নবাব স্যার সলিমুল্লাহ:একটি জীবন-একটি ইতিহাস

154
নবাব

নবাব স্যার সলিমুল্লাহ—আমাদের ইতিহাসের অন্যতম ও অনন্য ব্যক্তিত্ব। তদানিন্তন ভারতে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর স্বার্থ আদায়ে বিশ শতকের গোড়ার দিকে যিনি নেতৃত্বের হাল ধরেন, তিনি উপমহাদেশের আজাদি সংগ্রামের এক অগ্রনায়ক ও উজ্জ্বল নক্ষত্র।আজ তার ১০৮তম মৃত্যু দিবস।আজকের এ দিনে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে তিনি কলকাতার ৯৩ চৌরঙ্গী রোডের বাড়িতে  ইন্তেকাল করেন। দিনটি পালনে নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠণ বিভিন্ন কমসূচি গ্রহণ করেছে।বাংলাদেশ বেতার এ উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করছে।

পরাধীন ভারতের পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের জাগরণের অগ্রদূত,জনবান্ধব জমিদার নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ এর জন্ম ৭ জুন ১৮৭১,তাঁর বাবা ছিলেন নওয়াব স্যার আহসানুল্লাহ (১৮৪৬-১৯০১),মাতা বেগম ওয়াহিদুন্নেসা এবং দাদা ছিলেন নওয়াব স্যার আবদুল গনী (১৮১৩-১৮৯৬)।ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ধর্মভীরু কিন্তু আধুনিক ও সংস্কারমুক্ত,এবং অমুসলিমদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন। সে জন্য বড় বড় অমুসলিম নেতা ও নগরের গোটা হিন্দু সম্প্রদায় তাঁর নেতৃত্ব মেনে নিয়েছিলেন। স্যার সলিমুল্লাহ ছিলেন স্বশিক্ষিত,সেই সাথে সুশিক্ষিত। ইংরেজি, জার্মান, আরবি ও ফারসি ভাষার অভিজ্ঞ শিক্ষক দ্বারা পারিবারিকভাবে তিনি শিক্ষালাভ করেন।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও, পারিবারিক ঐতিহ্য, আচার-আচরণ ও নীতিনৈতিকতাবোধ দেখে তদানিন্তন ব্রিটিশ ভারতের সরকার ১৮৯৩ সালে তাকে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দেয়।ঢাকার নবাব  আহসানউল্লাহর মৃত্যুর পর,১৯০১ সালে মাত্র ৩০ বছর বয়সে খাজা সলিমুল্লাহ নবাব পদে অধিষ্ঠিত হন।ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ১৯০২ সালে সিএসআই; ১৯০৩ সালে নওয়াব বাহাদুর; ১৯০৯ সালে কেসিএসআই এবং ১৯১১ সালে জিসিএসআই উপাধি প্রদান করেন।

তাঁর প্রচেষ্টায় ঢাকাতে প্রথম  পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎব্যবস্থা চালু হয়।

১৯০১ সালে স্যার সলিমুল্লাহ নবাব হিসেবে দায়িত্ব পালনের শুরুতে ঢাকার সব মহল্লায় নৈশস্কুল স্থাপন করেন।স্বল্পকালের মধ্যেই তার উৎসাহে ঢাকা, বরিশাল, রাজশাহী ইত্যাদি শহরে মুসলিম ছাত্রদের জন্য ‘ফুলার হোস্টেল’ স্থাপিত হয়। আলীগড় কলেজ-বোর্ডিং হাউজের নমুনায় ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য কলেজের পাশে একটি ‘মোহামেডান হল’ নির্মাণের সিদ্ধান্ত ছিল অন্যতম।

যুগোপযোগী শিক্ষার অভাবকেই মুসলমানদের পশ্চাৎপদতার কারণ বলে নবাব সলিমুল্লাহ বিশ্বাস করতেন।তাইতো স্যার সৈয়দ আহমেদ যেখানে উচ্চশিক্ষার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন সেখানে নবাব সলিমুল্লাহর প্রাথমিক তথা গণশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন।সেকারণেই ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে কংগ্রেস নেতা গোপালকৃষ্ণ গোখলে ১৯১১ সালে ‘বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা বিল’ উত্থাপন করলে,১৯১২ সালের ৩ মার্চ কলকাতায় অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের পঞ্চম অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে নবাব সলিমুল্লাহ তার চরম রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ গোখলের বিলকে সমর্থন করে বক্তব্য রাখেন।অবশ্য বিলটি অনুমোদিত না হওয়ায় তা কার্যকর করা সেসময় সম্ভব হয়নি।

যুগোপযোগী শিক্ষার অভাবকেই নবাব সলিমুল্লাহ পূববঙ্গবাসীর পশ্চাৎপদতার কারণ বলে তিনি বিশ্বাস করতেন।মানুষদের স্ব স্ব পেশায় যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জনের জন্য ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষাপদ্ধতি ও ভিন্ন ভিন্ন স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেন। সেই সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন পেশার জন্য স্বতন্ত্র পুস্তকাদি রচনা ও পাঠ্যসূচি প্রণয়নের পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ তার এই পরিকল্পনা অনুসরণ করছে।

গরিব ও অনাথ ছেলেমেয়েদের জন্য স্যার সলিমুল্লাহ ১৯০৯ সালে ঢাকার কুমারটুলিতে ইসলামিয়া এতিমখানা নামে একটি প্রতিষ্ঠান চালু করেন। পরবর্তীকালে এটি ঢাকার আজিমপুরে স্থানান্তরিত হলে নামকরণ পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা’। বর্তমানেও আজিমপুরে এটির কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ভারতের গুজরাটের নাগরিক ইব্রাহিম মোহাম্মদ এর উদ্যোগে কলকাতায় ১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম’। এ প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন নবাব স্যার সলিমুল্লাহ।

নবাব স্যার সলিমুল্লাহ ছিলেন নারীশিক্ষার অন্যতম উদ্যোক্তা।নবাব স্যার সলিমুল্লাহ ও রায় দুলালচন্দ্র দেব ১৯০৫ সালে নব গঠিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের জনশিক্ষা পরিচালককে আশ্বাস দেন যে, তারা নারীশিক্ষার উন্নতি সাধনে যথাযথ সহযোগিতা করবেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯০৮ সালে স্যার রবার্ট নাথানের নেতৃত্বে ‘ফিমেল এডুকেশনাল কমিটি’ গঠিত হয়। এ কমিটির সদস্য ছিলেন স্যার সলিমুল্লাহ।

১৯০৮ সালের ২৬, ২৭ ও ২৮ ফেব্রুয়ারি এ কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকাতে। তিন দিনব্যাপী আলোচনার শেষে সরকারের কাছে কিছু প্রস্তাব উপস্থাপনের জন্য সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল- প্রতিটি জেলায় মেয়েদের জন্য ১০টি করে উন্নতমানের বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন এবং প্রতি জেলাতে মহিলা শিক্ষকের জন্য একটি করে প্রশিক্ষণ বিদ্যালয় স্থাপন। যেসব কিশোরী ও মহিলা ঘরে বসে শিক্ষক দ্বারা কিংবা অভিভাবকের মাধ্যমে পর্দার আড়ালে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে, তাদের পরীক্ষার মাধ্যমে সার্টিফিকেট দেয়ার জন্য আলাদা বিদ্যালয় স্থাপন প্রভৃতি।

দেশের প্রকৌশল শিক্ষার প্রসারে তার ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়।১৮৭৬ সালে ঢাকা সার্ভে স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সার্ভে স্কুলকে ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিলে নবাব আহসানুল্লাহ এক লাখ ১২ হাজার টাকা প্রদানের প্রতিশ্রতি দেন। কিন্তু ইতোমধ্যে তিনি ইন্তেকাল করলে তার ছেলে স্যার সলিমুল্লাহ সেই অর্থ পরিশোধ করেন। তারপর ১৯০৮ সালে এর নামকরণ করা হয় আহসানুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল। প্রতিষ্ঠানটি ১৯৪৭ সালে কলেজে উন্নীত করে নামকরণ করা হয় আহসানুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং ১৯৬২ সালে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এটির নাম হয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)।

ঢাকার কারুশিল্পের উন্নয়নে তিনি প্রদর্শনীর আয়োজন করতেন। তার প্রচেষ্টায় এ শিল্প নবরূপ পায়। কারুশিল্পের উন্নয়নে ১৯০৯ সালে পূর্ববঙ্গ সরকার গঠিত কমিটির তিনি একজন সদস্য ছিলেন।

ঢাকার সমাজ জীবন পঞ্চায়েত পদ্ধতিকে সুসংগঠিত করার ক্ষেত্রে নওয়াব সলিমুল্লাহর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি খেলাধুলার পৃষ্ঠপোষকতা যেমন করতেন, তেমনি করতেন গান, বায়োস্কোপ প্রদর্শনী, নাট্যাভিনয় প্রভৃতির পৃষ্ঠপোষকতাও । ঈদ, ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম প্রভৃতি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে গেছেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় জার্মানির খ্যাতিমান আলোকচিত্রী ফ্রিৎজ ক্যাপ ঢাকায় ১ম একটি স্টুডিও স্থাপন করেন।

নবাবের পৃষ্ঠপোষকতার ফলে উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে বিশ শতকের প্রায় দেড় দশক পর্যন্ত শাহবাগের নওয়াবের বাগানবাড়ি শুধু রাজনৈতিক বা সামাজিক কর্মস্থলই নয়, নাটক, সঙ্গীত, চিত্রকলা, ক্রীড়া তথা দেশের প্রধান সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।

পূর্ববাংলার ভাগ্যহত মানুষের উন্নতি এবং পশ্চাৎপদ জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে তিনিই প্রথম স্বতন্ত্র প্রদেশ সৃষ্টির দাবি জানান। তাঁর দাবি অনুযায়ী ইংরেজ সরকার ১৯০৫ সালে ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ’ সৃষ্টি করে ঢাকাকে এর রাজধানী ঘোষণা করেছিল।

১৯০৬ সালে নওয়াব সলিমুল্লাহ ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রাদেশিক শিক্ষা সমিতি’ গঠন করেন এবং একই সালের ১৪ ও ১৫ এপ্রিল ঢাকার শাহবাগে অনুষ্ঠিত সমিতির প্রথম অধিবেশনে তিনি এর সভাপতি নির্বাচিত হন।সভাপতিত্বের দীর্ঘ ভাষণে তিনি তদানীন্তন শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করেন এবং বিভিন্ন পেশার জন্য স্বতন্ত্র পাঠসূচি অবলম্বনের পরামর্শ দিয়ে সমাজের শ্রেণিভিত্তিক একটি শিক্ষাপদ্ধতি পেশ করেন।

নওয়াব সলিমুল্লাহ ১৯০৬ সালে  ‘Muslim All India Confederacy’ নামে একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দল গঠনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তাঁর পরিকল্পনাটি বিবেচনার জন্য উপমহাদেশের বিভিন্ন নেতা ও সমিতির নিকট প্রেরণ এবং পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়।

১৯০৬ সালের ২৭ থেকে ৩০ ডিসেম্বর নওয়াবের শাহবাগস্থ পারিবারিক বাগান-বাড়িতে সর্বভারতীয় মুসলিম নেতৃবৃন্দসহ প্রায় দু সহস্রাধিক সুধীর উপস্থিতিতে এক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।উক্ত অধিবেশনের শেষ দিন ৩০ ডিসেম্বর নওয়াব সলিমুল্লাহর প্রস্তাবনায় ‘All India Muslim League’ গঠিত হয়। তিনি এর সহ-সভাপতি এবং গঠনতন্ত্র তৈরি কমিটির সদস্য মনোনীত হন।

বঙ্গভঙ্গ রদ হবার পর নবাব সলিমুল্লাহ উপলব্ধি করতে পারেন যে,শিক্ষাই মুক্তির একমাত্র পথ।এ বিবেচনায় ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য নবাব সলিমুল্লাহ ভারত সচিবের কাছে সুপারিশ করেন। তদনুসারে ১৯১২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি এক ইশতেহারে ভারত সরকার কর্তৃক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুপারিশ ঘোষণা করা হয়।এরই ধারাবাহিকতায় ১৯২১ সালের ১ জুলাই তিনটি অনুষদ, ১২টি বিভাগ, ৬০ জন শিক্ষক, ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী ও তিনটি আবাসিক হল নিয়ে শুরু হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা।

নবাব সলিমুল্লাহ শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্যই কাজ করেছেন তা নয় তিনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সাথেও নিরলসভাবে কাজ করেছিলেন,১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠান দাবি মেনে নেয়ার পূর্ব পর্যন্ত নবাব সলিমুল্লাহ প্রস্তাবিত আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য নিরলসভাবে কাজ করেন। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসতে ভারতের বিভিন্ন নবাব ও মুসলিম জমিদারসহ বিশিষ্ট মুসলিম নেতৃবৃন্দের সঙ্গে নবাব সলিমুল্লাহ যোগাযোগ রক্ষা করতেন। ১৯১১ সালের ১৫ ও ১৬ মার্চ নবাব সলিমুল্লাহর সভাপতিত্বে তার বাসভবন আহসান মঞ্জিলে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক লীগের অধিবেশনে প্রস্তাবিত আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য চাঁদা সংগ্রহ করতে নবাব সলিমুল্লাহকে প্রেসিডেন্ট এবং রেভিনিউ বোর্ডের জুনিয়র সচিব মুহীবুদ্দিনকে সেক্রেটারি করে ‘পূর্ববঙ্গ আসাম প্রাদেশিক চাঁদা সংগ্রহ কমিটি’ গঠন করা হয়। এই কমিটির অন্যতম সদস্য শওকত আলী ও ধনবাড়ীর জমিদার সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর সহযোগিতায় নবাব সলিমুল্লাহর ১৯১১ সালের আগস্ট মাসের মধ্যে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা চাঁদা সংগ্রহ করে আলীগড়ে প্রেরণ করেন। স্যার সৈয়দ আহমেদ (১৮১৭-১৮৯৮) ১৮৭৫ সালে আলীগড় স্কুল এবং ১৮৭৭ সালে আলীগড় কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। তার মৃত্যুর ২২ বছর পর বাংলাসহ ভারতের বিশিষ্ট মুসলিম নেতৃবৃন্দের ধারাবাহিক সহযোগিতায় ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়। এক বছর পর ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে মুসলিম সমাজে শিক্ষা বিস্তারের আপোষহীন নেতা নবাব সুলিমুল্লাহর শ্রম, সহযোগিতা ও সাহায্য ইতিহাস স্বীকৃত।

উপমহাদেশের আর কোনো সমকালীন মুসলিম নেতা এত অর্থ-সামর্থ্য দিয়ে ও এত নিঃস্বার্থ অনুরাগ সহকারে জাতির সেবায় আত্মনিয়োগ করেছেন বলে খোঁজে পাওয়া যায় না। বঙ্গ প্রেসিডেন্সির ওপর তার চেয়ে বেশি প্রভাব আর কোনো মুসলিম নেতার ছিল না। বঙ্গের বাইরে তার চেয়ে বেশি পরিচিত বাংলার আর কোনো লোক তখন নিঃসন্দেহ তখন ছিল না।তাঁর সম্পকে,লখনৌ থেকে প্রকাশিত ‘আসরে-এ- জাদীদ’ এর (আগস্ট, ১৯০৭) সম্পাদকীয়-এ তাকে মূল্যায়ন করে লিখেছে : পূর্ব বাঙলার লোকদের এ জন্য গর্ববোধ করা উচিত যে, তারা এমন একজন বুদ্ধিমান নেতার ছায়াতলে বাস করছেন, যিনি সর্বক্ষেত্রে তাদের নেতৃত্ব দিতে ও সহায়তা করতে প্রস্তুত রয়েছেন। সারা ভারতের মুসলমানদেরও এ জন্য আনন্দিত হওয়া উচিত যে, তাদের ধর্মে এমন একজন উদারচেতা রয়েছেন, যার মাথায় জাতির জন্য ফলপ্রসূ-চিন্তাচেতনা জাগরূক রয়েছে, যার মধ্যে গোটা ভারতকে প্রভাবান্বিত করা ও সবাইকে আকৃষ্ট করারও যোগ্যতা রয়েছে।

মহান এ জাতীয়তাবাদি নেতার মৃত্যু আজো রহস্য্যে ঘেরা,তার অকাল মৃত্যু নিয়ে রয়েছে নানা কৌতূহল, নানা প্রশ্ন, নানা জল্পনা-কল্পনা।অনুসন্ধানকারীদের অনুসন্ধিৎসু মন আজও খুঁজে বেড়ায় তার রহস্যময় মৃত্যু ঘটনার কারণ। কেন অকালে ঝরে গেলেন বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ প্রাণ, মুক্তির দূত, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রেরণা স্যার সলিমুল্লাহ?

নবাব স্যার সলিমুল্লাহ’র মৃত্যু প্রসঙ্গে ইতিহাসবিদ কবি ফারুক মাহমুদ বলেন, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে বড়লাটের সঙ্গে নবাবের মতবিরোধ দেখা দেয় এবং উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। এক পর্যায়ে বড়লাট নবাবকে অপমানজনক কথা বলেন। যা তার সহ্য হয়নি। নবাবের সঙ্গে সব সময় একটি ছড়ি থাকত। সে ছড়ি দিয়ে নবাব বড়লাটের টেবিলে আঘাত করেন। এ নিয়ে চরম বাদানুবাদ শুরু হয়। এক পর্যায়ে বড়লাটের ইঙ্গিতে তার দেহরক্ষী নবাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন এবং গুরুতর আহত হন। পরে নবাবের মৃত্যু হয়। নিশ্ছিদ্র প্রহরায় নবাবের মরদেহ ঢাকায় আনা হয়। তার আত্মীয়স্বজনকেও মরদেহ দেখতে দেওয়া হয়নি। ১৯১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি সামরিক প্রহরায় বেগম বাজারে তাকে দাফন করা হয়। (সরকার শাহাবুদ্দিন আহমদ: আত্মঘাতী রাজনীতির তিনকাল; প্রথম খণ্ড, পৃ. ২২১)।

এ কথা বলতে দ্বিধা নেই, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ও  ঢাকার রাজধানীর পুন:মযাদালাভ, ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠ্ণের মাধ্যমে জনগণকে রাজনীতি সচেতন করে তোলা এবং ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত ফলাফল আজকের বাংলাদেশ । তাই এটাই স্বতঃসিদ্ধ যে, বঙ্গভঙ্গ, মুসলিম লীগ গঠন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে নবাব স্যার সলিমুল্লাহ স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে মিশে আছেন অবিচ্ছেদ্যভাবে।

(এ,কেএম,শাহীদুল ইসলাম চৌধুরী)

শিক্ষক, সংগঠক, সমাজকমী

২৮/১, পল্লবী, ঢাকা।