এ সপ্তাহে বাংলাদেশ সফরে আসছেন এডিবি’র ভাইস প্রেসিডেন্ট আসক লাভাসা

১০০ কোটি ডলারের ঋণ প্রস্তাব দেবে বাংলাদেশ

181

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পর এবার ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) মার্কিন ডলারের ঋণ সহায়তা নিয়ে আলোচনার জন্য চলতি সপ্তাহে বাংলাদেশ সফরে আসছেন এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ভাইস প্রেসিডেন্ট আসক লাভাসা।

এর আগে চলতি বাজেট সহায়তা হিসাবে ১০০ কোটি (১ বিলিয়ন) ডলার ঋণ চাওয়া হয় সংস্থাটির কাছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এ বিষয়ে ঋণ প্রস্তাব পাঠিয়েছে।

সূত্র জানায়, এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্টের সফরকে কেন্দ্র করে এ ঋণ প্রস্তাবটি গুরুত্ব পাচ্ছে। এরই মধ্যে আসক লাভাসার সফরের বিষয়ে চিঠি দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছে এডিবির ঢাকা অফিস। ঋণ প্রস্তাব ছাড়াও এডিবির সহায়তায় দেশে চলমান প্রকল্পের অগ্রগতিও এই সফরের আলোচনায় প্রাধান্য পাবে। এ সময় এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিসহ বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গেও একাধিক বৈঠক করবেন।

এর আগে বাজেট সহায়তার ঋণ হিসাবে আইএমএফ- এর কাছ থেকে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণপ্রাপ্তির প্রাথমিক সম্মতি মিলছে। চূড়ান্ত হলে ফেব্রুয়ারিতে প্রথম কিস্তির ৪৪ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার পাওয়া যাবে। এছাড়া বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে বাজেট সহায়তার ঋণ পাওয়া যাবে ২৫ কোটি মার্কিন ডলার। সম্প্রতি এ দুটি সংস্থার প্রতিনিধিদল ঢাকা সফরকালে এ ব্যাপারে আশ্বাস দেয়।

জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান যুগান্তরকে বলেন, ‘অন্যান্য দাতা সংস্থার তুলনায় আমাদের সবচেয়ে বেশি ঋণ দিয়েছে এডিবি। তাদের কাছে বাজেট সহায়তা হিসাবে ঋণ চেয়েছি। ঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়াটি চলমান। তবে আরও কিছু ঋণ নিতে হবে।’ তিনি জানান, ঋণ দেওয়ার আগে এডিবি কিছু শর্ত দেওয়া ছাড়াও দেশের অর্থনীতির সূচকগুলো যাচাই-বাছাই করবে। তবে এই ঋণের ব্যাপারে তাদের প্রতিক্রিয়া ইতিবাচক আছে।

এডিবির ঋণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, বাজেট সহায়তা হিসাবে আগে কখনোই ঋণ সহায়তা দেয়নি এডিবি। কিন্তু করোনার পর থেকে সংস্থাটি এ খাতে ঋণ সহায়তা দেওয়া শুরু করেছে। এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট সফরকালে অন্য ইস্যুর সঙ্গে এক বিলিয়ন বা ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ সহায়তার বিষয়টি প্রধান এজেন্ডা হিসাবে আলোচনায় প্রাধান্য পাবে। ঋণের বাইরেও এডিবির ঋণে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হবে।

প্রসঙ্গত, ২০১৯-২০ অর্থবছরে এডিবির কাছ থেকে বাংলাদেশ প্রথম বাজেট সহায়তা হিসাবে ঋণ নিয়েছে ৫০ কোটি মার্কিন ডলার। এরপর ২০২০-২১ অর্থবছরে এ সংস্থার কাছ থেকে বাজেট সহায়তা হিসাবে ঋণ পাওয়া গেছে আরও ৫০ কোটি মার্কিন ডলার। সর্বশেষ ২০২১-২২ অর্থবছরে পাওয়া গেছে ৫০ কোটি ডলার। এছাড়া পৃথকভাবে ৯৪ কোটি মার্কিন ডলার পাওয়া গেছে করোনার ভ্যাকসিন বা টিকা কেনার জন্য।

সূত্র জানায়, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা, রাজস্ব ও রপ্তানি আয় বাড়ানো, আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করাসহ কয়েকটি খাতে সংস্কার আনতে প্রস্তাব দেবে এডিবি। এছাড়া ব্যাংকিং কার্যক্রমের সঙ্গে প্রান্তিক জনগণের সম্পৃক্ততা আরও বাড়ানোর শর্ত আরোপ করতে পারে সংস্থাটি।

অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ইতঃপূর্বে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আইএমএফ বেশকিছু শর্ত দিয়েছে। ঋণ ইস্যুর ক্ষেত্রে এডিবিও একই ধরনের শর্তারোপ করতে পারে। শর্ত ছাড়া কোনো দাতা সংস্থা বাজেট সহায়তা ঋণ দেয় না। ফলে এডিবির শর্ত পূরণ করা নিয়ে তেমন কোনো দৃশ্যমান সমস্যা নেই। কেননা, আইএমএফ-এর ঋণ পেতে যেসব শর্ত ইতোমধ্যে প্রতিপালন শুরু হয়েছে, তার সঙ্গে এডিবির অনেক শর্তই কমন পড়বে।

এডিবির ঢাকা অফিস সূত্রে জানা যায়, ৬ থেকে ১১ ডিসেম্বর এই ছয় দিন ঢাকা সফর করবেন আসক লাভাসা। ঢাকায় পৌঁছে পরদিন বুধবার তিনি বৈঠক করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান, সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়েদুল কাদের এবং প্রধানমন্ত্রীর বেসামরিক শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের সঙ্গে।

বৃহস্পতিবার বৈঠক করবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের সঙ্গে।

এছাড়া ৯ ও ১০ ডিসেম্বর এডিপির অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ঢাকা বাইপাস পিপিপি প্রকল্প, পূর্বাচল পিপিপি পানি সরবরাহ প্রকল্প পরিদর্শনের কর্মসূচিও রয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট বেসরকারি খাতের কয়েকজন উদ্যোক্তার সঙ্গে বৈঠক করবেন। পাশাপাশি তিনি ব্যাংক ও আর্থিক খাত, কৃষি, শিল্প, ডেসকোর অবকাঠামো এবং কৃষি প্রক্রিয়াকরণ খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হবেন। অবস্থানকালে আসক লাভাসা ভারতীয় হাইকমিশনের সঙ্গেও বৈঠক করার কথা রয়েছে। সফর শেষে ১১ ডিসেম্বর তিনি ঢাকা ত্যাগ করবেন।

জানা যায়, আন্তর্জাতিক এই দাতা সংস্থা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ৩ বছরে (২০২৩-২০২৫) বাংলাদেশকে ৯০৫ কোটি (৯ দশমিক শূন্য ৫ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তাদের এই ঋণের পরিমাণ গত ৩ বছরের তুলনায় ৮৪ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।

২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হতে বাংলাদেশের প্রস্তুতি যথাযথভাবে সম্পন্ন করতেই ম্যানিলাভিত্তিক ঋণদাতা সংস্থাটিতে এই অর্থ দেবে। এডিবির বরাদ্দ পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৩ সালে ৩২৯ কোটি ডলার, ২০২৪ সালে ৩২১ কোটি ডলার এবং ২০২৫ সালে ২৫৫ কোটি ডলার পাবে বাংলাদেশ। এই অর্থের মধ্যে ৬৯ দশমিক ৫ শতাংশ দেশের মাথাপিছু জিডিপির ক্রমবর্ধমান অনুপাতে বাজারভিত্তিক শর্তে দেওয়া হবে। এডিবি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশকে ৪ হাজার ৫০০ কোটি (৪৫ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার ঋণ সহায়তা ও অনুদান দিয়েছে।

উল্লেখ করা যেতে পারে, চলতি (২০২২-২৩) অর্থবছরে ঘাটতি বাজেট পূরণ করতে বিদেশি ঋণ সহায়তার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। বৈদেশিক মুদ্রায় এর পরিমাণ ১০.৭৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ ঘাটতি পূরণে আইএমএফ-এর কাছে ৪৫০ কোটি ডলার, বিশ্বব্যাংকের কাছে ১০০ কোটি এবং এডিবির কাছে ১০০ কোটি ডলার ঋণ চাওয়া হয়েছে। এছাড়া জাপানের সাহায্য সংস্থা জাইকার কছে চাওয়া হয় ৫০ কোটি ডলার ঋণ।