ভাসাভাসা অভিযোগ অনুসন্ধানেও ভাটা

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। লোকবলের অভাব এবং বিচারে ধীরগতিতে ‘আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন’ খোদ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারাই। সন্দেহভাজন তৃণমূল যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে আগের মতো সুনির্দিষ্ট ও জোরালো অভিযোগও আসছে না। সব মিলিয়ে গত ১৪ বছরে আসা দুই-তৃতীয়াংশ অভিযোগের এখনও প্রাথমিক তদন্ত শেষ হয়নি।

ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা থেকে জানা যায়, ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর এখন পর্যন্ত ৮৩৩টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এসেছে। এতে সন্দেহভাজন রাজাকারদের বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, অপহরণ, ধর্মান্তরকরণসহ নানা মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৩৬টির প্রাথমিক তদন্ত শেষে মামলা হয়েছে অথবা খারিজ হয়েছে। বাকি ৪৯৭টি অভিযোগ এখনও প্রাথমিক তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে।

৩০ তদন্ত কর্মকর্তার স্থলে মাত্র ১০ জন থাকায় এ ধীরগতি বলে দাবি সংস্থাটির। জনবল চেয়ে ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত ছয় বছরে কয়েকবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়; কিন্তু একটিরও অনুমোদন মেলেনি। আবার আগের মতো সুস্পষ্ট অভিযোগও আসছে না। সব মিলিয়ে সংস্থার কর্মকর্তারাই তদন্তে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।

তদন্ত সংস্থার জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক এম সানাউল হক বলেন, সম্প্রতি আমাদের কাছে তেমন অভিযোগ আসছে না। যা আসছে দুর্বল ও ভাসাভাসা। এর পরও অভিযোগ এলে তথ্য যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তিনি দাবি করেন, একটা টিম করে পুরোনো অভিযোগগুলো অনুসন্ধান প্রায় শেষ পর্যায়ে আনা হয়েছে। নতুন করে অভিযোগ দিতে কাউকে আমরা উৎসাহিত করছি না। আগামী কিছু দিনের মধ্যে সব অনুসন্ধান ও তদন্ত কাজ শেষ হয়ে যাবে।

সানাউল হক বলেন, স্বাধীনতার ৫৩ বছরে এসে ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী, আসামি, ভুক্তভোগী এমনকি বাদী সবাই এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ। ওই সময়কার ঘটনা অনেকেই মনে করতে পারছেন না। অনেকের আবার সাক্ষ্য দিতে আসার মতো শারীরিক অবস্থা নেই। এই কারণে মূলত পুরোনো যেসব মামলায় অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো আগে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হচ্ছে।

বিচারেও ধীরগতি

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে গত ১৪ বছরে রায় ঘোষণা হয়েছে ৫৫টি। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা ১৪৯। কিন্তু আপিল ও রিভিউ শেষে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৯টি মামলা। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ৪৬টি মামলার আপিল এখনও বিচারাধীন। এই সময়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হয়েছে ৮৯টি অভিযোগের। ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন এখনও ৩২টি মামলা। বর্তমানে বিচারপতি শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে তিন বিচারপতির একটি বেঞ্চে বছরে ২ থেকে ৩টি মামলার রায় হচ্ছে। এই গতিতে রায় হলে বিচারাধীন ৩২ মামলা নিষ্পত্তিতেই কমপক্ষে ১০ বছর লাগবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের সময় একটি বেঞ্চ ছিল। বিচারকাজে গতি আনতে ২০১২ সালের ২২ মার্চ আরেকটি বেঞ্চ গঠন করা হয়। তবে মামলা কমে যাওয়ায় ২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর দুটি বেঞ্চকে একীভূত করে ফের একটি করা হয়। এরপর থেকে একটি বেঞ্চে বিচার কাজ চলছে।

২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি পলাতক রাজাকার আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির আদেশ দেওয়ার মধ্য দিয়ে ট্রাইব্যুনালে রায় ঘোষণা শুরু হয়। ওই বছরে দুটি ট্রাইব্যুনাল থেকে ৯টি রায় ঘোষণা হয়। এরপর ২০১৪ সালে ৬টি, ২০১৫ সালে ৬টি, ২০১৬ সালে ৬টি, ২০১৭ সালে ২টি, ২০১৮ সালে ৬টি, ২০১৯ সালের ৬টি, ২০২১ সালে ২টি, ২০২২ সালে ৬টি ও ২০২৩ সালে ৩টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। চলতি বছর কোনো রায় আসেনি।

ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর রানা দাশগুপ্ত বলেন, আমাদের হিসাবে এক বছরে একটি ট্রাইব্যুনাল বড় জোর দুটি মামলার রায় দিতে পারেন। কিন্তু এখনও অনেক মামলা বিচারাধীন ও তদন্তাধীন। এ প্রেক্ষাপটে কমপক্ষে আরও একটি ট্রাইব্যুনাল চালু করা যেতে পারে।

এস/ভি নিউজ

পূর্বের খবর৪ বছরের মধ্যে গ্যাসের সব গ্রাহক প্রিপেইড মিটারের আওতায় আসবে: প্রতিমন্ত্রী
পরবর্তি খবরযুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিতব্য লন্ডন মহোৎসবের সংবাদ সম্মেলন ঢাকায় অনুষ্ঠিত