জীবনযাত্রার ব্যয় ১০ শতাংশ বেড়েছে

121

জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় সংকটে আছে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ। অন্যদিকে আয় না বাড়ায় জীবনযাপনের খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে মানুষ। চাল, ডাল, তেল, চিনি, মাছ, মাংস, সবজি থেকে শুরু করে নিত্যব্যবহার্য পণ্যের দাম দফায় দফায় বেড়েছে। বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে নিত্যদিনের খাদ্যতালিকা থেকে কাটছাঁট হচ্ছে অনেক কিছু। অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, চলতি বছরও এই চাপ থাকতে পারে। 

২০২২ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় ১০.০৮ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনটির এর আগের বছরের (২০২১) হিসাব অনুযায়ী জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছিল ৬.৯২ শতাংশ। এ হিসাবে ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার হার ৩.১৬ শতাংশ। ২০২২ সালে ঢাকা মেগাসিটিতে মূল্যস্ফীতির চাপ বিষয়ে ক্যাবের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। আজ শনিবার সকাল সাড়ে ১১টায় এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করবে ক্যাব।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের অক্টোবরে মানুষের আয় বেড়েছিল ৫.৯৭ শতাংশ। গত বছরের অক্টোবরে আয় বেড়েছে ৬.৯১ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে আয় বেশি বেড়েছে ০.৯৪ শতাংশ। একই সময়ের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতির হার ৫.৭০ থেকে বেড়ে ৮.৯১ শতাংশ হয়েছে। তবে বিবিএসের মূল্যস্ফীতি ও আয় বাড়ার তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে একাধিক বেসরকারি গবেষণা সংস্থা।

জানতে চাইলে ক্যাবের সভাপতি গোলাম রহমান গতকাল বলেন, ‘জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এতে ভোক্তার নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। ব্যয় বাড়ার অসংখ্য কারণ আছে, যা আমরা অনেকেই জানি। ব্যবসায়ীদের লোভ বেড়ে গেছে। তারা বেশি মুনাফা করছে। কম মুনাফায় এখন আর তারা সন্তুষ্ট নয়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়ছে। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি তেল, গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি—এসব নানা কারণে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। এতে মানুষের ব্যয়ও বাড়ছে।’

গোলাম রহমান বলেন, ‘মানুষের আয়-রোজগার যখন বাড়ে তখন নিত্যপণ্যের মূল্য বাড়লেও তা সহনীয় হয়। কিন্তু অনেক মানুষের আয়-রোজগার বাড়েনি। কর্মজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের অবস্থা বেশি সংকটাপন্ন। গত বছর খারাপ গেছে, এই বছর ভালো যাবে, তারও কোনো আশার আলো দেখছি না।’ তিনি আরো বলেন, ভোক্তারা সংগঠিত নয়। আবার তাদের সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব যাদের হাতে তারাই পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।

প্রতিবেদনে রাজধানী ঢাকায় ১৫টি খুচরা বাজার এবং বিভিন্ন সেবার মধ্য থেকে ১১৪টি খাদ্যপণ্য, ২২টি নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী এবং ১৪টি সেবার তথ্য-উপাত্ত বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

ক্যাবের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ঢাকায় বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ২০২২ সালের প্রথম মাসের তুলনায় ১০.০৮ শতাংশ বেশি ছিল। যদিও গড় খাদ্য মূল্যস্ফীতি আর খাদ্যবহির্ভূত অংশের তুলনায় কম ছিল যথাক্রমে ১০.০৩ ও ১২.৩২ শতাংশ, উভয়ই দুই অঙ্ক স্পর্শ করেছে। তবে সাধারণ পরিবারের তুলনায় নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর গড় মূল্যস্ফীতির চাপ ৯.১৩ শতাংশ কম ছিল। বার্ষিক খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতির তুলনায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি যথাক্রমে ১০.৪১ ও ৭.৭৬ শতাংশ কম ছিল, যদিও উভয় শ্রেণির পণ্য ও সেবা মৌলিক প্রকৃতির ছিল।

ক্যাবের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৬.৮৮ শতাংশ, ২০১৯ সালে এই হার ছিল যথাক্রমে ৬.৫০ শতাংশ। এ ছাড়া ২০১৮ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যবৃদ্ধির পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৬ শতাংশ।

বিবিএসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি গত আগস্টে সর্বোচ্চ ৯.৫২ শতাংশ উঠেছিল। এর পর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এই হার কমে ৮.৮৫ শতাংশে নেমেছে। কিন্তু আলোচ্য এ সময়ে প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়েছে।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার গ্যাসের দাম এবং তার আগে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পানির দামও বাড়ানোর কথাবার্তা চলছে। নতুন করে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে সব খাতেই উৎপাদন খরচ বাড়বে। এর প্রভাবে আরো বাড়ছে পণ্যের দাম, পরিবহনভাড়া, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের খরচ।    

ক্যাবের প্রতিবেদনে বেশ কিছু পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়। তাতে দেখা যায়, চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এ ছাড়া ওয়াসার পানি, নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্তের গড় বাড়িভাড়া এবং ফ্ল্যাট বাসার ভাড়া বেড়েছে।

ক্যাবের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী ২০১১ সালের পর গত বছরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। শহর ও গ্রামীণ উভয় ক্ষেত্রেই মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, যা বাংলাদেশের লাখ লাখ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের দুর্দশা বাড়িয়েছে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য টাকা ছাপানো কমাতে হবে। মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য মুদ্রানীতিকে ব্যবহার করতে হবে। মূল্যস্ফীতি ও ডলার সংকট কাটানোর জন্য আমাদের এক্সচেঞ্জ রেটকে সাপোর্টও দিতে হবে এবং এক্সচেঞ্জ রেট কমাতেও হবে। আমরা সেটা করতে পারছি না। যদি এক্সচেঞ্জ রেট আরো বেশি পতন হয় তাহলে ঋণসংকট আরো বড় হয়ে যাবে।’

ক্যাব বলেছে, গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ থেকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। প্রথমত, ঢাকা মেগাসিটির ব্যক্তি পর্যায়ের ভোক্তারা খাদ্যবহির্ভূত ঝুড়িতে আপেক্ষিকভাবে খানিকটা বেশি ব্যয় করেন, যার মধ্যে খাদ্যবহির্ভূত পণ্য এবং বিভিন্ন পরিষেবা অন্তর্ভুক্ত। বছরের দ্বিতীয়ার্ধে উচ্চ খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি সৃষ্টিকারী এই জিনিসগুলোর এক ধরনের টেকসই মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। দ্বিতীয়ত, যেহেতু নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী খুব মৌলিক, কম দামের এবং সীমিত খাদ্যসামগ্রী গ্রহণ করে, যার মধ্যে কিছু দামের ক্ষেত্রে মৌসুমি প্রভাব (যেমন—ফল ও সবজি) এবং তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল মূল্যের দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। কারণ এগুলোর সরবরাহ শক্তিশালী (যেমন—মোটা চাল ও সস্তা মাছ)।

সুপারিশে ক্যাব বলেছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে পর্যাপ্তভাবে কাভার করার জন্য যথাযথ পরিবীক্ষণের সঙ্গে ওএমএস কার্যক্রম শক্তিশালী করা উচিত। দেশে এক কোটি পরিবারকে খাদ্য সহায়তা বৃদ্ধি করা উচিত। দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতাও বাড়াতে হবে। এ ছাড়া অস্থায়ীভাবে আওতা বাড়ানোর মাধ্যমে খাদ্য, খাদ্যবহির্ভূত মৌলিক পণ্য এবং দুস্থ জনগোষ্ঠীর কাছে নগদ টাকা হস্তান্তর কর্মসূচি বাড়ানো উচিত। যেহেতু গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় শহুরে জনগোষ্ঠী মূল্যস্ফীতির কারণে বেশি চাপ এবং অসহায়ত্বের সম্মুখীন হয়, তাই সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করার মাধ্যমে শহুরে নিম্ন আয়ের মানুষের প্রতি আরো বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত। এ ছাড়া শহুরে নিম্ন মধ্যম ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য বিশেষ সামাজিক সুরক্ষা স্কিম তৈরি করা উচিত, যাতে তারা সফলভাবে মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়।

সুপারিশে ক্যাব বলছে, মৌলিক জ্বালানি পণ্য, বিশেষ করে ডিজেলের ওপর আবার ভর্তুকি দেওয়া যেতে পারে, কারণ এটি সেচ এবং জনসাধারণ ও পণ্য পরিবহন খরচের একটি বড় অংশ নির্ধারণ করে। এ ছাড়া বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পর্যবেক্ষণ বাড়ানো উচিত। সিন্ডিকেট ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ক্যাব ও গণমাধ্যমকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উচ্চমূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জ আগামী বছরজুড়েও থাকবে। পণ্য সরবরাহ যত দূর সম্ভব স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করতে হবে। আমাদের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ দিয়ে যত দূর সম্ভব আমদানিনির্ভরতা কমানো যায়। চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়াতে হবে।’