আড্ডা-বইয়ে মুখর ছুটির দিনের মেলা

দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড় আর পছন্দের বই কেনার আনন্দে ভাসল একুশে বইমেলার শেষ শুক্রবার। সকালের বৃষ্টি প্রকাশকদের কিছুটা চিন্তায় ফেললেও দিনের শেষে বই বিক্রি নিয়ে তাদের মুখে তুষ্টির হাসিই ফুটেছে।

সকালে শুরু হওয়া মেলায় দিনভর আড্ডায় মেতে ছিলেন লেখক, বইপ্রেমী আর প্রকাশকরা। দুয়ার প্রকাশনের স্টলের সামনে কথা হয় তরুণ সাহিত্যিক এহসান মাহমুদের সঙ্গে।

তিনি বলেন, মেলায় লোকজন আসছেন, বইও কিনছেন। সব মিলিয়ে প্রাণবন্ত মেলা হচ্ছে। তবে আয়োজকদের অব্যস্থাপনার কারণে ভোগান্তিও পোহাতে হচ্ছে।

মেলা ঘুরে দেখা যায়, অনেক জায়গায় পানি জমে আছে। কোথাও কাদামাটি মাড়িয়ে হাঁটছে লোকজন। টিএসসির গেইট দিয়ে প্রবেশ করতেই দেখা গেল উন্মুক্ত মাঠে বসে ছবি আঁকেন, এমন দুজন নিজেরাই পানি সরিয়ে তাদের বসার জায়গাটি পরিষ্কার করছেন। অনেক স্টলে বৃষ্টির পানি জমে কিছু বই ভিজে যাওয়ায়, সেসব বই দুপুরে মেলার মাঠে শুকাতেও দেখা যায়।

তবে বৃষ্টিতে বড় কোনো ক্ষতি হয়নি বলে জানালেন মেলায় দায়িত্বে থাকা ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার প্রিন্স হাওলাদার। তিনি বলেন, “বৃষ্টির পানিতে দুই জায়গায় ইলেকট্রিক লাইনে লিকেজ হয়েছিল। সেটি ঠিক করা হয়েছে। এছাড়া তেমন সমস্যা হয়নি।”

শুক্রবার ছিল বইমেলার ত্রয়োবিংশতম দিন। মেলা শুরু হয় বেলা ১১টায়, চলে রাত ৯টা পর্যন্ত। এর মধ্যে বেলা ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত ছিল শিশুপ্রহর। সকাল থেকেই শিশুরা এসে আনন্দে মাতে।

মেলা পরিচালনা কমিটি জানায়, এদিন তথ্যকেন্দ্রে নতুন বই জমা পড়েছে ১৯৭টি।

প্রকাশকরা বলছেন, মেলায় শেষ সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি বই বিক্রি হয়। অনেকেই আসেন এবং তালিকা হাতে নিয়ে স্টলে স্টলে ঘুরে বই কেনেন। ছুটির দিনের মেলায় এমন দৃশ্যই দেখা গেল।

দুপুর ১২টায় মেলায় এসে বিভিন্ন স্টল ঘুরে ৩০টির মত বই কিনেছেন ব্যাংকার সাইফ মুন্সি। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “প্রতি বছরই বইমেলা থেকে বই কিনি এবং আমার পরিবারের সদস্যদের উপহার দিই। শুক্রবার বিকেলের পর অনেক ভিড় হয়, সেজন্য দুপুরে এসে পছন্দের বই কিনেছি।”

প্রতিভা প্রকাশের স্বত্তাধিকারী মঈন মোরসালীন বললেন, “এখন লোকজন বই কেনার জন্যই মেলায় আসছে। তবে ছুটির দিনের সন্ধ্যায় অনেকেই মেলায় আসেন ঘুরে বেড়াতে।”

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই মেলায় জনস্রোত নামে। লিটলম্যাগ চত্বরে দেখা যায় আড্ডা জমতে। বিভিন্ন স্টলের সামনেও লেখকদের দেখা যায় আড্ডায় মেতে থাকতে। কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, আনিসুল হক, জাকির তালুকদারকে এদিন দেখা যায় মেলায়।

লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন লেখক, পর্যটক ও পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক, কথাসাহিত্যিক নভেরা হোসেন, কবি কুশল ভৌমিক ও শিশুসাহিত্যিক আহমেদ জসিম।

‘বই-সংলাপ ও রিকশাচিত্র প্রদর্শন’ মঞ্চে বিকেলে পারস্য সাহিত্যের অনুবাদক ও লেখক অধ্যাপক শাকির সবুর রচিত ‘সমকালীন ইরানের কবি ও কবিতা’ এবং ফারসি থেকে অনূদিত বুজুর্গে আলাভির ‘তার চোখগুলো’ নিয়ে আলোচনা হয়।

‘চায়না বুক হাউসে’ চীনা সংস্কৃতির প্রদর্শন

বইমেলায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে রয়েছে ‘চায়না বুক হাউস’। কনফুসিয়াস ইন্সটিটিউটের পরিচালনায় স্টলটিতে চীন বিষয়ক বিভিন্ন বইয়ের প্রদর্শনী চলছে।

শুক্রবার বিকেলে এ স্টল পরিদর্শনে এসেছিলেন চীনের রাষ্ট্রদূত মি. ইয়াও। ‘চায়না বুক হাউস’ থেকে তিনি শিশুদের বই উপহার দেন। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গেও কথা বলেন।

চীনের রাষ্ট্রদূত মি. ইয়াও বিকালে বইমেলায় ‘চায়না বুক হাউস’ স্টলে আসেন।

বিকেল থেকেই দেখা যায় স্টলের সামনে চা শিল্প, সিংহ নাচ, ক্যালিগ্রাফি, অপেরা মাস্ক পেইন্টিং এবং পেপারকাটের মত ঐতিহ্যবাহী চীনা সংস্কৃতির প্রদর্শন।

চীনের রাষ্ট্রদূত সেখানে উপস্থিত হলে তাকে স্বাগত জানানো হয়। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “এখানে এসে আমার দারুণ লাগছে। বাঙালি বন্ধুদের সাথে দেখা হওয়ার এটা বড় সুযোগ। আমাদের এই স্টলে অনেক বাঙালি বন্ধুকে আসতে দেখে আমি খুশি।

“অনেক তরুণ-তরুণী এখানে বই খুঁজতে এবং চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে আসছে। চীনা বই এবং সংস্কৃতি উপস্থাপনের একটি দুর্দান্ত সুযোগ এটা। আমি খুশি যে বাংলাদেশিরা চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি শিখতে ভালোবাসে এবং চীনা জনগণের সঙ্গে থাকতে ভালোবাসে।”

পরে চীনের রাষ্ট্রদূত বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে সিআরই, ফিল্ম আর্কাইভের স্টলও ঘুরে দেখেন।

বাংলা একাডেমির একুশ উদযাপনের অংশ হিসেবে সকাল সাড়ে ১০টায় শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।

অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ দেন বাংলা একাডেমির সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. মো. হাসান কবীর। প্রধান অতিথি ছিলেন নজরুল ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক এ এফ এম হায়াতুল্লাহ। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ‘ক’ শাখায় প্রথম হয়েছে ওয়াফিয়া নূর, দ্বিতীয় হয়েছে আর্লিন আহমেদ সানভী, তৃতীয় হয়েছে তাইফা জান্নাত। ‘খ’ শাখায় প্রথম হয়েছে সৌভিক সাহা, দ্বিতীয় হয়েছে প্রত্যুষা রায়, তৃতীয় হয়েছে শাফিন উদ্দিন আহাম্মেদ।

‘গ’ শাখায় প্রথম হয়েছে স্বস্তি চৌধুরী, দ্বিতীয় হয়েছে সপ্তনীল হাওলাদার ঐশী, তৃতীয় হয়েছে সুয়েত আহমেদ নিহাল।

আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় ‘ক’ শাখায় প্রথম হয়েছে ফারহিনা মোস্তাক আযওয়া, দ্বিতীয় হয়েছে অংকিতা সাহা রুদ্র এবং তৃতীয় হয়েছে ফাবলিহা মোস্তাক আরওয়া। খ-শাখায় প্রথম হয়েছে সমৃদ্ধি সূচনা স্বর্গ, দ্বিতীয় হয়েছে সুবহা আলম এবং তৃতীয় হয়েছে অন্বেষা এবং গ-শাখায় প্রথম হয়েছে সিমরিন শাহীন রূপকথা, দ্বিতীয় হয়েছে আবদুল্লাহ আল হাসান মাহি এবং তৃতীয় হয়েছে তাজকিয়া তাহরীম শাশা।

সংগীত প্রতিযোগিতা ক-শাখায় প্রথম হয়েছে নীলান্তী নীলাম্বরী তিতির, দ্বিতীয় হয়েছে রোদসী আদৃতা এবং তৃতীয় হয়েছে নৈঋতা ভৌমিক। খ-শাখায় প্রথম হয়েছে তানজিম বিন তাজ প্রত্যয়, দ্বিতীয় হয়েছে সুরাইয়া আক্তার এবং তৃতীয় হয়েছে রোদসী নূর সিদ্দিকী। গ-শাখায় প্রথম হয়েছে কে এম মুনিফ ফারহান দীপ্ত, দ্বিতীয় হয়েছে নবজিৎ সাহা এবং তৃতীয় হয়েছে সরকার একান্ত ঐতিহ্য।

মূল মঞ্চ

বিকেল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে হয় ‘স্মরণ: আখতারুজ্জামান ইলিয়াস’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মামুন হুসাইন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ওয়াসি আহমেদ এবং জাফর আহমদ রাশেদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক খালিকুজ্জামান ইলিয়াস।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি অঞ্জনা সাহা, নূরুন্নাহার শিরিন, মতেন্দ্র মানখিন, মাসুদুল হক, তিথি আফরোজ, ফিরোজ শাহ, আহমদ জামাল জাফরী, রাজীব কুমার সাহা এবং নাদিরা খানম।

আবৃত্তি পরিবেশন করেন বেলায়েত হোসেন, রুবিনা আজাদ, সায়েরা হাবীব, ঝর্ণা পারুল, তনুশ্রী মল্লিক এবং জেসমিন বন্যা। এছাড়াও ছিল রুবিনা আজাদের পরিচালনায় আবৃত্তি সংগঠন ‘উদয় দিগঙ্গন’, ফাতেমা-তুজ-জোহরার পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘গ্রহস্বর’, কাজী মাহতাব সুমনের পরিচালনায় নৃত্য সংগঠন ‘পরম্পরায়’ এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘বাঙালি সাংস্কৃতিক বন্ধন’-এর পরিবেশনা।

সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী সেলিম চৌধুরী, সন্দীপন দাস, রহিমা খাতুন, লাকী সরকার, প্রত্যাশা চাকমা, ডা. তাপস বোস, মো. বদিয়ার রহমান এবং সিদ্দিক কবির। যন্ত্রাণুষঙ্গে ছিলেন কেশব সরকার (তবলা), রবিন্স চৌধুরী (কী-বোড), মো. মামুনুর রশিদ (গিটার), খোকন বাউলা (দোতারা) এবং আবদুস সোবহান (বাংলা ঢোল)।

শনিবার যা থাকবে

শনিবার বইমেলার চতুর্বিংশতম দিন। মেলা শুরু হবে বেলা ১১টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত চলবে শিশুপ্রহর।

বিকেল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে হবে ‘স্মরণ: মোহাম্মদ রফিক এবং খালেক বিন জয়েনউদদীন’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন যথাক্রমে আলতাফ শাহনেওয়াজ এবং সুজন বড়ুয়া। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন শামীম রেজা, শোয়াইব জিবরান, আসলাম সানী এবং আমীরুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন আবুল মোমেন।

এস/ভি নিউজ

পূর্বের খবরএবার সম্মানসূচক পদক পাচ্ছেন পুলিশের ৪০০ জন
পরবর্তি খবরসিলেটে একসঙ্গে ৪ সন্তানের জন্ম দিলেন ফৌজিয়া