিহাস প্রশ্ন করে।’ বিপ্লবের ঐতিহাসিক অর্জন ‘স্বাধীনতার’ স্নিগ্ধ নিরাপত্তার চাদরে বড় হওয়া প্রজন্মের মাধ্যমেই ‘ইতিহাস প্রশ্ন করে’; এটা কোনো কথার কথা নয়। যেমন সাংবিধানিক নিরাপত্তা কোনো কথার কথা নয়। সাংবিধানিক নিরাপত্তা সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মতো কঠোর বাস্তব।

দলীয় আর ব্যক্তিগত স্বার্থের ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চা’ আজ রাজনৈতিক ধ্বংসের মুখে নিয়ে এসেছে। এই ক্রান্তিকালে সততার সঙ্গে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চা করুন। কারণ, সততার কখনও সম্মানের অভাব হয় না। যার উদাহরণ আমার বাবার জীবন। ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে সম্মানের অর্জনই একমাত্র যৌক্তিক রাজনীতি।

কাজী আসিফ ইমরান অরূপ: কাজী আরেফ আহমেদের সন্তান

এস/ভি নিউজ

পূর্বের খবরবঙ্গবন্ধুর চাওয়া পুলিশ আমরা গড়তে পেরেছি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
পরবর্তি খবরআজকের রাশিফল