যে কারণে বাংলাদেশের নির্বাচনে আমেরিকার নাক গলানো উচিত নয়: ইন্ডিয়া টুডে’র নিবন্ধ

চলতি বছরের শেষ দিকে অথবা আগামী বছরের শুরুতেই বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন উপলক্ষে ইতোমধ্যেই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা শুরু হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে সক্রিয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে বিশ্ব পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও। দেশটি এরই মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় ‘গণতন্ত্র সুসংহত’ করার উদ্যোগের নাম দিয়ে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন নিয়েও কিছু পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে।

আমেরিকার সর্বশেষ ওই উদ্যোগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন ঘোষণা দিয়েছেন, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কোনও ব্যক্তি বাধা হয়ে দাঁড়ালে তাকে মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হতে হবে।

বাইডেন প্রশাসনের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু-ও ‘বিশ্বব্যাপী এক কেন্দ্র থেকে গণতন্ত্রের জন্য প্রচার-প্রসারে’ কাজ করার কথা বলছেন।

 

বিষয়টি নিয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে ভারতীয় প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘ইন্ডিয়া টুডে’। এটি লিখেছেন ভারতীয় লেখক ও ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশনের ডিস্টিঙ্গুইশড ফেলো রামি দেশাই।

নিবন্ধের প্রারম্ভে রামি দেশাই লিখেছেন, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রসহ  চারটি দেশের কূটনীতিকের ওপর থেকে ‘অতিরিক্ত পুলিশ’ প্রটোকল প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ। অনেকে আমেরিকার সাম্প্রতিক ভিসা নীতিকে এই ঘটনার প্রতিশোধ হিসেবেও দেখছেন। এছাড়া সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেছেন, দেশটি (আমেরিকা) হয়তো তাকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না। এই অভিযোগ শুধু শেখ হাসিনারই নয়, বিশ্বজুড়েই বিভিন্ন দেশের ক্ষমতার পালাবদলের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাক গলানোর ইতিহাস আরও জটিল।

বিশ্বজুড়ে মার্কিন স্বার্থবিরোধী হওয়ার কারণে অথবা গণতন্ত্রের প্রয়োজনের কথা বলে কিংবা কর্তৃত্ববাদী সরকার থাকলে সেসব দেশের ‘সরকার পতনে’ ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতার নজির রয়েছে। এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে, হাওয়াই, কিউবা এবং ক্যারিবিয়ান দেশগুলোর কথা। এসব দেশের ক্ষেত্রে মার্কিন সংশ্লিষ্টতা বা কলকাঠি নাড়ার মাত্রা অনেকটাই সরাসরি ছিল।

কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৭ সালে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা ‘সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ)’ প্রতিষ্ঠার পর আমেরিকা তাদের এই কার্যক্রমগুলো বেশ গোপনেই সেরে ফেলে। পরের দুই দশকের মধ্যে ১৯৫৩ সালে ইরানে, ১৯৫৪ সালে গুয়েতেমালায় ও ১৯৬৩ সালে ভিয়েতনাম তার উদাহরণ।

২০০০ সালে যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট স্লোবোদান মিলোসেভিচের পতন ও ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণে সিআইএ’র ভূমিকা অনেকটাই স্পষ্ট। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাবিগনিউ ব্রেজাজেনস্কি সেসময় জর্জ ডব্লিউ বুশকে বোঝাতে চেয়েছিলেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার বিপজ্জনক হতে পারে।

যাইহোক, আমেরিকার কোনও হস্তক্ষেপই হয়তো একক ফ্যাক্টরের উপর ভিত্তি করে করা হয়নি। যদিও দৃশ্যমান পদক্ষেপগুলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে বা গণতন্ত্রীকরণের লড়াই হিসেবে আখ্যা দেওয়া হতে পারে, অনেক ক্ষেত্রেই এর অন্তর্নিহিত কারণগুলো মূলত নিজেদের স্বার্থে। অতীতে, বিশ্বব্যাপী প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। যেমন, স্নায়ুযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন আধিপত্য বিস্তারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা লিপ্ত হয়েছিল, তখন সোভিয়েত জোটপন্থী ভারতকে মোকাবেলা করতে পাকিস্তানের মতো দেশগুলোকে সমর্থন দিয়েছিল আমেরিকা।

একইভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবেশ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কারণ এখানে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত। যেমন- দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত অবস্থান, এখানকার মূল্যবান সম্পদ, বাণিজ্যপথ, বাজার, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা। আফগানিস্তানের মতো দেশে সন্ত্রাসবিরোধী প্রচেষ্টা, বাংলাদেশের মতো দেশে মানবিক উদ্বেগ এবং চীনের মতো দেশের অর্থনৈতিক উদ্বেগ। এসব কারণেই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্তের প্রতি ঝুঁকেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

দক্ষিণ এশিয়ায়, ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তবর্তী পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে একটি অনিশ্চিত অবস্থানের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এই দুই দেশে বিশৃঙ্খলা এতটাই বড় আকার ধারণ করেছে যে, সম্ভবত সেখানকার ভূ-রাজনৈতিক পতন ইরাকের পরে সবচেয়ে জটিল হিসেবে চিহ্নিত হবে।

আফগানিস্তানে ‘মার্কিনপন্থী গণতান্ত্রিক’ সরকার বসানোর কয়েক দশকের চেষ্টা ব্যর্থতায় বর্যবসিত হলে, সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মার্কিন সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র আফগানিস্তানের জনগণকে হতাশ করেনি বরং এই অঞ্চলের সমগ্র নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের জন্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার নৈতিক প্রতিশ্রুতি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিল, কিন্তু সেখানে তাদের এটি বড় উদ্দেশ্য ছিল তারা ঠিকই সম্পন্ন করেছিল।

প্রেসিডেন্ট বাইডেন আমেরিকার জনগণের কাছে প্রমাণ করেছেন যে, ওসামা বিন লাদেন এবং অন্যান্য মার্কিনবিরোধী সন্ত্রাসীদের নিশ্চিহ্ন করতে আফগানিস্তানে তাদের যে মিশন, তা সফল হয়েছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এটি উদ্বেগের বিষয় বলে মনে হয়নি যে, তারা আফগানিস্তান থেকে যখন বেরিয়ে যাচ্ছে, তখন তালেবান ২০০১ সালের চেয়েও সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক অবস্থানে ছিল। তখন তারা প্রায় অর্ধেক দেশ নিয়ন্ত্রণ করছিল। আর ওইসব জায়গায় আমেরিকার সৈন্য ছিল খুবই নগন্য।

প্রতিবেশী পাকিস্তানও বাদ পড়েনি। ইমরান খান যেমন একবার বলেছিলেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেবল পাকিস্তানকে তাদের সমস্যা দূর করার জন্য দরকারি বলে মনে করে। তারা আফগানিস্তানে নিজ সৈন্যদের রসদসহ অন্যান্য প্রয়োজীনয় জিনিস সরবরাহে পাকিস্তানের অ্যাক্সেস ব্যবহার করেছিল। বৈরিতার কারণে ইরান কিংবা রাশিয়াপন্থী উত্তরের দেশগুলো দিয়ে সেখানে প্রবেশ করতে পারেনি তারা। কিন্তু পাকিস্তান প্রথম থেকেই একটি ভিন্ন গল্পের শিকার হয়েছে।

রামি দেশাই ওই নিবন্ধে আরও বলেন,ব্যাপকভাবে সাহায্য নির্ভর পাকিস্তানে ৩০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আর এটি করেছে শুধুমাত্র আফগানিস্তানে তাদেরকে সমর্থন দেওয়ার জন্য। অভিযোগ রয়েছে, পাকিস্তানে মোশাররফের স্বৈরশাসনের সময় গণতান্ত্রিক উত্তরণ সংক্রান্ত কোনও ধরনের চুক্তি ছাড়াই প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার সাহায্য করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বুশ প্রশাসন। আর এই সহায়তার বেশিরভাগই গিয়েছিল সামরিক বাহিনীতে। আর  এই ঘটনা পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি মার্কিন সমর্থনের ঘটনাও স্মরণ করিয়ে দেয়। অথচ তারা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমানে বাংলাদেশ) গণহত্যার জন্য দায়ী ছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরাচারী শাসনকে সমর্থন করেছিল, যদিও তখন ঢাকার মার্কিন কনস্যুলেট জেনারেল দিয়েছিলেন ভিন্ন পরামর্শ।

বাস্তবতা হল- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পশ্চিমা শক্তিগুলো তাদের উচ্চাভিলাষী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই অঞ্চলকে দেখে। তারা নৈতিকতার কথা বলে প্রবেশ করে, কিন্তু যাওয়ার সময় নিজ স্বার্থে চলে যায়। আফগানিস্তান এর উজ্জ্বল উদাহরণ।

সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে তার আধিপত্য নিশ্চিত করতে চাইছে। বাইডেন প্রশাসন অনেকবার গণতন্ত্রের মূল্যবোধের কথা বলে “মুক্ত বিশ্বের” পক্ষের নেতা হিসেবে দাবি করেছে। কিন্তু গণতন্ত্র নিশ্চিত করার জন্য তাদের পর্যবেক্ষণ, চাপ এবং নিষেধাজ্ঞা সারা বিশ্বে সমানভাবে প্রযোজ্য বলে মনে হয় না।

দেখা গেছে, আরব বিশ্ব সব সময়ই কোনও না কোনওভাবে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের আলোচনার বাইরেই থেকে যায়। এক রিপোর্টে দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে ৮০টির মতো দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। মজার ব্যাপার হলো- এসবের অর্ধেকের বেশি দেশে গণতান্ত্রিক শাসন নেই।

বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে রামি দেশাই বলেন, নির্বাচনের দিন যেহেতু ঘনিয়ে আসছে, শেখ হাসিনার উচিত হবে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিষয়টি মোকাবিলা করা। তবে ব্যাপকমাত্রায় হস্তক্ষেপের সম্মুখীন হয়েও শেখ হাসিনা রাখঢাক করেননি। সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রসঙ্গে বলেছেন, “তারা গণতন্ত্র হরণের চেষ্টা করছে এবং এমন একটি সরকার আনতে চাইছে যাদের গণতান্ত্রিক ভিত্তি নেই। এটি করা হলে তা অগণতান্ত্রিক হবে।”

বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের অভিযোগে র‌্যাব কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর আবার ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস সম্প্রতি নিখোঁজ বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনের বাড়িতে গিয়ে তার ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেছেন। এসবে বোঝা যায়, বাংলাদেশে গভীরভাবে দৃষ্টি রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।

এক্ষেত্রে ভারতকে পরিস্থিতি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করার পরামর্শ দেন রামি দেশাই। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে মার্কিন হস্তক্ষেপের ফলে ভারতের উত্তরপশ্চিম সীমান্ত পরবর্তী এলাকায় নাজুক পরিস্থিতির মুখে রয়েছে। একইভাবে উত্তরপূর্ব সীমান্তের ওপারে তেমনটি হলে আরও জটিলতা দেখা দিতে পারে। 

পরিশেষে রামি দেশাই বলেন, বিশ্ববাসীর জন্য এখন আর মোড়ল রাষ্ট্রের কোনও প্রয়োজন নেই। কেননা, বর্তমান বিশ্ব প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের উচিত স্থানীয় জনগণকেই তাদের নিজেদের ভালমন্দ নির্ধারণের সক্ষমতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে