ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক সরকার

112

অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় নয় মাস আগে ব্যয় খাতে কৃচ্ছ্রসাধন কর্মসূচি নিয়েছিল সরকার।

ওই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকায় উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমানো সম্ভব হয়েছে।

পাশাপাশি চলতি অর্থবছরের (জুলাই-জানুয়ারি) পর্যন্ত বেড়েছে রাজস্ব আয়ও। এতে সরকারের ঋণের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কমেছে ব্যাংক ও বৈদেশিক খাত থেকে ধার করার প্রবণতা।

চলতি অর্থবছরের (২০২২-২৩) প্রথম ছয় মাসের পরিসংখ্যানও তাই বলছে। এতে দেখা গেছে, গত জুলাই-ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ করেছে সরকার।

এর আগের অর্থবছরের একই সময়ে ঋণ নেওয়া হয় ৭৫ হাজার ৭০১ কোটি টাকা। আগের বছরের তুলনায় এ বছরে ঋণ নেওয়া কমছে ২৭ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা। অর্থ বিভাগ সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার মতে, ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করেছে সরকার। যে কারণে এবারই প্রথম লক্ষ্যমাত্রা থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কম। যদিও প্রতিবছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশিমাত্রা ঋণ গ্রহণ করা হয়। ঋণ কম করায় সরকার কিছুটা চাপমুক্ত আছে।

সাবেক সিনিয়র অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ বুধবার বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরার চেষ্টা করছে সরকার। এছাড়া সংকট মোকাবিলায় অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে নেওয়া হয় বিভিন্ন পদক্ষেপ। ফলে মোটা দাগে সরকারের ব্যয় কমছে। যে কারণে সরকারকে বেশি ঋণ করতে হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, একই সময় রাজস্ব আহরণ হিসাবটি লক্ষ্য রাখতে হবে। সেখানে ইতিবাচক হলে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা আরও কমবে।

সাধারণ বাজেটের মোট ব্যয় ও আয়ের মধ্যে যে ঘাটতি থাকে সেটি পূরণ করতেই সরকার ঋণ গ্রহণ করে। দুটি খাত থেকে ঋণ নেওয়া হয়। একটি অভ্যন্তরীণ খাত (ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র ও বন্ড) অপরটি বৈদেশিক খাত। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর এই সময়ে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে ২০ হাজার ৯৪৮ কোটি টাকা, আগের অর্থবছরের একই সময় নেওয়া হয়েছিল ৩৪ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। এ বছর ব্যাংক থেকে কম ঋণ নেওয়া হয় ১৩ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা। তবে সঞ্চয়পত্র খাত, সরকারি চাকরিজীবীদের সাধারণ ভবিষ্যৎ তহবিল (জিপিএফ) থেকে অন্যান্য বছর ঋণ নেওয়া হলেও এ বছর নেওয়া হয়নি। এসব খাতে আগের নেওয়া ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে ৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা।

এছাড়া বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার প্রবণতাও কম দেখা গেছে। গেল জুলাই-ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৭ হাজার ৭৬ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয় বৈদেশিক খাত থেকে। আগের অর্থবছরের (২০২১-২২) একই সময় ঋণ নেওয়া হয়েছিল ৩১ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা। এ খাত থেকেও ৪ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা কম নেওয়া হয়।

কৃচ্ছ সাধন কর্মসূচি নেওয়ার ধারাবাহিকতায় ব্যয় কমছে সেটিও পরিসংখ্যানে ফুটে উঠছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটের মাধ্যমে সরকার ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। কিন্তু গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৭৫ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যয় দুই লাখ কোটি টাকার মতো হবে। হিসাব অনুযায়ী এই সময়ে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকা ব্যয় হওয়ার কথা। অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার মতে, ব্যয়ের লাগাম টানতে কোনো কোনো খাতে সর্বোচ্চ একশ এবং সর্বনিু ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

সরকারি ব্যয়ের একটি বড় খাত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)। এ বছর ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে এ খাতে ব্যয় হয় ৭২ হাজার ৯০ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের মাত্র ২৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। এই বাস্তবায়নের হার গত ১২ বছরে সর্বনিম্ন। আগামীতে আরও ব্যয় কমবে। কারণ এরই মধ্যে মূল এডিপি থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা কাটছাঁট করা হয়েছে।

এদিকে আয়ের একটি প্রবৃদ্ধির ধারা বইছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাবে অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে রাজস্ব আয় হয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা। এটি গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। এ বছর আদায় ভালো থাকায় ঋণের ওপর একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, কোভিড-১৯ প্রার্দুভাব স্বাভাবিক হয়েছে। যে কারণে অনেকটা ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে ব্যবসা-বাণিজ্য। ফলে রাজস্ব খাতে আদায়ও বেড়েছে।