বিএনপির জনসভা ও রাজনৈতিক শক্তি

4

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তরে বলেছেন, ‘বিএনপির চট্টগ্রামের জনসভায় এক লাখের মতো লোক হয়েছে বলে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীও তাঁকে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছেও একই খবর।’ জনসভা বা অন্য কোনও কারণে লোকসমাবেশের সংখ্যার হিসাব করতে আমদের দেশে সাধারণত লোকসংখ্যা নির্ধারণের যে সঠিক পদ্ধতিগুলো সেগুলো এখন ওইভাবে ব্যবহার করা হয় না। রিপোর্টার হিসেবে আতাউস সামাদ ভাই এবং নিউজ এডিটর হিসেবে এ বি এম মূসা ভাই-ই মনে হয় শেষ জেনারেশন– যারা এগুলো নিঁখুতভাবে করার চেষ্টা করতেন। এখন সাংবাদিকরা যে জানেন না তা নয়, তবে ওই পদ্ধতি অনুসরণ করে লোকসংখ্যার হিসাব দিলে, রাজনৈতিক দল বা নানান সংগঠনের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। তাই ওই চর্চা উঠে গেছে। তবে তারপরও বিএনপির চট্টগ্রামের জনসভার লোকসংখ্যা যাই হোক না কেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্যই সঠিক, ‘এ জনসভাকে কোনও মতে ফ্লপ বলা যাবে না’। অর্থাৎ সফল জনসভা বিএনপি করেছে। এরপরে এই লেখা যখন লিখছি, তখন অবধি বিএনপি পরবর্তী জনসভা করেছে ময়মনসিংহে।

ময়মনসিংহের ওই মাঠের অনেক জনসভায় উপস্থিত থেকে অনেক রিপোর্ট নব্বইয়ের দশকে করেছি। তাই ওই মাঠ পরিচিত। বিএনপির জনসভায় ওই মাঠ পূর্ণ হয়েছিল বলে বলা হচ্ছে। যদি পূর্ণ হয়ে থাকে তাহলে বলা যায় বিএনপির ওই জনসভাও সফল হয়েছে। কিন্তু মিডিয়ার রিপোর্ট যতটা লক্ষ করেছি, তার ভেতর দিয়ে জানতে পারেনি– ওই জনসভায় বিএনপির নেতাকর্মীর বাইরে সাধারণ মানুষ কত শতাংশ অংশ নিয়েছিল। কারণ, দলীয় নেতাকর্মীর বাইরে যখনই সাধারণ মানুষ কোনও রাজনৈতিক দলের জনসভায় অংশগ্রহণ করে, তখনই ধরে নেওয়া যায় বাস্তবে এটা রাজনৈতিকভাবে সফল জনসভা।

অন্যদিকে যদিও এটা কোনও সার্বিক জরিপ করা পরিসংখ্যান নয়, তারপরেও বিভিন্ন সময়ের তাৎক্ষণিক ছোট ছোট জরিপ ও নানান হিসাবের ভেতর দিয়ে যে বিষয়টি লক্ষ করা যায়– তা হলো বাংলাদেশের মানুষের যদিও অনেক প্রিয় বিষয় রাজনীতি, এখানে রাজনীতিকদের ছাড়িয়ে কোনও সমাজ সংস্কারক, বুদ্ধিজীবী বা শিল্পী কম মানুষের অনুকরণীয় হন। তারপরেও এ দেশে রাজনীতি করে সব মিলিয়ে দেশের মোট জনসংখ্যার ২২ থেকে ২৫ ভাগ মানুষ। এই ২২ থেকে ২৫ ভাগ মানুষই মূলত দুটো শিবিরে কম-বেশি ভাগ হয়ে আছে এখন। তারপরেও এই বিশ থেকে পঁচিশ ভাগ মানুষ সবাই কিন্তু রাজনৈতিক কর্মী নন বা তাদের নিজ নিজ শিবিরের জনসভায় যাওয়ার মানুষও নন। কোনও এলাকায় কারা সবসময় কোন দলের মিছিল মিটিংয়ে যায়, এর একটা হিসাব সবসময়ই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে থাকে। কারণ, যখন যারা বিরোধী শিবিরে থাকে তাদের দমন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করা এ দেশের রাজনৈতিক কালচার। যেহেতু দেশের দুই শিবিরই মাঝে মাঝেই বিরোধী দলে থেকেছে- এ কারণে উভয়েরই একটা হিসাব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আছে। এদের সংখ্যা ৮ কোটি ভোটার ও ষোল কোটি মানুষের দেশে সর্বোচ্চ ৬০ লাখের মতো দেশজুড়ে।

এই ৬০ লাখকে দেখা যায়, যখন যারা সরকারে থাকে তাদের সঙ্গে ৩৫ বা ৪০ লাখ থাকে আর যারা বিরোধী শিবিরে থাকে তাদের সঙ্গে ২০ থেকে ২৫ লাখ থাকে। তাই যতক্ষণ অবধি যেকোনও দলের জনসভায় সাধারণ মানুষ না আসবে ততক্ষণ অবধি সারা দেশে এই আন্দোলন মূলত ২০ লাখ মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

সিনিয়র ও মাঠ থেকে উঠে আসা রাজনীতিবিদরাও এটা আরও সঠিকভাবে জানেন। তবে তারপরও তারা এই ২০-২৫ লাখ মানুষ নিয়ে সারা দেশে আন্দোলন করেন এই ভরসায় যে কোনও একসময়ে তাদের সঙ্গে সাধারণ মানুষ এসে যোগ দেবে। এবং তারপরে তারা রাজপথকে অস্থির করে ক্ষমতাসীন সরকারের পতন ঘটাবে। এবার হয়তো বিএনপিরও সেই আশা। যদিও আন্দোলন করে কোনও সরকারের পতন ঘটানোর ইতিহাস বিএনপির নেই। তারা এরশাদ সরকার পতনের কৃতিত্ব অনেকখানি দাবি করে। কিন্তু ওই সময়ে যারা রাজপথের রিপোর্টার তারা সবাই জানেন, বিএনপি আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল না। কারণ, তারা তখন এই বিশ বা পঁচিশ লাখ বা সে সময়ের হিসাবে দশ থেকে পনের লাখ কর্মীরও অধিকারী ছিল না। তাদের একটা বড় অংশ এরশাদ নিয়ে গিয়েছিল। এবং সেটাও এখান থেকে তিন দশক আগের বিষয়।

তবে বিএনপির জনসভা করার পাশাপাশি তাদের সরকারবিরোধী আন্দোলনের যে চেষ্টা তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তারা তিন দশক আগের ধারার আন্দোলন করতে চাচ্ছে। অন্যদিকে সরকারও যেভাবে আন্দোলন প্রতিহত করার চেষ্টা করছে তাও তিন দশক আগের সেই স্টাইল।

অর্থাৎ ট্রান্সপোর্ট বন্ধ রাখা, পথে পথে বিরোধী কর্মীদের বাধা দেওয়া- এটা মূলত তিন দশক কেন, চার দশক আগের বিষয়। কারণ, এই কালচার চালু হয়েছে ৭৫ পরবর্তী সামরিক সরকারের হাত ধরে। ৭৭-এ পিপিআরের মাধ্যমে রাজনৈতিক অধিকার পেলেও আওয়ামী লীগ কিন্তু ওই সময় বাধা ছাড়া কোনও রাজনৈতিক জনসভা করতে পারতো না। অর্থাৎ সেই থেকে এ অবধি বিরোধী দলের জন্যে একই ভাগ্যলিপি বরাদ্দ আছে। অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, তারপরও তো সামরিক শাসনামলে আওয়ামী লীগ রাজপথ কাঁপিয়েছে। এর সব থেকে বড় কারণ হলো, দেশে রাজনীতির বাইরে যে ৭০ ভাগের বেশি মানুষ, তাদের একটি বড় অংশের মানসিক সাপোর্ট ছিল আওয়ামী লীগের প্রতি। কারণ, এদের মধ্যে অনেকে আওয়ামী লীগ না করলেও তারা বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় চার নেতার নির্মম হত্যাকাণ্ডকে বর্বরোচিত হিসেবেই মনে করতেন।

তাছাড়া বাংলাদেশ যে পাকিস্তানের থেকে অনেক বেশি বাঙালি মুসলিমের ভাগ্য পরিবর্তনে সহায়ক হবে এটাও সকলে বুঝতেন। তাই বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্যে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার নির্মম হত্যাকাণ্ডের কারণে ওই সময়ের মানুষ অনেকেই তার প্রতিবাদ মনে মনে চাইতো। তাই ৭৫-এর পর শুরু থেকেই আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক কর্মীর বাইরের মানুষের একটি অংশের একটা নীরব সমর্থন পায়। আবার শেখ হাসিনা ৮১ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এলে বঙ্গবন্ধুকন্যা হিসেবে তিনি এই মানুষদের আরও বেশি ভালোবাসা পান। যা আওয়ামী লীগের আন্দোলনে সহায়ক ছিল। তাছাড়া ওই সময়ে যারা রাজপথের কর্মী তাদের বেশিরভাগ ষাটের দশকের আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের ভেতর দিয়ে আসা। রাজনৈতিক কর্মী  হিসেবে বর্তমান যারা রাজপথে স্লোগান দেয় তাদের থেকে এদের কমিটমেন্টও বেশি ছিল। এর বিপরীতে সামরিক শাসকদের মাধ্যমে সৃষ্ট দলগুলো যে জনসমর্থন পায় তা ছিল মূলত মুসলিম লীগ, চৈনিক বাম ও আওয়ামী লীগের সুবিধাবাদী গ্রুপের সমর্থন। এরা সামরিক শাসক সৃষ্ট দলের নেতা হয়ে নিজ নিজ এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে ঠিকই তবে নিজস্ব আদর্শের রাজনীতি ও ক্ষমতাসীন সরকারি দলের রাজনীতির সঙ্গে মিল না থাকায় তারা মূলত শতভাগ মানসিক শক্তি নিয়ে রাজনীতি করতে পারেনি কখনও। এবং এটা সম্ভবও হয় না। উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যুব রাজনীতি থেকে আওয়ামী লীগ অবধি অলি আহাদ ও পরবর্তী অলি আহাদের পার্থক্য, তেমনি আওয়ামী লীগের ওবায়দুর রহমান আর সামরিক শাসকের দলের ওবায়দুর রহমানের পার্থক্য।

এমনকি এই মুহূর্তে সরকারি দলের দিকে তাকালেও দেখা যায়, সুবিধাবাদী ও ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া নেতাকর্মী এবং আগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে পার্থক্য অনেক। আবার নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, রফিক আজাদ, মোহাম্মদ রফিক, মুহাম্মদ নূরুল হুদা ও ত্রিদিব দস্তিদার এদের লেখায় রাজনৈতিক নেতা বঙ্গবন্ধুকে খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু বর্তমানের সুবিধাবাদী কবিদের কবিতায়, বঙ্গবন্ধু তুমি বাংলার আকাশ, তুমি বাংলার বাতাস, তুমি চিরকাল থাকবে- এই বলেই শেষ হয়ে যায়। এমনকি প্রথমে উল্লিখিত কবিদের কবিতায় যেমন বঙ্গবন্ধু হত্যার নির্মমতাও আসতো, সেটাও এদের কবিতায় নেই। এই যে সার্বিক পার্থক্য এটাই আগে বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে আওয়ামী লীগ কর্মীদের পার্থক্য ছিল। আর এ কারণেই আওয়ামী লীগের রাজপথের বিজয়ের ইতিহাস বেশি ও নব্বইয়ের এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি তারা ছিল।

যা হোক, এখন বর্তমান সরকারবিরোধী একটা আন্দোলন গড়ে তুলে তার মূল চালিকাশক্তি হতে চাচ্ছে বিএনপি। এবং তাদের ওই সারা দেশের বিশ থেকে পঁচিশ লাখ কর্মী বেশ উজ্জীবিত। অন্যদিকে তাদের নেতারা শুধু সরকার পতনের আন্দোলনের জন্যে ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে অর্থাৎ বর্তমান সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে– এই দাবিতে সব দল-মতের ছোট ছোট রাজনৈতিক দল নিয়ে একটি বৃহৎ জোট গড়তে চাচ্ছে। অন্তত একটি দাবিতে তারা একমত হয়ে আন্দোলন করতে চাচ্ছে যে বর্তমান সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে। তারা এর সপক্ষে সব থেকে বড় যুক্তি দেখাচ্ছে– ২০১৮-এর নির্বাচন আদৌ কোনও নির্বাচন ছিল না।

বিএনপির নেতারা ঠিকই জানেন, ইতিহাসে কখনোই কোনও ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে না। যেমন, ৯০-এর তত্ত্বাবধায়ক হয়েছিল রাজপথের আন্দোলনের ফলে ছোটখাটো হলেও একটা গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। এবং তখন রাজপথের রাজনৈতিক শক্তি বাস্তবে সিভিল ও মিলিটারি ব্যুরোক্র্যাট শক্তির থেকে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল বলে ব্যুরোক্রেসি আপাতত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষেই ছিল।

অন্যদিকে ১৯৯৬-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয় মূলত সিভিল ব্যুরোক্রেসির বড় অংশ রাজপথের রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে চলে আসার কারণে। আবার ২০০৭-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল বাস্তবে সামরিক ব্যুরোক্রেসির তৈরি একটি সরকার। ইতিহাসের কিন্তু পুনরাবৃত্তি ঘটেনি কোনোবারই। ভবিষ্যতেও ঘটবে না। ঠিক তেমনিভাবে পুরনো রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগও বোঝে ২০১৮-এর পুনরাবৃত্তি হবে না।

রাজনীতি নিয়ে আগাম ভবিষ্যৎ বাণী করা জ্যোতিষের কাজ, রাজনৈতিক বিশ্লেষকের নয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাধারণত চলে ঘটনার ক্রমগতির সঙ্গে সঙ্গে। আর রাজনৈতিক ভুলগুলো নির্ধারণ করে বর্তমান ও ভবিষ্যতের সঠিক পথ খুঁজতে হয় তাকে। তাই এ মুহূর্তে সবার আগে সামনে আসে, নব্বইয়ে রাজনৈতিক শক্তি রাজপথে এক ধরনের জয়, এবং তারপর থেকে দুই বছর বাদে বাকি সময় রাজনৈতিক দল দেশ শাসন করলেও রাজপথে কেন সঠিক নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করতে চাচ্ছে, আর নির্বাচন পদ্ধতি কেন সুষ্ঠু অবস্থানে যেতে পারছে না? 

এমনকি তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচনও কিন্তু প্রকৃত সুষ্ঠু নির্বাচন নয়। কারণ, এখানে দুটো বিষয় কাজ করে। এক, রাজপথে বিজয়ী দল নির্বাচনের আগে তাদের একটা বিজয় কনফার্ম করে। যার ফলে ভোটারদের একটা অংশ ও সিভিল ও মিলিটারি প্রশাসনের বড় অংশ স্বাভাবিকভাবেই রাজপথের বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ীদের পক্ষে চলে যায়। অবশ্য ৯০-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের মূলশক্তি আওয়ামী লীগ হলেও ৯১-তে ব্যুরোক্রেসি তাদের সঙ্গে যায়নি। কারণ, তখনও আওয়ামী লীগ তাদের নীতি পরিবর্তন করে এই সিভিল-মিলিটারি ব্যুরোক্রেসি শাসনের পক্ষে আসেনি। তাই  তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেও কোনও সুষ্ঠু নির্বাচন নয়। ওটাও এক ধরনের প্রভাবিত নির্বাচন। তাছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন এও প্রমাণ করে দেশের রাজনৈতিক শক্তি দুর্বল।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক শক্তি কেন এমন দুর্বল থেকে গেলো তা নিয়ে এখনও কোনও সঠিক গবেষণা হয়নি। তবে ভারতের রাজনৈতিক শক্তি কেন দুর্বল হয়ে গেলো এবং রাজনৈতিক শক্তির বদলে কেন ধর্মীয় শক্তি, কাস্ট শক্তি এবং আঞ্চলিক শক্তি বড় হয়ে গেলো তা নিয়ে বর্তমানে কিছু কিছু গবেষণা হচ্ছে। সেসব গবেষণা ও ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার আত্মজীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ভারতের রাজনৈতিক শক্তি দুর্বল হওয়া শুরু হয়েছে ভারতের শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি আইন জারি করার কিছু আগে থেকে। আর তখন থেকেই দেখা যাচ্ছে ইন্দিরা গান্ধী তার রাজনৈতিক সংগঠন, দলীয় নেতা ও ক্যাবিনেটের গুরুত্ব কমিয়ে দিয়ে মুখ্য সচিব, ক্যাবিনেট সচিবসহ কিছু সচিব ও নিজের পছন্দের কিছু তথাকথিত নেতাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলেন।

যার ফলে প্রশাসনের সর্বোচ্চ নির্বাহীদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ‘ক্যাবিনেট’ গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। এবং রাজনীতিতে উচ্চপদস্থ কয়েকজন সচিব ও পছন্দের কয়েকজন মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী ও উপদেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ হন। যার ফলে– আইকে গুজরালের মতো রাজনীতিককে ক্যাবিনেট থেকে সরিয়ে দেওয়ার আগে তাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করা হয়নি। তিনি জেনেছিলেন ক্যাবিনেট সচিবের মাধ্যমে। অন্যদিকে দেশে ইমার্জেন্সি জারি ও তার ড্রাফট করার কাজ করেন একজন মুখ্যমন্ত্রী আর কয়েকজন সচিব।  আর সিদ্ধান্তের মূল ভূমিকায় থাকে ক্যাবিনেট সচিব ও মুখ্য সচিব। ইমার্জেন্সি জারির আগে অধিকাংশ ক্যাবিনেট সদস্য বা মন্ত্রী জানতেন না দেশে ইমার্জেন্সি জারি করা হচ্ছে। রাষ্ট্রপতির সঙ্গেও পরামর্শ করা হয়নি। ইন্দিরা গান্ধী নিজ দলের রাজনৈতিক শক্তিকে ভেতর থেকে আঘাত করার ফলে তাঁর বিরোধী রাজনীতিক ও ধর্মীয় ব্যবসায়ীদের এক হওয়ার  সুযোগ করে দেন। তারপরের ইতিহাস দীর্ঘ– সে আলোচনা এখানে নয়। কিন্তু বাস্তবতা হিসেবে আজ দেখা যাচ্ছে, ভারতের রাজনীতি চলে গেছে ধর্মীয় শক্তি, কাস্ট শক্তি ও আঞ্চলিকতার শক্তির কাছে।

বাংলাদেশেও কিন্তু যে যখনই ক্ষমতায় থাকুক, সবসময়ই ব্যুরোক্রেসিকেই শক্তিমান দেখা গেছে, রাজনৈতিক শক্তিকে কেউই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবার চেষ্টা করেনি। ক্যাবিনেট কখনোই গুরুত্বপূর্ণ হয়নি। তাই বাস্তবে বাংলাদেশে রাষ্ট্র ক্ষমতার সুন্দর ও স্বাভাবিক পরিবর্তন এবং সুষ্ঠু নির্বাচন না হওয়ার মূল কারণ রাজনৈতিক শক্তির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না পাওয়া কিনা -এ বিষয়টিই মনে হয় দেশের জন্যে অনেক বড় জরুরি। কারণ, স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও যদি রাষ্ট্র ওই ৬০  লাখ লোকের জিন্দাবাদ- মুর্দাবাদ এবং প্রশাসনের কয়েক ব্যক্তির হাতের মুঠোর বিষয় থাকে, তাহলে পরবর্তী জেনারেশন কি খুব ভালোভাবে বাসযোগ্য বাংলাদেশ আশা করতে পারে?

 

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক। সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্যে রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত।