শ্রমিকদের অধিকার হরণে ড. ইউনূসের ১৪ কোটির চুক্তি!

78

শ্রমিকদের অধিকার হরণে ‘ঢাকা লজিস্টিক অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (ডিএলএসএস)’ নামে এক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ২০২১ সালে ১৩ কোটি ৮০ লাখ টাকার চুক্তি করা হয়। ড. ইউনূসের সভাপতিত্বে গ্রামীণ টেলিকমের বোর্ড সভায় বিস্তারিত আলোচনা শেষে ড. ইউনূসের অনুমোদনেই এই চুক্তি করে গ্রামীণ টেলিকম।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গ্রামীণ টেলিকমের সেই বোর্ড সভায় ড. ইউনূসের উপস্থিতিতে ঢাকা লজিস্টিকস অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড একটি বিস্তারিত পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করে। সেই বোর্ড সভার কার্যবিবরণী, ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত সভার অডিও রেকর্ড (ড. ইউনূসের বক্তব্যসহ), গ্রামীণ টেলিকমের কাছে ডিএলএসএস প্রেরিত ই-মেইল এবং বোর্ড সভায় উপস্থাপিত ডিএলএসএস-এর পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন দেখে এসব তথ্য জানা যায়। 

ডিএলএসএস তাদের লিখিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে ড. ইউনূস পরিচালিত গ্রামীণ টেলিকম ইতিপূর্বে শ্রম আদালতের একজন চেয়ারম্যানকে ‘ঘুষ’ প্রদান করে আসছিল। অডিওতে শোনা যায়, গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান ড. ইউনূস বোর্ড সভায় এই বিষয়ে সিদ্ধান্তের সময় ডিএলএসএস-এর সঙ্গে চুক্তি সম্পর্কিত বিস্তারিত আলোচনা (ঘুষের তথ্য) অন্তর্ভুক্ত না করে শুধু ডিএলএসএস-এর সঙ্গে চুক্তি অনুমোদনের সিদ্ধান্তটুকু কার্যবিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশনা দেন।

জানা যায়, গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক-কর্মচারীরা ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর বিধান মোতাবেক কম্পানির নিট মুনাফার ৫ শতাংশ অর্থ অংশগ্রহণ তহবিল এবং কল্যাণ তহবিল বাবদ তাদের প্রাপ্য অংশ দাবি করে আসছিল। একই দাবিতে কম্পানির ১০৭ জন শ্রমিক-কর্মচারীর পক্ষে ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতে ১০৭টি মামলা হয়। এর পাল্টা গ্রামীণ টেলিকম মামলাগুলো ‘মেনটেইনেবল’ নয় মর্মে হাইকোর্টে শতাধিক রিট পিটিশন দায়ের করে। পিটিশনগুলো হাইকোর্টে বিচারাধীন থাকা অবস্থায় ড. ইউনূস ২০২০ সালের ২৫ অক্টোবর এক নোটিশে মামলার পক্ষভুক্ত সব শ্রমিককে চাকরি থেকে ছাঁটাই করেন। হাইকোর্ট এই ছাঁটাই আদেশকে স্থগিত করে ছাঁটাইকৃত শ্রমিক-কর্মচারীদের চাকরিতে পুনর্বহালের আদেশ প্রদান করেন। এরপরই গ্রামীণ টেলিকম ‘ঢাকা লজিস্টিকস অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডকে (ডিএলএসএস) দিয়ে শ্রম আদালতের মামলাসমূহের রায় নিজেদের পক্ষে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। তারা রিট পিটিশনগুলো প্রত্যাহার করে শ্রম আদালতে মামলাগুলো শুনানিরও ব্যবস্থা করে। 

জানা যায়, ২০২১ সালের ১৪ জুলাই ড. ইউনূসের সভাপতিত্বে গ্রামীণ টেলিকমের ১০৪তম বোর্ড সভায় ভূতাপেক্ষ অনুমোদনের মাধ্যমে ২০২১ সালের ২৫ মে থেকে দালাল প্রতিষ্ঠান ডিএলএসএসকে নিযুক্ত করে। গ্রামীণ টেলিকমের কাছে ডিএলএসএস উপস্থাপিত নথিপত্রে দেখা যায়, ডিএলএসএস সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে প্রভাবিত করার প্রস্তাব দিয়েছিল। ১৪ জুলাইয়ের ওই বোর্ড সভায় ড. ইউনূসসহ গ্রামীণ টেলিকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ডিএলএসএস-এর প্রস্তাবের পক্ষে মত দেন।

বোর্ড সভায় গ্রামীণ টেলিকমের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফুল হাসান বলেন, “…বাংলাদেশে আইনিভাবে লড়াই করে সব যায়গায় টেকা যায় না, সে ক্ষেত্রে আমাদের দুটো জিনিস, একটা হলো ‘আইআর’ বলে একটা কনসালটেন্ট বাংলাদেশে কাজ করে, তারা ‘ইন্টার্নাল রিলেশন্স’-এর কাজ করে, স্টেকহোল্ডারস, ল’, জুডিশিয়ারি, সরকারের ইনফ্লুয়েন্সিয়াল পিপল, রাজনীতিবিদ এসব মিলে তারা একটা পজিশন তৈরি করে …।” 

জানা যায়, ঊর্ধ্বতন মহলকে যেকোনোভাবে প্রভাবিত করার যে প্রস্তাব দিয়েছিল ডিএলএসএস, তার প্রশংসা করেন প্রফেসর ইউনূস এবং অনুমোদন দিয়ে দেন। সূত্র মতে, প্রস্তাবটি অনুমোদনের সময় তিনি বলেন, “এই দুটো প্রস্তাব ভালো প্রস্তাব। এ প্রস্তাব আমি স্বেচ্ছায় এনকারেজ  করছি… এটা আমরা অনুমোদন করলাম। আর দ্বিতীয় বিষয় হলো, এ আইটেম নিয়ে যে আলোচনা হলো তা ‘অফ দা রেকর্ড’।  শুধু ডিসিশনগুলো থাকবে। মিনিটসটা সংক্ষেপে হবে ।”

জানা যায়, কাজটি পেয়ে ডিএলএসএস গ্রামীণ টেলিকমের পক্ষে একটি প্রস্তাবনা তৈরি করে এবং ২০২১ সালের ২২ জুলাই ই-মেইলে গ্রামীণ টেলিকমের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফুল হাসানকে পাঠায়। নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, শুধু এই প্রস্তাবনা তৈরির জন্য গ্রামীণ টেলিকম ডিএলএসএস-কে পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছিল। ওই নথিতে ডিএলএসএস উল্লেখ করেছে: “… However, please find attached the assessment and way forward including the tentative cost which can be negotiated upon the actual involvement of the level of influence and through whom with an objective to clean the whole issue in favour of GTC (Grameen Telecom).”

এই প্রস্তাবনার ফাইন্ডিংস-এ ডিএলএসএস সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে গ্রামীণ টেলিকম এর আগে নিজেদের পক্ষে রায় আনার জন্য শ্রম আদালতের তৎকালীন চেয়ারম্যান শাহজাহান সাজুকে 
‘বিশেষ সুবিধা’ প্রদান করেছিল। ডিএলএসএস ফাইন্ডিংস-এ বলে, “GTC (Grameen Telecom) dependency on Mr. Shahjahan, the former Chairman, Labour Court who digested the whole piece of cake alone that GTC paid time to time.”

ডিএলএসএস তাদের প্রস্তাবে আশ্বাস দেয়, ১৩ কোটি ৮০ লাখ টাকার এই প্যাকেজের বিনিময়ে তারা সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা-মন্ত্রী-সচিব এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ‘কনডিশন’ বা হাত করবে এবং এর সুবাদে গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক-কর্মচারীদের দায়েরকৃত মামলাসমূহ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। ডিএলএসএস তাদের প্রতিবেদনে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একটি তালিকাও ছবিসহ উপস্থাপন করেছে। তাদের হাত করার কৌশলটির নাম দেয় ‘Top Down Approach’। এতে বলা হয় :

“We will engage with Minister personally and through our liaison to brief and condition her Majesty Honorable Labour Minister. 
Will condition the Labour secretariat. 
Will condition Inspector General of Factories (IGF). 
Will Condition Labour Director.
Will Convince Labour Leaders in one to one session since they are our committee members in different forum. 
Engage Ministry to device an exit package.” 

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ন্যায্য অধিকার থেকে শ্রমিক-কর্মচারীদের বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে প্রভাবশালী মহলকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে হাত করার এই চুক্তিটি ছিল সম্পূর্ণ বেআইনি ও অপরাধমূলক কাজ।