ভাষাশহীদদের স্মরণে উন্মুক্ত হলো একগুচ্ছ বাংলা ডিজিটাল সেবা

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ভাষাশহীদদের স্মরণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন বাংলা ভাষাভিত্তিক তিনটি সফটওয়্যার বাংলা টেক্সট টু স্পিচ ‘উচ্চারণ’, বাংলা স্পিচ টু টেক্সট ‘কথা’ এবং বাংলা ওসিআর ‘বর্ণ’সহ নতুন একটি বাংলা ফন্ট ‘পূর্ণ’ উন্মুক্ত করেছে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি)। সেই সঙ্গে বিটিসিএলের ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট জিপন-এর ‘সুলভ’ ও ‘ভাষা’ নামের দুটি সাশ্রয়ী প্যাকেজ চালু করা হয়েছে। এ ছাড়া চালু করা হয়েছে টেলিটকের ই-সিম।

আজ বুধবার (২১ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে আইসিটি টাওয়ারে নতুন এ প্রযুক্তি সেবাগুলো উদ্বোধন করেন ডাক, টেলিযোগাযাগ ও তথ্য-প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক।

প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা উন্নয়ন প্রকল্পের পরামর্শক মামুন অর রশীদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. সামসুল আরেফিন, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদ, বিটিআরসি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মহিউদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন ও টেলিটক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাবিবুর রহমান।

চালু হলো টেলিটকের ই-সিম

ই-সিমের যুগে প্রবেশ করল রাষ্ট্রীয় মোবাইল অপারেটর টেলিটক। ই-সিম হলো ভার্চুয়াল বা এম্বেডেড সিম। প্রচলিত ব্যবস্থায় হ্যান্ডসেটে সিম ঢুকিয়ে কোনো অপারেটরের নেটওয়ার্কে সংযুক্ত হতে হয়।

তবে ই-সিম হ্যান্ডসেটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে। ই-সিমের বড় সুবিধা হলো, বারবার খোলার ঝামেলাই যেহেতু নেই, তাই এ সিম নষ্ট হওয়ারও আশঙ্কা নেই। এ ছাড়া একই সঙ্গে একাধিক নম্বর ব্যবহার করা যায়। ব্র্যান্ডভেদে একসঙ্গে এক ফোনে পাঁচটি পর্যন্ত ই-সিম ব্যবহার করা যায়।

২০২২ সালের মার্চে দেশে প্রথমবারের ই-সিম চালু করে গ্রামীণফোন। এরপর এই সেবা চালু করেছে রবি ও বাংলালিংক। এবার বেসরকারি অপারেটর পথ অনুসরণ করে মহান শহীদ দিবসে ই-সিম চালু করল টেলিটক।

অনুষ্ঠানে জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য আত্মনির্ভরশীল স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলা। পরনির্ভরশীলর বাংলাদেশ গড়ে তোলা নয়।

তবে আমরা আত্মকেন্দ্রিক হব না। সারা বিশ্বের সঙ্গে আমরা তাল মিলিয়ে যোগাযোগ রেখে চলব। জানব, চলব, জ্ঞান অর্জন করব।’

তিনি আরো বলেন, ‘একুশের চেতনায় জাগ্রত হয়ে অঙ্গীকার করেছি আত্মনির্ভরশীল একটি স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলব। যেখানে প্রযুক্তি ব্যবহারকারী দেশ হিসেবেই বিশ্ব শুধু আমাদের চিনবে না, প্রযুক্তি উদ্ভাবক দেশ হিসেবেও যেন আমাদের চিনতে পারে, মর্যাদা এবং সম্মান করতে পারে সে জন্য আমরা এই পদক্ষেপগুলো নিচ্ছি। একদিকে যেমন আমরা বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহার করতে বাধা দেব না, কিন্তু যেন আমাদের নিজস্ব একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থাকে, সে জন্য আমরা দেশি উদ্ভাবক, গবেষকদের উৎসাহিত করছি। আমরা গুগল জি বোর্ড, গুগল ক্লাউড ব্যবহার করব, পাশাপাশি উচ্চারণ, কথা, বর্ণমালা, পূর্ণ, অনুভব, ধ্বনি, গুরুসহ আমাদের নিজস্ব যত ধরনের প্রযুক্তি সেবা রয়েছে সেগুলোও ব্যবহার করব।’

আমাদের ৪০টি সফটওয়্যার, ১৬টি কম্পনেন্ট (bangla.gov.bd) https://bangla.gov.bd/-এ সমন্বয় করেছি জানিয়ে পলক বলেন, ‘সবগুলো একসঙ্গে এখানে সংরক্ষণ করেছি। এগুলোর কপিরাইট, মেধাস্বত্ব থাকবে, যা ভবিষ্যতে নতুন ধরনের সার্চ ইঞ্জিনের জন্য ফাউন্ডেশন হিসেবে এগুলো কাজ করবে। ৪০টি সফটওয়্যার তৈরি হচ্ছে, যেখানে থাকছে ১৬টি কম্পনেন্ট। আমরা এখন গর্বের সঙ্গে বলতে পারি ১৬ ধরনের কম্পনেন্ট, ৪০ ধরনের সফটওয়্যার তৈরি করছি। যেটি হবে, ডিজাইন ইন বাংলাদেশ ডেভেলপ ইন বাংলাদেশ, মেড ইন বাংলাদেশ।’

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এরই মধ্যে আমরা অঙ্গীকার করেছি, আগামী ৩০ জুনের মধ্যে ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন যত সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেগুলোকে লাভজনক করা। আমি জানি এটা অনেক কঠিন। তার পরও এ কঠিনকে বাস্তবায়ন করার অঙ্গীকার করেছি।’

ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামান বলেন, ‘দেশকে ভালোবেসে তথ্য-প্রযুক্তির সঙ্গে এই সামাজিক প্রযুক্তির উন্নয়নে ভাষাশহীদদের প্রতি যথাযথ সম্মাননা দেওয়া হবে। তাই আমরা সবাই প্রমিত বাংলা ব্যবহার করব।’

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. সামসুল আরেফিন বলেন, “দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরিতে একাধিক ভাষা সম্পর্কে দক্ষতা প্রয়োজন। তাই আঞ্চলিক ভাষাকে স্ট্যান্ডার্ড বাংলা ও বিদেশি ভাষা শেখার জন্য নতুন সফটওয়্যারে ‘অনুবাদ’ ফিচার যুক্ত করা দরকার। তবে গুগলে না থাকলেও নতুন সফটওয়্যারে বানান শুদ্ধের সুযোগ রয়েছে আমাদের।”

সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক রণজিৎ কুমার বলেন, ‘বাংলাদেশে ছড়িয়ে থাকা ৪০টি নৃগোষ্ঠীর ভাষা নিয়েও কাজ করছে বিসিসি। বাংলা ভাষা যেন অন্য কোনো ভাষার আগ্রাসনে হারিয়ে না যায় সে জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হবে।’

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বাংলা টেক্সট টু স্পিচ ‘উচ্চারণ’ হলো একটি টিটিএস সফটওয়্যার। লেখাকে মেশিনের মাধ্যমে উচ্চারিত কথায় রূপান্তর করার প্রযুক্তিকে টিটিএস বা টেক্সট টু স্পিচ অ্যাপ্লিকেশন বলা হয়ে থাকে। টিটিএস ডকুমেন্ট, ওয়েবসাইট, স্ক্রিনের উইন্ডোতে থাকা টেক্সট পড়ে শোনাতে পারে। একই সঙ্গে তা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য উপযোগী হয়ে পড়ে শোনাতে পারে। read.bangla.gov.bd ঠিকানা থেকে সফটওয়্যারটি ব্যবহার করা যাবে।

‘কথা’ হলো বাংলা ভয়েস টাইপিং সফটওয়্যার। মুখের কথার মাধ্যমে কম্পিউটারে লেখার প্রযুক্তি হলো ভয়েস টাইপিং বা ‘স্পিচ টু টেক্সট’। এটি প্রমিত স্পষ্ট ও নীরব পরিবেশে উচ্চারিত বাংলা কথাকে লেখায় রূপান্তর করতে পারে। সফটওয়্যারটির চূড়ান্ত ভার্সন বাংলা প্রধান বিরাম চিহ্নগুলোকে লিপিবদ্ধ করতে পারে। ব্রাউজার থেকে একটি ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন হিসেবে voice.bangla.gov.bd ঠিকানা লিখে সফটওয়্যারটি ব্যবহার করা যাবে।

এ ছাড়াও প্রকল্পের তৈরি কিবোর্ড অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপের মাধ্যমেও এই ভয়েস টাইপিং সার্ভিসটি ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে। বাংলা ওসিআরের নাম হলো ‘বর্ণ’। ওসিআরের সাহায্যে কম্পিউটারের অপরিবর্তনযোগ্য ডকুমেন্টের লেখাকে এডিটেবল টেক্সটে রূপান্তর করা যায়। ওসিআর হলো পিডিএফ বা জেপেগ ফাইলের লেখাকে পরিবর্তনযোগ্য লেখায় রূপান্তর করা। এই বর্ণ ওসিআরটি বাংলা লেখাকে কম্পোজকৃত লেখার অনুরূপ টেক্সটে রূপান্তর করে থাকে। অর্থাৎ কোনো ডকুমেন্টকে ছবি তুলে বা স্ক্যান করে ওসিআর করলে তা কম্পোজড হয়ে যায়। ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন হিসেবে যেকোনো ব্রাউজার থেকে ocr.bangla.gov.bd ঠিকানা লিখে সফটওয়্যারটি ব্যবহার করা যায়।

‘পূর্ণ’ ফন্ট একটি অনন্যসাধারণ বাংলা ইউনিকোড ফন্ট, যা ফন্ট সংক্রান্ত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার পর ডিজাইন ও ডেভেলপ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলা প্রকাশনায় প্রয়োজনীয় সকল টাইপোগ্রাফিক ফিচার। একই সঙ্গে বাংলা ভাষার বৈশিষ্ট্যকেও যথাযথভাবে প্রকাশ করছে এই ফন্ট। ফন্টটির স্বাভাবিক ভার্সন ছাড়াও বোল্ড, ইটালিক রূপ রয়েছে। ফন্টটি https://bangla.gov.bd/fonts/ ঠিকানা থেকে ডাউনলোড করা যাবে।

এস/ভি নিউজ

পূর্বের খবরবেনাপোল নোম্যান্সল্যান্ডে দুই বাংলার ভাষাপ্রেমীদের মিলন মেলা
পরবর্তি খবরবাংলাকে জাতিসংঘের অন্যতম দাপ্তরিক ভাষা করতে হবে: সাবের হোসেন