জেলহত্যা দিবস : ষড়যন্ত্রের পূর্বাপর

11

শেখর দত্ত : ৩ নভেম্বর জেলহত্যা দিবস। ৪৭ বছর আগে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর রাতটা ছিল একদিকে নিষ্ঠুরতম, অন্যদিকে বেদনাভরা। খালেদ মোশাররফের ক্যুয়ের পরপর সকালে যখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বঘোষিত খুনিদের ‘মিনি ক্যান্টনমেন্ট’ বনাম ক্যান্টনমেন্টজুড়ে যুদ্ধের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছে, জনগণ যখন ভীত-সন্ত্রস্ত ও বিভ্রান্ত; তখনও হত্যাকারীরা ছাড়া কেউ জানত না, জাতীয় চার নেতাকে জেলখানায় হত্যা করা হয়েছে।
খালেদ মোশাররফের ক্যু সংঘটিত হওয়ার পরই খুনিচক্র দুশ্চিন্তায় পড়ে এই ভেবে যে, খালেদ মোশাররফরা জেলখানা থেকে চার নেতাকে বের করে এনে ক্ষমতাসীন করবেন। তাই রাত ৩টার দিকে পূর্ব পরিকল্পনামতো স্বঘোষিত খুনি মেজর রশীদ আইজি প্রিজনের সঙ্গে টেলিফোনে দুবার কথা বলেন। প্রথমবারের সূত্র ধরে দ্বিতীয়বার বলেন, ক্যাপ্টেন মোসলেহউদ্দিনসহ কয়েকজন জেলগেটে যেতে পারেন। জাতীয় চার নেতার নামোল্লেখ করে আরও বলা হয়, তাদের যেন নেতাদের সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। জেলকোড অমান্য হবে বিধায় আইজি প্রিজন রাষ্ট্রপতি মোশতাকের সঙ্গে কথা বলে ‘ইতিবাচক জবাব’ পান।
কয়েক মিনিটের মধ্যে মোসলেহউদ্দিনসহ চারজন সেনাসদস্য জেলগেটে পৌঁছান এবং নেতাদের কাছে নিয়ে যেতে বলেন। বন্দুকের মুখে জেল কর্তৃপক্ষ তাদের সেলে নিয়ে যায়। পাশাপাশি দুটি সেলের একটিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমেদ আর অন্যটিতে মনসুর আলী ও কামারুজ্জামান থাকতেন। চারজনকে প্রথম সেলটিতে একত্র করা হয়। ঘাতক মোসলেহউদ্দিন খুব কাছে থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে তাদের ওপর গুলি চালান। তিনজন সঙ্গে সঙ্গে নিহত হন। তাজউদ্দীনের পায়ে ও হাঁটুতে গুলি লাগে। তিনি ‘পানি’ ‘পানি’ বলে কাতরাতে থাকেন। কেউই পানি নিয়ে আসার সাহস পায় না। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণে ধীরে ধীরে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
ইতিহাস কখনও কখনও খুবই নিষ্ঠুর হয়। বঙ্গবন্ধুসহ যে চার নেতা দেশবাসীর বহু আকাক্সিক্ষত স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব এবং জাতীয় পছন্দ অনুযায়ী জাতীয় চার মূলনীতিভিত্তিক সংবিধান উপহার দেন, তাদের বুকই গুলির আঘাতে খুনিচক্র ঝাঁজরা করে দেয়। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে দেশের প্রথম সফল প্রধানমন্ত্রী পানিটুকু চেয়েও পান না। ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ বিবেচনায় এটা সুস্পষ্ট যে, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী জাতীয় চার নেতা জেলখানায় নিহত হওয়ার বিষয়টা সেদিনই স্থির হয়ে যায় যেদিন বঙ্গবন্ধু সপরিবারে ঘাতকের নিষ্ঠুর বুলেটে শহিদ হন। জেলখানায় জাতীয় চার নেতার হত্যা ছিল সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যারই ধারাবাহিকতা। ৩ নভেম্বর জেল হত্যাকাণ্ডের অন্তর্নিহিত কারণ নিহিত রয়েছে প্রায় আড়াই মাস আগের ১৫ আগস্টের হত্যাকা-ের মধ্যে। তাই বাংলাদেশে হত্যা-ক্যুর ইতিহাস ও এর প্রভাব পর্যালোচনা করতে গেলে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের কাছে ফিরে যেতে হবে।

দুই
গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ভেতর দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের সাড়ে তিন বছরের মাথায় হত্যা-ক্যু, প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক শাসনের ঘোটচক্রের মধ্যে বাংলাদেশ পড়বে এমনটা বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত কল্পনা করাও ছিল কঠিন। কারণ পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক আমলে ক্যু ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আপামর জনগণের সংগ্রামের ভেতর দিয়েই বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল। আরও আশ্চর্যের বিষয় এই যে, দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির ১১ বছর পর দেশটি ক্যু ও সামরিক শাসনের অক্টোপাসের জালে আবদ্ধ হয়েছিল। ক্যু ছিল রক্তপাতহীন।
কিন্তু বাংলাদেশের প্রথম ক্যু পাকিস্তানের প্রথম সফল ক্যুয়ের তিন ভাগের এক ভাগ সময়ের আগে সংঘটিত হয়। পঁচাত্তরের আগস্টের কালরাতটি ছিল রক্তস্নাত ও বিভীষিকাময়। পৃথিবীর ইতিহাসের বর্বরতম ও নৃশংসতম ঘটনা সে-রাতে সংঘটিত হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে ঘাতকের নিষ্ঠুর বুলেটে নিহত হন। আরও লক্ষণীয় যে, পাকিস্তানে প্রথম সফল ক্যু করেছিল সামরিক বাহিনী, যে সামরিক বাহিনী ভারত বিভক্তির আন্দোলনে শামিল ছিল না; ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের পক্ষে। আর বাংলাদেশে সামরিক বাহিনী নয়, চাকরিরত ও সাবেক মেজররা তা সংঘটিত করে। সেনাবাহিনী হয় ঠুঁটো জগন্নাথ।
আরও দুর্ভাগ্যজনক যে, ক্যু ও সামরিক শাসন পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকালের ভিত্তি দ্বি-জাতিতত্ত্বের নীতিকে বদল করে না। ৩টি ক্যু (ইসকান্দার মীর্জা, আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়া খান) ধারাবাহিকভাবে ক্রমেই বেশি বেশি করে ধর্মকে সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ ও বৈষম্যের কাজে নগ্নভাবে যুক্ত করে। যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার বাহিনীর গণহত্যাসহ সকল মানবতাবিরোধী কর্মকা-ের ভেতর দিয়ে। বাংলাদেশেও পরপর ৩টি (মোশতাক, জিয়া, এরশাদ) সফল ক্যু সংঘটিত হয়। কিন্তু তা হয় জন্মলগ্নের মর্মবাণী জাতীয় চার মূলনীতি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রকে ধ্বংস বা বিকৃত করার হীন উদ্দেশ্য নিয়ে।
আরও দুর্ভাগ্যজনক যে, পাকিস্তানের ক্যু ও সামরিক শাসন ওই দেশের জাতির পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে হত্যা কিংবা তাকে অবমাননা বা ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করে না, ইতিহাসকে মিথ্যা ও বিকৃত তথ্যের ওপর প্রতিষ্ঠা করার পথ বেছে নেয় না। কিন্তু বাংলাদেশের ক্যু ও সামরিক শাসন সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যাই করে না, তাদের অবমাননা বা ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার এবং ইতিহাসকে মিথ্যা ও বিকৃত পথ গ্রহণ করে। এদিক বিচারে বাংলাদেশের উচ্চাভিলাষী সেনাশাসকরা নরাধম ও ইতিহাসের হন্তারক।
সেনাশাসকরা এরই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ও সমাজ-জীবনে পাকিস্তানি ধারার নীতিসমূহ যেমন রাজনীতি ও প্রশাসনকে সামরিকীকরণ ও সাম্প্রদায়িকতাকরণ, সামরিক আইনের মধ্যে ক্যান্টনমেন্টে বসে সুবিধাবাদী-সুযোগ সন্ধানীদের দিয়ে দল গঠন, হুকুমের গণতন্ত্র, মানি ইজ নো প্রবলেম ও রাজনীতি রাজনীতিকদের জন্য ডিফিক্যাল্ট করা প্রভৃতি নীতি ও পদক্ষেপ আমদানি করেন। এসব অনৈতিক ও কলঙ্কিত কাজ করার ভেতর দিয়ে রাজনীতিকে অস্ত্র ও অর্থের শক্তির কাছে পদানত করা হয়। রাজনীতিকে মানবকল্যাণ ও ত্যাগের মহান আদর্শ থেকে বিচ্যুত করে লালসা-ভোগের ধারায় নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। সমাজ ও রাজনীতিতে নতুন মোড়কে ফিরে আসে সবৈবভাবে পাকিস্তানি ধারা, যা ছিল বাংলাদেশকে ‘মিনি পাকিস্তান’ বানানোরই চক্রান্ত।

তিন
স্বাধীন বাংলাদেশে ক্যু ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক শাসনের ধারা যে ছিল বাংলাদেশকে নেতৃত্বশূন্য করে পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়া, তা দিনের আলোর মতোই সুস্পষ্ট। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যা খুবই আটঘাট বাঁধা ও পরিকল্পিত ছিল। পঁচাত্তরের ক্যুয়ের ছিল দুটো দিক, সামরিক ও রাজনৈতিক। দু-দিকের প্রস্তুতি ছিল খুবই নিখুঁত। দেশের ভেতরে-বাইরের মাস্টারমাইন্ডদের পরিকল্পনা ও আশ্রয়-প্রশ্রয় ছাড়া বিদ্রোহী মেজরদের পক্ষে বিচ্ছিন্নভাবে এই কাজ করা আদৌ সম্ভব ছিল না। এটা কার না জানা যে, ষড়যন্ত্র-চক্রান্তমূলক ঐতিহাসিক নিষ্ঠুর-রক্তাক্ত ঘটনা যতই গোপনে সংঘটিত করা এবং পাথরচাপা দেওয়া কিংবা মিথ্যা-বিকৃত প্রতিপন্ন হোক না কেন, কালপ্রবাহে ইতিহাস তাকে কম-বেশি প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। এটাই ইতিহাসের সবলতা।
১৫ আগস্টের চরম হৃদয়বিদারক ও দেশকে বিপরীতমুখী করার ঘটনায় দেশি-বিদেশি পরাজিত শক্তি যারা কলকাঠি নেড়েছেন বা সুদূরপ্রসারী নীলনকশা প্রণয়ন করেছেন বা সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে নীলনকশা স্থায়ী করতে চেয়েছেন; ইতিহাস সেসব কুশীলবদের অনেকটাই প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। সর্বোপরি পঁচাত্তরে মেজরদের দ্বারা সংঘটিত সফল ক্যুয়ের পর ক্ষমতার আসল বেনিফিশিয়ারি বা ভোগকারী কারা হয়েছেন, তা দিয়েও অনুধাবন করা যায়, ঘটনার পেছনে দেশি-বিদেশি কোনো ব্যক্তি-শক্তি-মহল সক্রিয় ও কার্যকর ছিল। এটাও স্বতঃসিদ্ধ যে, সময় যত অতিক্রান্ত হবে, ততই ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের ষড়যন্ত্রে-চক্রান্তের সবটা পরিষ্কার হতে থাকবে।

চার
একটু খেয়াল করলেই ঘটনাপ্রবাহ সুস্পষ্ট করে দেবে যে, মুক্তিযুদ্ধের ভেতরেই পঁচাত্তরের বিষময় বীজ রোপিত ছিল। এটা অনেকটা উত্থানের মধ্যে পতনের বীজ নিহিত থাকার মতো। তিন ক্ষেত্রের তিন বিরুদ্ধ শক্তির অবস্থান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বিদ্যমান ছিল। রসুনের গোড়ার মতোই কম-বেশি তিন শক্তির একত্র অবস্থান ছিল। প্রথমত; খন্দকার মোশতাক ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং মাহবুব আলম চাষী পররাষ্ট্র সচিব। তারা আমেরিকান দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে স্বাধীন বাংলাদেশ-বিরোধী তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। মোশতাক যদি তখন প্রতিনিধি দলের নেতা হিসেবে জাতিসংঘে যেতে পারতেন, তবে তিনি কী ঘোষণা দিতেন, কী করতেন এবং তাতে মুক্তিযুদ্ধের কী পরিণতি হতো; তা সহজেই অনুমেয়। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পরও খুনি মোশতাক মন্ত্রী হয়ে বিড়াল তপস্বী সেজে নিজেদের শক্তি সঞ্চয় করে যেতে পারে। একেই বলে সরষেতে ভূত বা বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা!
দ্বিতীয়ত; একাত্তরের ২৫ মার্চ কালরাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু হলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বাঙালি অফিসাররা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তাদের কারও কারও মুক্তিযুদ্ধকে দেশ ও জাতির রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক মুক্তির লড়াই হিসেবে না দেখাটা অস্বাভাবিক ছিল না। সর্বোপরি পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গড়ে উঠেছিল রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে কায়েমি স্বার্থের রক্ষক হিসেবে। তারা রাজনীতিকদের থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায় যোগ্য, এমন ভাবাটাই ছিল তাদের শিক্ষা। তদুপরি ভারতে থেকেও ভারত থেকে সাহায্য পেয়েও কারও কারও মধ্যে ভেতরে ভেতরে অন্ধ ভারতবিরোধী মনোভাব বিরাজমান ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় এসব প্রবণতার বহিঃপ্রকাশও হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত সহায়-সম্বলহীন স্বাধীন দেশে এসব প্রবণতা গতিপ্রাপ্ত হয়। পাকিস্তান প্রত্যাগতদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্তিসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ-ঘটনা ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের সঙ্গে মিলেমিশে সেনাবাহিনীতে সরকারবিরোধী এক আবহাওয়া তৈরি করে। অস্ত্রের শক্তি রাজনৈতিক শক্তির প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে।
তৃতীয়ত; মুক্তিযুদ্ধ উপমহাদেশে দুই বিবাদমান অক্ষ সৃষ্টি করে। সোভিয়েত-ভারত-বাংলাদেশ অক্ষ এবং আমেরিকা-চীন-পাকিস্তান অক্ষ। আমেরিকা ও চীন পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে বাংলাদেশ-বিরোধী কূটনীতিক-সামরিক এমন কোনো তৎপরতা নেই, যা করেনি। বিশ্ব রাজনীতিতে একটা কথা স্বতঃসিদ্ধ যে, পরাশক্তির বিরুদ্ধে যদি কখনও কোনো দেশ অবস্থান নেয় এবং তাতে যদি পরাশক্তি সাময়িকভাবে পরাজয় মেনেও নেয়; কিন্তু প্রতিশোধ নিতে ছাড়ে না। স্বাধীনতার পর চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দিলেও আমেরিকা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে সাহায্য এবং খাদ্যচুক্তিও করে।
তবে পরাশক্তি আমেরিকা স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত অব্যাহত রেখে প্রতিশোধ নেওয়ার দিনক্ষণ খুঁজতে থাকে। খাদ্য হয় প্রতিশোধের অস্ত্র। প্রলয়ঙ্করী বন্যায় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির খাদ্য ঘাটতি আরও বেড়ে যায়। জ্বালানি তেল-খাদ্য প্রভৃতির আমদানি ব্যয় বৃদ্ধিতে ঘাটতি তহবিল শূন্য হতে থাকে। তখন খরায় ফসলহানির কারণে ভারত বলে দিয়েছিল খাদ্য রপ্তানি করতে পারবে না। আর সোভিয়েত ইউনিয়ন বিভিন্ন দেশ থেকে খাদ্য আমদানি করছিল। বাংলাদেশ তাই আমেরিকার কাছে হাত পাততে বাধ্য হয়। পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ পেয়ে যায় আমেরিকা।

পাঁচ
ইতিহাস পর্যালোচনায় এমনটা সুস্পষ্ট যে, পর্বতপ্রমাণ সমস্যা-সংকট মোকাবিলা করে কর্মসূচি বাস্তবায়িত করার মতো উপযুক্ত রাজনৈতিক-সামাজিক শক্তির অভাব নবজাত দেশটিতে বিরাজমান ছিল না। জনগণের চেতনার মান এমন সুউচ্চে ছিল না যে, ‘গণতন্ত্রের পথে সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কর্মসূচি নিয়ে অগ্রসর হওয়া যায়। তাতেই জনগণের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তিতে ব্যাপক ফারাক এনে দেয়। এর মধ্যে গণতন্ত্রের সুযোগ নিয়ে উগ্রবাম চীন-নকশালপন্থি ‘রাতের বাহিনী’ এবং সরকারের ভেতরে ‘চাটার দল’ পরিস্থিতিকে অস্থির ও অরাজক করে তোলে। এতে স্বাভাবিকভাবে জনগণের মধ্যে সৃষ্টি হয় হতাশা ও উদ্যোগহীনতা, যা হচ্ছে ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের আঁতুড়ঘর। তবে চেতনার মান ও সংগঠন শক্তি উপযুক্ত না হলেও লড়াই-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে গণতন্ত্র জাতীয় পছন্দ হিসেবে গণমনে অবস্থান করেছিল। বঙ্গবন্ধু দেশবাসীর পছন্দ অনুযায়ী গণতন্ত্র জাতীয় চার নীতির এক নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রকে দুঃখী মানুষের হাসি তথা সমাজতন্ত্রের অধীনস্ত করতে বাধ্য হন। বন্যা ও দুর্ভিক্ষের পর ঠা-াযুদ্ধ যুগে প্রগতি ও মুক্তির সহায়ক বিবেচনা করে তিনি বাকশাল গঠন করতে বাধ্য হন। পরিস্থিতি ভালো হতে থাকা অবস্থায় আরও ভালো হতে পারে বিবেচনায় নিয়ে প্রতিক্রিয়ার ওই অশুভ ত্রিধারা একত্রিত হয়ে প্রগতির শক্তির রক্ষক-ধারক-বাহক, বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধুকে আঘাত করে। ওই অশুভ শক্তি দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞতা থেকে ভালো করেই অনুধাবন করে যে, মৃত মুজিব হবে জীবিত মুজিবের মতো বা তার চেয়ে বেশি শক্তিশালী। তাই তাকে লোকচক্ষুর অন্তরালে নিতে টুঙ্গিপাড়ার নিভৃত গ্রামে নিয়ে কবর দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু রক্ত বা বংশের শক্তিও যে ‘তোমারে বধিবে যে গোকুলে বেড়েছে সে’-এর মতো হবে, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। তাই পরিবারসহ আঘাত হানে।

ছয়
ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে এটা সুস্পষ্ট হবে যে, ১৫ আগস্ট ক্যুয়ের মাস্টারমাইন্ডদের প্রতিভূ খন্দকার মোশতাক প্রথমে ‘কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা’র নীতি গ্রহণ করে। আওয়ামী লীগ দিয়েই আওয়ামী লীগকে বিপথগামী ও কলঙ্কিত করতে উঠেপড়ে লাগে। খুনি রাষ্ট্রপতি মোশতাক ভয় ও লোভ দেখিয়ে এই খুনি বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিসভার সব সদস্যকে মন্ত্রিপদ দিয়ে নিজ পক্ষে টানতে সক্ষম হয়। জেনারেল ওসমানীর সহায়তা-সাহায্যে ক্যান্টনমেন্টকে প্রাথমিকভাবে সামাল দিতে পারেন। মোশতাক আওয়ামী লীগকে দিয়ে বাংলাদেশকে দ্রুত ‘মিনি পাকিস্তান’ বানানোর তৎপরতা চালায়। সম্ভব নয় বুঝেও মাস্টারমাইন্ডরা এই তৎপরতার পক্ষে থাকে এজন্য যে, বাংলাদেশের জন্য পরাজিত প্রতিক্রিয়ার কোন অবস্থান ভারসাম্যমূলক হবে তা পরখ করা।
খন্দকার মোশতাক সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের বড় অংশকে নিজের পক্ষে সমবেত করতে পারলেও চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী ও কামারুজ্জানকে ভয় ও লোভ দেখিয়ে তার পক্ষে নিতে পারে না। তাদেরসহ আরও কয়েকজন নেতা ও যুব নেতাদের জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। জাতীয় চার নেতা বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে জাতিকে বিজয়ী করেছে। তাই খুনি মোশতাক ও সহযোগী মেজরদের ভয় ছিল, জেলে থাকলেও যে কোনো সময় জাতীয় চার নেতা তাদের ক্ষমতার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। একইভাবে খুনিদের ভয় ছিল সেনাবাহিনীতেও মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে অবস্থান নিয়ে ক্যু সংঘটিত হতে পারে। সেনাপ্রধান জিয়া উচ্চাভিলাষী হওয়ায় তাকেও খুনিচক্র আস্থায় নিতে পারে না।
তাই ক্ষমতাকে সুরক্ষিত রাখতে সামরিক বাহিনীর বিপরীতে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে ট্রাংকসজ্জিত বিদ্রোহী মেজরদের দিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘মিনি ক্যান্টনমেন্ট’ গড়ে তোলে। বঙ্গভবনকে করে ট্যাংকসজ্জিত। এর উদ্দেশ্য হয়, যদি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে চ্যালেঞ্জ আসে, তবে যেন তা প্রতিহত করার সম্ভব হয়। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো যে ক্ষমতালোভী সেনাপ্রধান জিয়া বিদ্রোহী মেজরদের এই বে-আইনি অবস্থান মেনে নেন। ক্ষমতাসীন এই খুনিচক্র আগে থেকে এমন নীলনকশা প্রণয়ন করে, যাতে সেনাবাহিনী থেকে চ্যালেঞ্জ এলে তারা দ্রুত জেলখানায় প্রবেশ করে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করতে পারে। কারণ জাতীয় চার নেতা ছিলেন খুনি মোশতাকের ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীই নন, সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হওয়ায় ক্ষমতার দাবিদারও।

সাত
বাস্তবে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে সেনা আইন ভঙ্গকারী বিদ্রোহী মেজরদের ‘মিনি ক্যান্টনমেন্ট’ স্থাপন করার বিষয়টা সহ্য করার মতো অবস্থা সেনাবাহিনীর থাকে না। সেনাপ্রধান জিয়ার নীরবতা-নিষ্ক্রিয়তায় সেনাবাহিনীতে অস্থিরতা চলতে থাকে। পঁচাত্তরের ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে পাল্টা ক্যু সংঘটিত হয় এবং সেনাপ্রধান জিয়া গৃহবন্দি হন। পাল্টা ক্যুয়ের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এবং শাফায়েত জামিলসহ সাথীদের খুনি মোশতাককে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে সরিয়ে ক্ষমতা দখলের কোনো পরিকল্পনা ছিল না।
ক্যু মানে হচ্ছে ক্ষমতা দখল, তাই এটাকে ক্যু বলা কতটা সঠিক, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকাটা স্বাভাবিক। এটাকে অপরিকল্পিত আধখেঁচরা ও লক্ষ্যহীন বলে অভিহিত করা সংগত। এটা হয়ে দাঁড়ায় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠা এবং সেনাপ্রধান জিয়ার বিরুদ্ধে পরিচালিত একটা বিদ্রোহ, যা ট্রেড ইউনিয়নের মতো কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি-দাওয়া মেনে নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়ারই নামান্তর।
৩ নভেম্বর সকালে খালেদ মোশাররফসহ তার সাথীরা সরকারের কাছে ৩টি প্রস্তাব পেশ করেন। এক. ট্যাংক ও কামান বঙ্গভবন থেকে ক্যান্টনমেন্টে ফেরত পাঠাতে হবে। দুই. জিয়া এখন থেকে আর সেনাপ্রধান নন। তিন. বঙ্গভবনে বসে ফারুক-রশীদ দেশ চলাতে পারবে না। তাদের ক্যান্টনমেন্টে ফিরে গিয়ে ‘চেইন অব কমান্ড’ মানতে হবে। চার. খন্দকার মোশতাক আপাতত প্রেসিডেন্ট থাকবেন। এই দাবি নিয়ে সারাদিন আলোচনার পর এক পর্যায়ে মোশতাক দাবিনামা গ্রহণ না করে বলেন, মন্ত্রী পরিষদের অনুমোদন ব্যতীত তিনি এককভাবে কিছুই করতে পরবেন না।
ধূর্ত মোশতাক পদত্যাগ করার কথা বলে চাপও দেন। মোশতাকের সহযোগী সামরিক উপদেষ্টা ওসমানী চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠা তথা মেজরসহ তাদের অনুগত সৈন্যদের ক্যান্টনমেন্টে ফিরে যাওয়ার প্রস্তাবে রাজি হন। কিন্তু খুনিচক্র তাতে রাজি হলো না। বাস্তবে ট্যাংকসজ্জিত থাকলেও সরকারের সমর্থক খুনি মেজরদের নেতৃত্বে স্বল্প সংখ্যক সৈন্যদের পক্ষে ক্যান্টনমেন্টের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব ছিল না।
তারা দেশের বাইরে চলে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। মোশতাক ভয় পেয়ে নিজেও সঙ্গে যেতে চান। প্রথমে খালেদ মোশাররফ তা মেনে নেন না। শেষ পর্যন্ত খালেদ-শাফায়েত ও তাদের সহযোগীরা ঠিক করেন, মোশতাক বাদে খুনি মেজরদের বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়াটা দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্রুততার সঙ্গে সব ব্যবস্থা সম্পন্ন করে। রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশ বিমানের একটি প্লেনে ১৫ আগস্টের হত্যাকা-ের সঙ্গে সরাসরি জড়িত মেজরসহ ১৭ জন ব্যাংককের উদ্দেশে দেশত্যাগ করে। এসবই ঘটে জনগণের জানার বাইরে পর্দার অন্তরালে।

আট
খালেদ মোশাররফের ক্যুয়ের আগেই ডাকসু, ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল, ৪ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাসায় মিছিল করে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন করা হবে। খালেদ মোশাররফের ক্যুয়ের পর মোশতাক সরকার আছে কিংবা নেই নিয়ে অনিশ্চিত অবস্থার সৃষ্টি হওয়ার পরও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের কর্মসূচি সফল করার প্রস্তুতি চলতে থাকে। জেলখানায় চার নেতার হত্যা সম্পর্কে জানা না থাকায় আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় সারির নেতারা ও কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক উদ্যোগ এ পর্যায়ে লক্ষণীয় হয় এবং জাতীয় চার নেতাকে জেল থেকে বের করে নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণের উদ্যোগ দানা বেঁধে ওঠে।
৪ নভেম্বর সকাল সাড়ে ৮টার দিকে খালেদ মোশাররফ ও শাফায়েত জামিল জানতে পারেন, জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। এর আগেই সেনাবাহিনীতে খবর ছড়িয়ে পড়ে জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধানের পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। সাদা কাগজে লিখিত পদত্যাগপত্রে পেনশনের আবেদনও করা হয়েছে। চাপে পড়ে তিনি এই পদত্যাগপত্র দিয়েছেন কথাটাও প্রচারিত হয়। সেনাবাহিনীতে তার পক্ষে অফিসার ও সৈনিকরা ছিলেন। তিনি সৎ একজন অফিসার এবং ক্যু-হত্যার সঙ্গে জড়িত না থাকার কথাগুলো প্রচারিত হতে থাকায় তার প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টি হয়।
পৃথিবী বীরভোগ্যা। খালেদ ক্ষমতা দখল করার ক্ষেত্রে বীরত্ব দেখাতে ব্যর্থ হন। সময় হচ্ছে সবকিছুর নিয়ন্ত্রক। কোনো সমাধান ছাড়া পরিস্থিতি ঝুলন্ত থাকলেও খালেদ নিজের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে পারেন না। জিয়ার পক্ষের লোকরা সময় পেয়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে খবর পাওয়া যায়, জেলখানায় চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। এ খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গে খালেদ বিব্রত হয়ে পড়েন। কেননা তিনি বঙ্গবন্ধু ও জেল হত্যাকারীদের দেশ থেকে পালানোর অনুমতি দিয়েছেন। খুনি মোশতাককে ক্ষমতায় রেখেছেন। ১০টার দিকে খালেদ মোশাররফ বিমান ও নৌবাহিনীর প্রধানকে সঙ্গে নিয়ে গণভবনে আসেন। হাতে তার জিয়ার পদত্যাগপত্র। তিনি মনে করলেন, এখন তাকে সেনাপ্রধান নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো বাধা থাকবে না।
কিন্তু ধূর্ত ও ঝানু রাজনীতির মোশতাক দুটো শর্ত দেন। এক. মন্ত্রিসভার বৈঠক ছাড়া এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। দুই. খালেদ মোশাররফ ও দুই বাহিনীর প্রধানকে মোশতাকের আনুগত্য স্বীকার করতে হবে। এ দুই শর্ত পূরণ হলেই কেবল তাকে সেনাপ্রধান নিয়োগ করা হবে। নতুবা তিনি পদত্যাগ করবেন। মোশতাক ও ওসমানী চাইছিলেন কালক্ষেপণ করতে। খালেদ কেবল সময়ই দেন না। বিস্ময়ের বিষয় হলোÑ দুই শর্তের প্রতিও তিনি নতজানু নীতি গ্রহণ করেন। বিকালে মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকেন রাষ্ট্রপতি মোশতাক। এই বৈঠক ডাকার ভেতর দিয়ে খালেদের ভাগ্য স্থিরীকৃত হয়ে যায়।
৪ নভেম্বর সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিরাট জমায়েত শেষে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য ৩২ নম্বর বাড়ি অভিমুখে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ও ব্যানারসহ মৌন শোক মিছিল বের হয়। সামরিক আইনের বিধিনিষেধ ও ভয় উপেক্ষা করে মিছিল যতই রাস্তা অতিক্রম করতে থাকে, ততই অগণিত মানুষ মিছিলে যোগ দিতে থাকে। মিছিল নীলক্ষেত এলাকায় পৌঁছালে সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাধা দেয়। পরে খালেদ মোশাররফের হস্তক্ষেপে মিছিল এগিয়ে যায় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের দিকে। এই মিছিলে চলমান ক্যুয়ের নেতা ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের বৃদ্ধা মা ও ভাই আওয়ামী লীগ নেতা রাশেদ মোশাররফসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যোগ দেন। মিছিলের সবটা ৩২ নম্বরে পৌঁছার আগেই মিছিলকারীরা জানতে পারেন জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে ৩ নভেম্বর দিবাগত রাতে হত্যা করা হয়েছে, মোশতাক এই হত্যাকা-ের হুকুমদাতা। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ক্ষোভে উত্তপ্ত ও বেদনায় সিক্ত ছাত্রনেতারা পরদিন ৫ নভেম্বর ঢাকায় হরতাল, সারাদেশে প্রতিবাদ কর্মসূচি এবং জেলখানায় নিহত জাতীয় চার নেতার জানাজা পড়ার ঘোষণা দেয়।

নয়
জেলখানায় জাতীয় চার নেতার হত্যাকা- দেশের রাজনীতির ইতিহাসে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের ধারাবাহিকতায় একটি চরমতম কলঙ্কজনক ও বেদনাময় ঘটনা। এক নৃশংসতা হত্যাকা- সফল হওয়ার প্রেক্ষিতে আরেক নৃশংসতা হত্যাকাণ্ড অনিবার্য ছিল। এ দুই ঘটনার ভেতরে দিয়ে পাকিস্তানি আমলে গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে দেশে যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে ওঠে, তার অবসান ঘটে। রাজনীতি আর রাজনীতিবিদদের হাতে থাকে না। সামরিক কর্তারাই সর্বেসর্বা হয়ে ওঠে। দেশ পড়ে হত্যা-রক্তপাত, ক্যু-পাল্টা ক্যুয়ের মধ্যে। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, ১৫ আগস্টের সফল ক্যু ছিল রক্তক্ষয়ী চরম প্রতিক্রিয়াশীল এবং প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ পরাজিত শক্তি ছিল এর নেতা। খালেদ-শাফায়েতের ক্যু ছিল রক্তপাতহীন এবং জাতীয় রাজনীতির মূলধারা তথা মধ্যপন্থার সমর্থক। সেনাবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের একাংশ তা সংঘটিত করে। পরে ৭ নভেম্বর সিপাহীদের বিদ্রোহ বা সংঘটিত ক্যু উগ্র-বামপন্থি দলের দ্বারা পরিচালিত হয়। তা ছিল রক্তক্ষয়ী। বাস্তবে জাসদ তথা উগ্র-বামপন্থিদের দ্বারা এই ক্যু সংঘঠিত হলেও তা ব্যর্থ হয় এবং ক্যু ডান প্রতিক্রিয়াশীল তথা জিয়ার নেতৃত্বে সেনাচক্র কব্জা করে। ধাক্কা দেওয়া হয় উগ্র বাম দিক থেকে আর ফায়দা লোটে ডান ও প্রতিক্রিয়াশীলরা।
ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও ক্যুয়ের ভেতর দিয়ে সেনাশাসক জিয়া যেমন ক্ষমতায় বসেন, ঠিক তেমনি সেনাশাসক এরশাদও রক্তপাতের ভেতর দিয়েই ক্ষমতায় বসেন। এদিক বিচারে বাংলাদেশে সফল ৩টি ক্যু-ই রক্তাপ্লুত ও হিংস্র এবং সংবিধানবিরোধী, যড়যন্ত্রমূলক ও অবৈধ। উচ্চাভিলাষী সেনা অফিসাররা এর নায়ক। ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত এবং অবৈধ পথে ক্ষমতায় গিয়ে যে ভালো কোনো কাজ হয় না, মোশতাক-জিয়া-এরশাদের শাসনামলই এর প্রমাণ। যত দিন যাবে ততই এসব শাসকরা ইতিহাসের নিষ্ঠুর কষাঘাতে নিন্দিত হতে থাকবেন।

দশ
ইতিহাস এটাই বলে যে, বিপ্লবের পিছু পিছু আসে প্রতিবিপ্লব ও অতিবিপ্লব এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিবিপ্লব বিজয়ী হয়। প্রতিবিপ্লব বিপ্লবীদের জীবনকেই কেবল ছিনিয়ে নেয় না, চেতনাকেও হত্যা করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালি জাতির গণবিপ্লব, যা ছিল জনগণের রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষাভিমুখী। অতিবিপ্লব ও প্রতিবিপ্লবের টানাপোড়নের ভেতর দিয়ে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার নিহত হওয়া এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকৃত করা ছিল নিয়তির মতোই ইতিহাসের অনিবার্য পরিণতি। এ পরিণতি বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে রাজনীতির দুটো সত্যকে প্রমাণ করে।
প্রথমত; প্রতিক্রিয়া সব সময়েই হয় নিষ্ঠুর। জাতীয় রাজনীতির মূলধারা কখনও নিষ্ঠুর হতে পারে না। রক্তক্ষয় চায় না। দ্বিতীয়ত; ইতিহাসের রাজনৈতিক ভিলেনরা ক্ষমতা আসে ঠিকই; কিন্তু রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে প্রথমে ঘটনা আসে বিয়োগান্ত নাটক হিসেবে, তারপর হয় প্রহসনের নাটক। হত্যা-ক্যু ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক শাসনের অক্টোপাসে আবদ্ধ বাংলাদেশের রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে সেনাশাসক জিয়া যদি হন বিয়োগান্ত নাটকের নায়ক, তবে সেনাশাসক এরশাদ প্রহসন নাটকের নায়ক। জিয়া হত্যা এবং এরশাদের বিদায় উল্লিখিত স্বতঃসিদ্ধতাকে আবারও প্রমাণ করে।
তবে আশার সঞ্চারিত করে এজন্য যে, অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীরা দেশের সাংবিধানিক ও নিয়মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা যাতে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে সে-জন্য বিধিব্যবস্থা পাকা করা হয়েছে। মোশতাক, জিয়া ও এরশাদ আমলের হত্যা-ক্যু ও সামরিক শাসনকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন মহামান্য আদালত। বাংলাদেশের সংবিধানে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সংবিধান বহির্ভূত ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো বিধান ছিল না। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী সংবিধান বহির্ভূত ক্ষমতা দখলকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা তথা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে। জেলহত্যার শোকের মাস নভেম্বরে এটাই একান্ত কামনা যে, বাংলাদেশ আবারও আর কোনোদিন যেন ক্যু-পাল্টা ক্যু ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক শাসনের অক্টোপাসের জালে আবদ্ধ না হয়। সংবিধান সমুন্নত থাকুক।
রক্তাপ্লুত নভেম্বর মাসে জাতির পিতা ও জাতীয় চার নেতার প্রতি জানাই অবনতচিত্তে সশ্রদ্ধ প্রণতি।

লেখক : সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, উত্তরণ