হিটলারের নির্দেশে যেভাবে রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবি সরিয়ে ফেলা হয়েছিল

22

সেখানে আছে সব মিলিয়ে পাঁচটি শিল্পকর্ম, পাখি এবং মানুষের ছবি। একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে লাল পোশাক পরা একটি মেয়ে।  

রঙিন কালি এবং জলরঙ দিয়ে এই ছবিগুলো এঁকেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভারতের এবং বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বিখ্যাত কবি।

এই ছবিগুলো ঠাঁই পেয়েছিল বার্লিনের একটি বিখ্যাত মিউজিয়ামে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন ইউরোপের বাইরে থেকে প্রথম কেউ, যিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। ১৯৩০ সালে তিনি এই ছবিগুলো জার্মানিকে উপহার দেন।

কিন্তু সাত বছর পর নাৎসি শাসকরা এই ছবিগুলো বাতিল করে দেয়, কারণ তারা তখন কিছু কিছু শিল্পকর্মকে ‘আপত্তিকর’ বলে তালিকাভুক্ত করছিল।

তাদের মতে শিল্পকর্ম হিসেবে এগুলো কোন জাতের মধ্যেই পড়ে না।   

হিটলার নিজেই ছিলেন শিল্পী হিসেবে ব্যর্থ। তিনি ইমপ্রেশনিস্ট পরবর্তী আধুনিক চিত্রকলাকে ‘বিকৃত মনের প্রকাশ’ বলে মনে করতেন। 

এজন্যে তিনি ১৬ হাজার শিল্পকর্ম জার্মান জাদুঘরগুলো থেকে সরিয়ে নিতে বলেছিলেন। এর মধ্যে ভ্যান গগ এবং ম্যান রে’র মতো শিল্পীর কাজও ছিল।  

নাৎসিরা এসব শিল্পকর্মকে ‘অবক্ষয়’ বলে গণ্য করতো এবং এমনকি একটি প্রদর্শনীরও আয়োজন করেছিল এগুলোকে বিদ্রূপ করার জন্য।  

তবে শিল্পকর্মের বিরুদ্ধে হিটলারের এই কুখ্যাত অভিযানের সময় কেন রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবিকে টার্গেট করা হয়েছিল সে বিষয়ে খুব কম তথ্যই পাওয়া যায়।

শিল্পকলার ইতিহাস নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের ধারণা, রবীন্দ্রনাথের শিল্পকর্ম ছিল আধুনিক ধারার, কাজেই এগুলো নাৎসিদের সহজ টার্গেটে পরিণত হয়েছিল।

হিটলার একবার বলেছিলেন, “যারা আকাশকে সবুজ দেখে এবং সবুজ রঙে আঁকে, কিংবা মাঠ আঁকে নীল রঙে, তাদেরকে নির্বীজ করে দেয়া উচিৎ।” 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জার্মানি সফরে গিয়েছিলেন তিনবার- ১৯২১, ১৯২৬ এবং ১৯৩০ সালে। তার দুই ডজন বই  ততদিনে জার্মান ভাষায় পাওয়া যাচ্ছে।

“তিনি যেখানেই বক্তৃতা দিতে যাচ্ছেন, সেখানেই হলভর্তি মানুষ। সংবাদপত্রগুলোতে রিপোর্ট আসছে, যারা হলে ঢুকতে পারছে না তাদের মধ্যে রীতিমত ধাক্কাধাক্কি-মারামারি হচ্ছে,” বলছিলেন মার্টিন কাম্পচেন, যিনি রবীন্দ্রনাথের অনেক কাজ অনুবাদ করেছেন।

স্থানীয় গণমাধ্যমে তখন রবীন্দ্রনাথকে ‘প্রাচ্যের এক জ্ঞানী মানুষ’ বলে পরিচয় করিয়ে দেয়া হচ্ছে। তাকে বর্ণনা করা হচ্ছে এক ঈশ্বরপ্রেরিত, রহস্যময় উদ্ধারকর্তা রূপে।

রবীন্দ্রনাথের আঁকা প্রায় তিনশো শিল্পকর্মের একটি একক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল ইউরোপের বিভিন্ন দেশে।

এরমধ্যে একশো ছবির প্রদর্শনী হয় প্যারিসে। এর অর্ধেক আবার প্রদর্শিত হয়েছে বার্লিনের ন্যাশনাল আর্ট গ্যালারিতে। এরপর এই প্রদর্শনী যায় লন্ডনে।