পাল্টে গিয়েছে নাজশাহী মহানগরী: দিনে পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি, রাতে আলো ঝলমলে

224
default

বিশেষ প্রতিনিধি, রাজশাহী : দিনে পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি, রাতে আলো ঝলমলে রাজশাহী মহানগরী পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, প্রশস্ত রাস্তা, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সবুজায়ন, আলোকায়ন, দৃষ্টিনন্দন সড়ক বিভাজক, বিনোদনকেন্দ্রের উন্নয়নসহ নানাবিধ উন্নয়নে তিলোত্তমা নগরীতে পরিণত হয়েছে রাজশাহী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদানে এই আধুনিক, উন্নত, বাসযোগ্য, আলোকিত ও তিলোত্তমা নগরী গড়ে তুলেছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন।

প্রায় ৫ বছর পর বদলে যাওয়া তিলোত্তমা রাজশাহীতে রবিবার (২৯ জানুয়ারি) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সফরে যাবেন। প্রধানমন্ত্রী দিনব্যাপী সফরে ২৫ টি প্রকল্পের উদ্বোধন ও ৬টির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। এরমধ্যে রাজশাহী রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের সাতটি প্রকল্প রয়েছে, সেগুলোও উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী।

বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল: প্রায় ৫ কোটি ২ লাখ টাকা ব্যয়ে রাজশাহী নগরীর সিএন্ডবি ক্রসিং এলাকায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল নির্মাণ করেছে রাসিক। দেশের সর্ববৃহৎ এই ম্যুরালের উচ্চতা ৫৮ ফুট, মূল অংশের ফুট উচ্চতা ৫০ এবং ৪০ ফুট চওড়া বঙ্গবন্ধুর ছবি রয়েছে। সীমানা প্রাচীরের উভয় পাশে ৭০০ ফুট জুড়ে টেরাকোটার কাজ করা হয়েছে। গ্যালারি এবং ল্যান্ডস্কেপিং সুপার গ্রানাইট দিয়ে সুসজ্জিত। ম্যুরালে শোভাবর্ধক বৈদ্যুতিক বাতিসহ রাতের দৃষ্টিনন্দন আবহ তৈরি করা হয়েছে।
শেখ রাসেল শিশুপার্ক: শিশুদের বিনোদনের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের লক্ষ্যে রাজশাহী নগরীতে শেখ রাসেল শিশু পার্কের নির্মাণ করা হয়েছে। আনুমানিক প্রায় ৪.৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ছোটবনগ্রাম এলাকায় ২.১৪ একর জমির উপর একটি সময় উপযোগী ডিজাইনের মাধ্যমে নজরকাড়া ও আকর্ষণীয় অবয়ব দেওয়ার জন্য পার্কটি স্থাপিত হয়েছে। পার্কে রয়েছে ব্রিজ, উন্মুক্ত মঞ্চ, হাঁটার পথ, কৃত্রিম পাহাড়সহ বিভিন্ন আধুনিক রাইড এবং কার্যকর নিরাপত্তা।

ফ্লাইওভার: মোহনপুর রেলক্রসিংয়ে প্রায় ৪০ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে। রাস্তার এলাকা, বিশেষ করে ফ্লাইওভারটিকে একটি পর্যটন স্পট হিসাবে দেখা হয় কারণ প্রচুর লোক সমাগম হয় এতে স্থানীয়দের অনেকের জন্য আয় বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

ভদ্রা মোড় রেলক্রসিং-নওদাপাড়া বাস টার্মিনাল সড়ক: আওতায় ভদ্রা মোড় রেলক্রসিং হতে পারিজাত লেক হয়ে নওদাপাড়া বাস টার্মিনাল পর্যন্ত অযান্ত্রিক যানবাহন লেনসহ চারলেন সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। ৮০ ফুট প্রশস্ত ৪ দশমিক ১৭ কিলোমিটার সড়কের নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৬৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। ফোরলেনের সড়ক ছাড়াও দুই লেনের অযান্ত্রিক যানবাহন লেন, সড়ক বিভাজক ও দুইপাশে ড্রেন ও ফুটপাত নির্মাণ করা হয়েছে। সড়কগুলোর আইল্যান্ডে সৌন্দর্য্য বৃদ্ধিতে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে সবুজায়ন করা হবে। সড়কটি নির্মাণে অত্র এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটবে। আলোকায়নের জন্য সড়ক আইল্যান্ডে বাসনো হয়েছে দৃষ্টিনন্দন লাইট ও পোল।

বন্ধগেট-সিটি হাট চারলেন সড়ক: ৪৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা ব্যয়ে নগরীর বন্ধগেট হতে সিটি হাট পর্যন্ত বর্তমান দুইলেন সড়কটি চারলেনে উন্নীত করা হয়েছে। ৩.৫৩২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য রাস্তাটি ৮০ ফুট প্রশস্ত করা হয়েছে। উভয়পাশে ২২ ফুট করে ৪৪ ফুট রাস্তা, রাস্তার উভয় পাশের্^ ৬ ফুট করে মোট ১২ ফুট ড্রেন ও ফুটপাত, ফুটপাত ও ড্রেনের উভয়পাশে ১০ ফুট করে ২০ ফুট ¯েøা মুভিং ভিহেকেল রাস্তা, রাস্তার ৪ ফুটের ডিভাইডার নির্মিত হয়েছে।

হাইটেক পার্ক সংলগ্ন সড়ক: প্রায় ১৩.৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে রেন্টুর খরির আড়ত থেকে ধলুর মোড় হয়ে হাই-টেক পার্ক পর্যন্ত কার্পেটিং রাস্তা, ড্রেন ও ফুটপাথ নির্মাণ এবং কোর্ট থেকে শহরতলী ক্লাব পর্যন্ত ডি কার্পেটিং রাস্তা নির্মাণ কাজ বাস্তবায়িত হয়েছে।

আলুপট্টি-তালাইমারি ৪ লেন সড়ক: রাজশাহী কল্পনা সিনেমা হল থেকে তালাইমারি মোড় পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ১৩১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে আলুপট্টি মোড় হতে তালাইমারি মোড় পর্যন্ত আড়াই কিলোমিটার বর্তমান সড়কটির প্রশস্ত করে ৪ লেন সড়কে উন্নীত করা হয়েছে।

 

রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজের মধ্য দিয়ে রাজশাহী মহানগরী নতুন রূপ পেয়েছে। সাতটি প্রকল্পের বাইরে আরো বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়িত হয়েছে, আরো ব্যাপক চলমান রয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে লেগেছে উন্নয়নের ছোঁয়া।

প্রায় ১৮৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ে রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কের আলিফ লাম মীম ভাটার মোড় হতে ছোট বনগ্রাম, মেহেরচন্ডী, বুধপাড়া, মোহনপুর হয়ে চৌদ্দপায়া রাজশাহী-নাটোর সড়কের পূর্ব-পশ্চিমমুখি ৬.৭৯৩ কিলোমিটার ৪ লেন সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে।

প্রায় ১২৬ কোটি ৩৯ লাখ ৯৯ হাজার টাকা ব্যয়ে আওতায় মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ উপশহর মোড় হতে দড়িখরবোনা, কাদিরগঞ্জ, মহিলা কলেজ, মালোপাড়া পুলিশ ফাঁড়ি হয়ে সোনাদীঘি মোড় এবং মালোপাড়া মোড় হতে রাণীবাজার মোড় হয়ে সাগরপাড়া বটতলা মোড় পর্যন্ত সড়কটি প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন করা হয়েছে।

৫২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে বিলসিমলা রেলক্রসিং থেকে কাশিয়াডাঙ্গা মোড় পর্যন্ত ৪ দশমিক ২ কিলোমিটার সড়ক ৩০ ফুট থেকে ৮০ ফুটে উন্নীত করা হয়েছে। সড়কের দুই পাশে ১০ ফুট চওড়া ফুটপাত ও রাস্তার দক্ষিণ পাশে ৮ ফুট বাইসাইকেল লেন নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া সড়কটির উভয়পাশের আরসিসি ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন আইল্যান্ড। এসব প্রশস্ত রাস্তা নির্মাণের ফলে মহানগরীর ক্রমবর্ধমান যানজট পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধিত হয়েছে। একই সাথে প্রকল্প এলাকায় আবাসনসহ আর্থ-সামাজিক ও পর্যটন এলাকা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

‘রাজশাহী মহানগরীর সমন্বিত নগর অবকাঠামো উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ৯৩ কোটি ৪৮ লাখ ব্যয়ে তালাইমারী মোড় হতে কাটাখালী বাজার পর্যন্ত অযান্ত্রিক যানবাহন লেনসহ ৬ লেন সড়ক নির্মাণ চলমান রয়েছে। ৪.১০ কিলোমিটার সড়কের মাঝে থাকবে ২মিটারের সড়ক ডিভাইডার। ডিভাইডারের দুইপাশে ১০.৫ মিটারের সড়ক থাকবে। সড়কের উভয়পাশে ৩ মিটার অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচলের লেন ও উভয় পাশের ৩ মিটার ফুটপাত ও ড্রেন। সড়কটির সৌন্দর্য্য বর্ধণে ডিভাইডার ও সড়কের উভয় পাশে বৃক্ষরোপণ করা হবে। সড়কটির কাজ শেষ হলে এটি হবে বিশ্ব মানের একটি সড়ক।

রাজশাহী মহানগরীর সমন্বিত নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প : ২৯৩১ কোটি ৬১ লক্ষ ৮১ হাজার টাকা ব্যয় সাপেক্ষে ‘রাজশাহী মহানগরীর সমন্বিত নগর অবকাঠামো উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় মহানগরীতে ব্যাপক উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। মহানগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে ক্ষতিগ্রস্থ ও নতুন রাস্তা এবং নর্দমা নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে।


মহানগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের সকল ক্ষতিগ্রস্থ রাস্তার রক্ষণাবেক্ষণ এবং নতুন রাস্তা নির্মাণ কাজ ইতিমধ্যে দ্রুততার সাথে বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় সিএন্ডবি মোড়ে বঙ্গবন্ধু ম্যুরাল নির্মিত হয়েছে। মহানগরীর যানজট নিরসনে ভদ্রা, শহীদ এ.এইচ.এম কামারুজ্জামান চত্ত্বর, বর্ণালী, নতুন বিলসিমলা, বহরমপুর, রাজশাহী কোর্ট এবং নতুনপাড়া রেলওয়ে ক্রসিং-এ বহুমুখী ব্যবহার উপযোগী ফ্লাইওভার নির্মাণের নক্সা প্রণয়নের কাজ শেষে টেন্ডার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ২৫০ কি.মি. কর্পোটিং সড়ক, ২৬৫ কি.মি. সিমেন্ট কনক্রিট সড়ক, ৩৫৬ কি.মি নর্দমা, ১০৪ কি.মি ফুটপাত নির্মাণ কাজ বাস্তবায়িত হবে। এর মধ্যে নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে নতুন কার্পেটিং রাস্তা ৯৯কি.মি., কার্পেটিং রাস্তা পুনঃ নির্মাণ ১০৭ কি.মি. কার্পেটিং রাস্তা প্রশস্তকরণ ৪৫ কি.মি, নতুন সিমেন্ট কনক্রিট ১৮৫ কি.মি. সিমেন্ট কনক্রিট পূন:নির্মাণ ৮০ কি.মি এবং প্রাইমারী ড্রেন ৪.৫ কি.মি. সেকেন্ডারী ড্রেন ৬০ কি.মি. টারসিয়ারী ড্রেন ২৯২ কি.মি. নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলেছে। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় গোরস্থানসমূহের অবকাঠামো উন্নয়ন, ৪টি কাঁচা বাজার, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, নিরাপদ চলাচলে ফুটপাথ নির্মাণ, প্রাকৃতিক জলাশয় সমূহের উন্নয়ন, ওয়াকওয়ে নির্মাণ, গণশোচাগার নির্মাণ, ফুটওভার ব্রীজ ইত্যাদি অবকাঠামো নির্মাণ কাজ বাস্তবায়নে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় রাসিকের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ঈদগাহ, গোরস্থান, শশ্মানঘাট উন্নয়নে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন কাজ এগিয়ে চলেছে। রাজশাহী মহানগরীর সমন্বিত নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন গোরস্থান, ঈদগাহ উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে ড্রেন, রাস্তা সহ অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ চলছে।

 

 

মহানগরীর ১৫টি চত্বরে ১৬টি আধুনিক মানের সুুউচ্চ বিদ্যুৎ লাইটের পোল স্থাপন করা হয়েছে। তালাইমারি মোড় থেকে আলুপট্টি সড়কে আধুনিক সড়কবাতির দৃষ্টিনন্দন পোল বসানো হয়েছে। প্রতিটি পোলের মাথায় লাগানো হয়েছে ১৩টি আধুনিক লাইট। এছাড়া সড়ক সংলগ্ন বাঁধে স্থাপন করা হয়েছে সুদৃশ্য গার্ডেন লাইটের পোল। প্রতিটি পোলে রয়েছে ৫টি অত্যাধুনিক লাইট। বিলসিমলা রেল ক্রসিং থেকে কাশিয়াডাঙ্গা মোড়, বিমান চত্বর হতে বিহাস, নওদাপাড়া বাস টার্মিনাল মোড় পর্যন্ত থেকে ভদ্রা মোড়, ফায়ার সার্ভিস থেকে কোর্ট সড়ক, উপশহর মোড় থেকে দড়িখরবোনা, কাদিরগঞ্জ, মহিলা কলেজ, মালোপাড়া পুলিশ ফাঁড়ি হয়ে সোনাদীঘি মোড় এবং মালোপাড়া মোড় থেকে রানীবাজার মোড় পর্যন্ত সড়ক দৃষ্টিনন্দন সড়কবাতিতে আলোকায়ন করা হয়েছে। এছাড়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা সহ সর্বক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে রাজশাহী মহানগরী।

এ ব্যাপারে রাসিক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজশাহী মহানগরীর উন্নয়নে দুই হাজার ৯শ কোটি টাকা প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছেন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে রাজশাহী নগরীকে সাজানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে পরিচ্ছন্নতা, প্রশস্ত রাস্তা ও আলোকায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাজশাহী দেশে ও দেশের বাইরে সুনাম অর্জন করেছে। দৃষ্টিনন্দন সড়কবাতিতে আলোকায়ন নগরীকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। দিনে হবে রাজশাহী পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর, রাতে হবে আলো ঝলমলে। সেইভাবে রাজশাহীকে সাজানো হচ্ছে।