উপজেলা নির্বাচন ঘিরে সরগরম দেশ

আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারাদেশ সরগরম। প্রতিটি উপজেলায়ই এবার প্রার্থীর ছড়াছড়ি। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এবার দলীয়ভাবে কাউকে প্রার্থী করছে না। প্রার্থিতা উন্মুক্ত থাকা এবং কাউকে নৌকা প্রতীক না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দলের স্থানীয় নেতারা যে যার মতো করে নির্বাচন করছেন। এ পরিস্থিতিতে অন্যান্য দল ও দল না করা যোগ্য প্রার্থীরাও নির্বাচন করছেন। তবে প্রকাশ্যে না করলেও তলে তলে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপিও। নির্বাচনকে সামনে রেখে সকল প্রার্থীই এখন সরব। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রত্যাশা, ভোটের পরিবেশ ভালো থাকবে।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর উপজেলা পরিষদ নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই প্রতিটি এলাকায় সরাসরি স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন ও বিভিন্ন জনসম্পৃক্ত কাজ করে থাকে। এ কারণে সবাই চায় তাদের পছন্দের প্রার্থী উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হোক। তাই এ নির্বাচন সবসময়ই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়। এবার স্বতন্ত্র প্রার্থীর আধিক্য থাকছে বিধায় অন্যান্যবারের চেয়ে বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে।

এবার সারাদেশে চার ধাপে অনুষ্ঠিত হচ্ছে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। প্রথম ধাপের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ৪ মে। দ্বিতীয় ধাপে নির্বাচন ১১ মে, তৃতীয় ধাপে ১৮ মে ও ২৫ মে চতুর্থ ধাপের উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে নির্বাচনের সময় এখনো কিছুটা দূরে থাকলেও প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে।

৪ মে প্রথম ধাপে ভোট হবে ১০৮ উপজেলায়। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল, কালাই ও আক্কেলপুর, বগুড়ার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও গাবতলী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল, গোমস্তাপুর ও ভোলাহাট, নওগাঁর ধামইরহাট, পত্নীতলা, মহাদেবপুর ও বদলগাছী, রাজশাহীর গোদাগাড়ী ও তানোর, নাটোরের নাটোর সদর, নলডাঙ্গা ও সিংড়া, সিরাজগঞ্জের সিরাজগঞ্জ সদর, কাজীপুর ও বেলকুচি, পাবনার সাঁথিয়া, সুজানগর ও বেড়া, পঞ্চগড়ের পঞ্চগড় সদর, তেঁতুলিয়া ও আটোরিয়া, ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী ও হরিপুর, নীলফামারীর ডোমার ও ডিমলা, দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট, হাকিমপুর ও বিরামপুর, লালমনিরহাটের পাটগ্রাম ও হাতীবান্ধা, রংপুরের কাউনিয়া ও পীরগাছা, কুড়িগ্রামের রৌমারী, চর রাজিবপুর ও চিলমারী, গাইবান্ধার সাঘাটা ও ফুলছড়ি, মেহেরপুরের মেহেরপুর সদর ও মুজিবনগর, কুষ্টিয়ার খোকসা, কুষ্টিয়া সদর ও কুমারখালী, চুয়াডাঙ্গার জীবননগর ও দামুড়হুদা, ঝিনাইদহের ঝিনাইদহ সদর ও কালীগঞ্জ, যশোরের মনিরামপুর ও কেশবপুর, মাগুরার মাগুরা সদর ও শ্রীপুর, নড়াইলের কালিয়া, বাগেরহাটের বাগেরহাট সদর, রামপাল ও কচুয়া, সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ ও শ্যামনগর, বরিশালের বরিশাল সদর ও বাকেরগঞ্জ, পিরোজপুরের মঠবাড়ীয়া ও ভান্ডারিয়া, ঢাকার দোহার, নবাবগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জ, গোপালগঞ্জের গোপালগঞ্জ সদর, কোটালীপাড়া ও টুঙ্গিপাড়া, নারায়ণগঞ্জের নারায়ণগঞ্জ সদর ও বন্দর, গাজীপুরের গাজীপুর সদর, কালীগঞ্জ ও কাপাসিয়া, রাজবাড়ীর কালুখালী ও পাংশা, মানিকগঞ্জের সিংগাইর ও হরিরামপুর, ফরিদপুরের চরভদ্রাসন, মধুখালী ও ফরিদপুর সদর, মাদারীপুরের মাদারীপুর সদর, শিবচর ও রাজৈর, শরীয়তপুরের নড়িয়া ও ভেদরগঞ্জ, নরসিংদীর নরসিংদী সদর ও পলাশ, টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী, মধুপুর ও গোপালপুর, মুন্সীগঞ্জের মুন্সীগঞ্জ সদর ও গজারিয়া, কিশোরগঞ্জের কিশোরগঞ্জ সদর, হোসেনপুর ও পাকুন্দিয়া, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া ও ফুলপুর, জামালপুরের জামালপুর সদর ও সরিষাবাড়ী, শেরপুরের ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী এবং  নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা।

সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আগে থেকেই উপজেলা নির্বাচনকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে মাঠে কাজ শুরু করলেও স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা ক্রমে ক্রমে ভোটের মাঠে সক্রিয় হচ্ছে। অনেক উপজেলায় বিএনপির স্থানীয় নেতারা প্রকাশ্যে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে সরব হয়েছে। তবে তারা চায় নির্বাচনের পরিবেশ যেন ভালো থাকে। অবশ্য নির্বাচনের পরিবেশ ভালো রাখতে নির্বাচন কমিশন যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কাউকে নৌকা প্রতীক দিচ্ছে না। এ কারণে সারাদেশের প্রতিটি উপজেলায় শুধু আওয়ামী লীগেরই ৩ থেকে ৪ জন করে প্রার্থী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। তারা সবাই স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নিজেদের পক্ষে রেখে ভোট ব্যাংক বাড়ানোর জন্য নানা কৌশলে কাজ করছেন।

এদিকে বিএনপি প্রকাশ্যে নির্বাচনের পক্ষে না থাকলেও এবার উপজেলা নির্বাচন করতে স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বাধা দেবে না। কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে তাকে বহিষ্কারও করবে না। জাতীয় সংসদ নির্বাচন আর স্থানীয় সরকার বিশেষ করে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ভিন্ন হওয়ায় দলটি এ কৌশল নিয়েছে। কারণ, অনেক উপজেলায় স্থানীয় পর্যায়ের বিএনপি নেতাদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা রয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি উপজেলায় আওয়ামী লীগের একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকছে বিধায় বিএনপির একক প্রার্থী হলে স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকবে। এতে বিএনপির অনেক নেতার বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। এ পরিস্থিতি প্রতিটি উপজেলার স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এ নির্বাচন উপলক্ষে সরব হচ্ছে বলে সূত্র জানায়।

২০১৫ সালের নভেম্বরে স্থানীয় সরকার আইন সংশোধন করে উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং  পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে রাজনৈতিক দলের দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিধান রাখা হয়। তবে রাজপথের বিরোধী দল বিএনপিসহ আরও কিছু দল এ বিধানের বিরোধিতা করে আগের মতো দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার হয়। আইন পাসের পর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীরা দলীয় প্রতীকে অংশ নেয়। তবে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন শুরু হওয়ার পর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নানামুখী সমস্যা দেখা দেয়। যে কারণে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেই দলের নেতাকর্মীরা বিচ্ছিন্নভাবে দলীয় প্রতীক ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবি তোলে। এ পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ দলীয় ফোরামে সিদ্ধান্ত নিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নৌকা প্রতীক কাউকে না দেওয়ার কথা জানায়।

এর আগে ২০১৯ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বর্জন করার ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি। তারপরও বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের দেড় শতাধিক নেতাকর্মী এ নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন। আর এবার আওয়ামী লীগ কাউকে দলীয় প্রতীক না দেওয়ায় এবং প্রতিটি উপজেলায় আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী থাকায় বিএনপির জন্য সুবিধা হবে। এ ছাড়া উপজেলা নির্বাচনের মাধ্যমে ঝিমিয়ে পড়া তৃণমূল বিএনপি নেতাকর্মীরা রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাবে।

ইসি সূত্র জানায় দেশে ৪৯৫টি উপজেলার মধ্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিভিন্ন উপজেলার নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। নির্বাচন কমিমশন থেকে ইতোমধ্যেই ছয় বিভাগের ৩৪৪টি উপজেলায় নির্বাচনের সময় জানিয়ে দেয়া হয়েছে। আর চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের উপজেলাগুলোর ভোটের সময় পড়ে জানাবে ইসি। ইসির ঘোষিত তালিকা অনুযায়ী রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, বরিশাল, ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগে প্রথম ধাপে ১০৮টি, দ্বিতীয় ধাপে ১২১টি, তৃতীয় ধাপে ৭৭টি, ও চতুর্থ ধাপে ৩৮টি উপজেলায় ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। আর সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের উপজেলাগুলোর ভোটের সময় পরবর্তীতে জানানো হবে বলে ইসি জানায়।

সম্প্রতি সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল এবার উপজেলা নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ভালো হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, শুনতে পাচ্ছি আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীক দেওয়া হবে না। এটা ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। এ পরিস্থিতিতে তিনি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের বাইরে স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ভোট করার আহবান জানান। তিনি বলেন, এ নির্বাচনে প্রার্থীদের সঙ্গে ভোটারদের যোগাযোগ বেশি থাকে। সম্পর্কের বিষয় থাকে। তাই এই নির্বাচনে মানুষ ভোট দেওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে।

দেশে প্রথমবারের মতো উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৫ সালে। এর পর ১৯৯০ সালে দ্বিতীয়বার ও ২০০৯ সালে তৃতীয়বার, ২০১৪ সালে চতুর্থবার এবং ২০১৯ সালে পঞ্চমবার উপজেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৯ সালে দেশে পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচন পাঁচ ধাপে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সে সময় ৪৮৮টি উপজেলা পরিষদের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে ৪৫৫টির নির্বাচন যথা সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। বাকি উপজেলাগুলোর নির্বাচন পরে অনুষ্ঠিত হয়।

২০১৯ সালের ১০ মার্চ প্রথম ধাপে ৮২টি উপজেলার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর পর ১৮ মার্চ দ্বিতীয় ধাপে ১২৩টি, ২৪ মার্চ তৃতীয় ধাপে ১২২টি, ৩১ মার্চ চতুর্থ ধাপে ১০৬টি এবং ১৮ জুন পঞ্চম ধাপে ২২টি উপজেলায় ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৪ সালে জুন-জুলাই মাসে সাত ধাপে অনুষ্ঠিত হয় ৪৮৬ উপজেলার নির্বাচন।

বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, উপজেলা পরিষদের মেয়াদ শুরু হয় প্রথম সভার দিন থেকে। পরবর্তী পাঁচ বছর নির্বাচিত পরিষদ দায়িত্ব পালন করে। আর মেয়াদপূর্তির আগের ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে অনুসারে এবার ৪ মে থেকে ২৫ মে’র মধ্যে চার ধাপে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন হচ্ছে। ৪৯৫টির মধ্যে ৪৮৫ উপজেলা এখন  নির্বাচনযোগ্য। বিভিন্ন কারণে বাকি ১০টি উপজেলার নির্বাচন পরে করা হবে।

এস/ভি নিউজ

পূর্বের খবরপিলখানায় বিদ্রোহঃ ইতিহাসের সেই কালো দিন আজ
পরবর্তি খবরছন্দে ছন্দে ছায়ানটের নৃত্য উৎসব দর্শক মুগ্ধ