দুর্গাপূজা: বাঙালি হিন্দু ছাড়াও বাংলাদেশে আরও যেসব জনগোষ্ঠীর মানুষ এই ধর্মীয় উৎসব পালন করেন

21

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুদের পাশাপাশি বাংলাদেশের আরও বেশ কিছু ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষও পালন করে থাকেন।

সনাতন ধর্ম পালনকারী বাঙালিদের জন্য এই শারদীয় পূজা সবচেয়ে বড় উৎসবের নাম হলেও হিন্দু ধর্মাবলম্বী সবার কাছে দুর্গাপূজা প্রধান ধর্মীয় উৎসব নয়।

মূলত বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বাংলা ভাষাভাষী হিন্দুদের মধ্যেই এটি সবচেয়ে বেশি আনুষ্ঠানিকতা এবং আড়ম্বরের সাথে পালিত হয়। এছাড়া হিন্দু জনগোষ্ঠী-প্রধান দেশ নেপালেও এটি বড়ভাবে পালন করা হয়।

তবে বাংলাদেশে কেবল বাঙালি নয়, আরও কয়েকটি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে দুর্গাপূজা পালনের রীতি প্রচলিত রয়েছে।

বাঙালি ছাড়াও দুর্গাপূজা পালন করেন যারা

বাংলাদেশে বাঙালিদের বাইরে যারা দুর্গা পূজা বড়ভাবে পালন করেন, তারা সবাই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্য। এসব জাতিগোষ্ঠীর সংগঠন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের নেতা সঞ্জীব দ্রং বিবিসি বাংলাকে জানান, দেশের অন্তত ১৫টি ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর মানুষ দুর্গাপূজা করেন।

দুর্গা পূজা যেভাবে হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলো

এদের মধ্যে রয়েছেন ত্রিপুরা, হাজং, বানাই, ওরাওঁ, মাহাতো, পাত্র, কোচ, বর্মন, গঞ্জু, ডালু-সহ আরও কয়েকটি জাতিগোষ্ঠী।

সঞ্জীব দ্রং বলেন, এক সময় এসব নৃগোষ্ঠীর মানুষদের অধিকাংশই ছিলেন প্রকৃতি পূজারী।

মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি মনীন্দ্র কুমার নাথ বিবিসিকে বলেন, ক্ষুদ্র বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মধ্যে যারা ধর্মান্তরিত হননি, তারা কমবেশি সবাই সনাতন ধর্মাবলম্বী।

তবে, তিনি যোগ করেন, এসব নৃগোষ্ঠীর মানুষ সনাতন ধর্ম পালন করলেও তাদের প্রত্যেকের আলাদা ধর্মাচার রয়েছে, অর্থাৎ বাঙালি হিন্দুদের মত করে ধর্মের বিভিন্ন আচার তারা পালন করেন না।

বাঙালি হিন্দুদের দুর্গাপূজা যেমনভাবে পালন করা হয় – অর্থাৎ ব্রাহ্মণের মন্ত্র পাঠ করা, দেবদেবীর মূর্তি গড়া – তার সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর পালন করা দুর্গা পূজার খানিকটা পার্থক্য রয়েছে।

হাজংদের দুর্গাপূজার মন্ডপ

নেত্রকোনার সুসং দুর্গাপুরে হাজংদের দুর্গাপূজার মণ্ডপ

 

রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, সিলেট, মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, রাজশাহী-সহ কয়েকটি জেলায় বসবাসকারী নৃগোষ্ঠীর মানুষেরা দুর্গাপূজা উৎসব পালন করেন।

মনীন্দ্র কুমার নাথ বলছেন, এসব এলাকার ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো নিজস্ব আচার ও সংস্কৃতি অনুযায়ী দুর্গাপূজা করেন। আর এ কারণে এসব জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে আসা বিভিন্ন আচারের মিশেল ঘটেছে তাদের দুর্গাপূজার আচারে।

তবে গত ২৫ থেকে ৩০ বছরে নৃগোষ্ঠীর পালন করা দুর্গাপূজার মণ্ডপ, দেবদেবীর পোশাক-আশাক ও সাজসজ্জায় আড়ম্বর এসেছে বলে দেখা গেছে এবং প্রচলিত বাঙালি দুর্গাপূজার সাজসজ্জার সাথে সাদৃশ্য বেড়েছে।

তবে এসব জাতিগোষ্ঠীর অনেক মানুষ আবার মূলত প্রকৃতি পূজারী, অর্থাৎ কেউ সূর্য পূজা করেন, কেউবা করেন গাছের পূজা, আবার কেউ ধানের পূজা, কেউবা মনসার পূজা করেন।

শারদীয় দুর্গাপূজার তারিখ নির্ধারিত হয় যেভাবে

সঞ্জীব দ্রং বলেছেন, শক্তির প্রতীক হিসেবেই মূলত ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা দুর্গার পূজা করেন।

ব্রিটিশ শাসনামলে এ অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে দুর্গাপূজা পালনের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল, যে কারণে ওই সময় থেকেই বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মধ্যে দুর্গাপূজা পালনের রীতি চালু হয় বলেও মনে করেন কোন কোন বিশেষজ্ঞ।

ত্রিপুরা

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসেবে, বাংলাদেশে ত্রিপুরা জাতিগোষ্ঠীর জনসংখ্যা এক লাখ ৩৩ হাজারের মত। এ জনগোষ্ঠীর বড় অংশটি পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের জেলাগুলোতে বাস করেন।

তিন পার্বত্য জেলা ছাড়াও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর কেউ কেউ সিলেট, মৌলভীবাজার, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা এবং ফরিদপুর এলাকায় বসবাস করেন।

ত্রিপুরারা হিন্দু ধর্মাবলম্বী নৃগোষ্ঠী, এবং বহু বছর ধরেই তাদের মধ্যে দুর্গাপূজার প্রচলন রয়েছে।

মিষ্টান্ন

দুর্গাপূজায় মিষ্টান্নের ব্যবহার সব সম্প্রদায়ের মধ্যেই আছে

 

বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সমন্বয়কারী ফাল্গুনী ত্রিপুরা – যিনি নিজে এই জনগোষ্ঠীর একজন সদস্য – বিবিসি বাংলাকে জানান, মূলধারার বাঙালি হিন্দুদের দুর্গাপূজা পালনের সাথে ত্রিপুরাদের দুর্গাপূজা পালনের তেমন একটা পার্থক্য নেই।

তবে তিনি বলেন যে তাদের বহু বছরের পালন করা দুর্গাপূজার আচার ও ধরণে এখন ধীরে ধীরে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে গত কয়েক দশক ধরে।

এসব পরিবর্তনের মধ্যে অন্যতম হলো দুর্গা প্রতিমার পোশাক – আগে এক সময় ত্রিপুরারা দুর্গাকে বাঙালিদের মতোই শাড়ী পরাতো, কিন্তু এখন ত্রিপুরা নারীর পোশাক রিনাই-রিসা পরানো হয় দুর্গা এবং অন্য দেবীদের।

পূজা উপলক্ষে নতুন রিনাই-রিসা বোনা হয়।

আর পোশাকে পরিবর্তন আসার সঙ্গে সঙ্গে কয়েক বছর ধরে পূজার মন্ত্রপাঠের জন্য নিজ জাতিগোষ্ঠীর পুরোহিতদের ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানালেন ফাল্গুনী ত্রিপুরা।

“আমাদের পূজায় আগে মন্ত্রপাঠ করতে বাঙালি ব্রাহ্মণ নিয়ে আসা হতো, কিন্তু এখন কয়েক বছর ধরে নিজেদের (ত্রিপুরাদের) মধ্য থেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে পাওয়া পুরোহিত দিয়ে মন্ত্রপাঠ করানো হচ্ছে,” বিবিসিকে বলেন তিনি।

হাজং

বাংলাদেশে হাজং জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে।

সরকারি পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসেবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে হাজং জনগোষ্ঠীর ১০ হাজারের মত সদস্য রয়েছেন। কিন্তু এ নৃগোষ্ঠীর মানুষের ধারণা, তাদের জনসংখ্যা আরও বেশি।

বাংলাদেশের ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা এবং সুনামগঞ্জে হাজং সম্প্রদায়ের বাস, এবং তারাও মূলত হিন্দু ধর্ম পালন করেন।

হাজংদের বসবাস কৃষিভিত্তিক সমাজে।

দুর্গাপূজা

বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অনেকের কাছে সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা

 

নেত্রকোনার বিরিশিরিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক একাডেমীর পরিচালক সুজন হাজং জানালেন, দুর্গাপূজা করলেও তার সম্প্রদায়ের লোকেরা নিজেদের সংস্কৃতি অনুযায়ী কিছুটা ভিন্নভাবে দুর্গাপূজা উৎসব পালন করেন।

হাজংদের দুর্গাপূজার প্রার্থনা বা উপাসনার ধরণ আলাদা হয়, বলেন সুজন হাজং। এবং ধর্মীয় আচার পালনের জন্য বাঙালি পুরোহিত না এনে নিজেদের সম্প্রদায়ের পুরোহিত দিয়ে মন্ত্রপাঠ ও অন্যান্য আচার করানো হয়।

মণ্ডপের ধরণও আলাদা হয়।

তবে সুজন হাজং মনে করিয়ে দেন যে দুর্গাপূজা হাজং সম্প্রদায়ের প্রধান পূজা নয়।

হাজংদের প্রধান পূজার নাম দেউলী পূজা, যা মূলত ধান কাটার সময় আয়োজন করা হয়।

এ সময় কাদা খেলা এবং পানি খেলাসহ নানা ধরণের খেলার আয়োজন করে আনন্দ করেন হাজংরা, উৎসবকে রাঙিয়ে তোলেন।

দেবী মূর্তি

শিল্পীর তুলিতে অবয়ব পাচ্ছে দেবী মূর্তি

 

এছাড়া, মনসা পূজাও হাজংদের অন্যতম বড় উৎসব, যা অনেক বড় করে আয়োজন এবং পালন করা হয়।

বানাই

বাংলাদেশে বানাই সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা ঠিক কত, তারও সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ঢাকার কাছে সাভার, গাজীপুর, শ্রীপুর-সহ বেশ কয়েকটি এলাকায় তাদের বাস।

তবে এক সময় ভৌগলিকভাবে হাজংদের কাছাকাছি তাদের বসবাস ছিল বলে তাদের সঙ্গে বানাইদের সংস্কৃতি, আচার-রীতিনীতির অনেক মিল রয়েছে।

বানাই নৃগোষ্ঠীও সনাতন ধর্মের অনুসারী।

এই নৃগোষ্ঠীর নেতা রিপন বানাই জানালেন যে তার সম্প্রদায়ের মানুষেরা এক সময় কেবলই প্রকৃতির পূজারী ছিল।

কিন্তু পরে তারা দুর্গাকে পূজা শুরু করেন, এবং সেটা ১৭৫৭ সালে এই অঞ্চলে ইংরেজ শাসন শুরুর আগেই ঘটে।

তবে এত বছর ধরে পালন করা দুর্গাপূজার আচারে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু পরিবর্তন এসেছে বলে জানান রিপন বানাই।

শুরু হয়েছে দুর্গাপূজা

তিনি বলেন, পূজার সময় দুর্গা দেবীকে এখন বানাই নারীর পোশাক ‘পাথিন’ পরানো হয়।

সেই সঙ্গে দশমীতে দেবী বিসর্জনের আয়োজনও বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজার চাইতে ভিন্নতর হয়।

বানাইরা বিসর্জনের পর নানা আনন্দ আয়োজন করে – যার মধ্যে রয়েছে কাদা খেলা, যাকে বানাইরা তাদের স্থানীয় ভাষায় ‘প্যাক খেলা’ বলে বর্ণনা করেন।

পাত্র

বাংলাদেশ সরকারের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তালিকায় ছোট একটি জনগোষ্ঠী পাত্র, যারা দুর্গাপূজা করেন।

বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে বসবাসকারী স্বল্প পরিচিত এই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকেরা হিন্দু ধর্মের অনুসারী, কিন্তু তাদেরও ধর্মাচার বাঙালিদের থেকে খানিকটা আলাদা।

এ জনগোষ্ঠীর মানুষেরা দুর্গাপূজাকে ‘খেমুং লারাং’ নামে ডাকে।

পাত্র সম্প্রদায় কল্যাণ পরিষদের নির্বাহী প্রধান গৌরাঙ্গ পাত্র বিবিসি বাংলাকে বলেন, হিন্দু ধর্মের অনুসারী হলেও তাদের মধ্যে দুর্গাপূজার প্রচলন হয়েছে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ বছর আগে।

আর এই দুর্গাপূজা সম্পূর্ণভাবেই পাত্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব আচার অনুযায়ী পালন করা হয়।

পূজায় দুর্গাদেবীর আরাধনা সংস্কৃত ভাষায় মন্ত্রপাঠ করে হয় না, এটি করা হয় পাত্রদের মাতৃভাষায়।

দুর্গাপূজায় পাত্ররা হাঁস বলি দেন, এবং নানা ধরণের আনন্দ আয়োজন করা হয়।

অন্যান্য নৃগোষ্ঠী

ওরাওঁ সম্প্রদায় মূলত প্রকৃতি উপাসক, তবে তাদের মধ্যেও দুর্গার দুর্গতিনাশিনী রূপের পূজা করা হয়।

এই নৃগোষ্ঠীর প্রধান উৎসব অবশ্য ‘কারাম’ – যা সাধারণত কদম গাছের শাখাকে ঘিরে আয়োজন করা হয়।

এছাড়া কৃষি-প্রধান গোষ্ঠী হওয়ায় এই নৃগোষ্ঠীর মধ্যে ফসল বাঁচানো আর রোগবালাই থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় আচার পালন করা হয়।

আরেকটি নৃগোষ্ঠী কোচদের মধ্যে দুর্গাপূজার পাশাপাশি কালীপূজা এবং সরস্বতীর পূজার প্রচলন রয়েছে।