জননেত্রী শেখ হাসিনা : জীবন পথের জয়ধ্বনি

4

জয়ন্ত আচার্য

পাকিস্তানী সামরিক ও স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালী লাভ করে স্বাধীন বাংলাদেশ। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ফিরে আসেন সদ্য স্বাধীন দেশটিতে। দায়িত্ব গ্রহণ করেন তার স্বপ্নের একটি গণতান্ত্রিক বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক স্বনির্ভর দেশ বির্নিমানের। তিনি যখন দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই স্বাধীনতা বিরোধী কুচক্রী মহল হত্যা করে বাংলাদেশের জাতির জনককে। হরণ করা হয় জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ষড়যন্ত্র শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে নিশ্চিহ্ন করার। সামরিক শাসনের যাতাকলে যখন দিকভ্রান্ত আওয়ামী লীগের কোটি কোটি ভক্ত শুভান্যুধায়ী তখন ১৯৮১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দলের কাউন্সিলে সর্বসম্মতভাবে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত করা হয়। ১৯৮১ সালের ১৭মে ভারতে নির্বাসিত জীবন থেকে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন শেখ হাসিনা। বিমান বন্দরে লক্ষ জনতার উত্তালে অবেগময় কন্ঠে তিনি বলেন, “আমি আপনাদের মাঝে ফিরে এসেছি আপনাদের আধিকার আদায়ের সংগ্রামে অংশ নেওয়ার জন্য। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমি আপনাদের পাশে থাকতে চাই।”

বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা প্রতিমূর্হুতে চেষ্টা করছেন জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া তার এ বক্তব্য পালন করতে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের উপর মন্তব্য করতে গিয়ে বিবিসি তার সংবাদ ভাষ্য ৮১ সালের ১২ জুন বলেছে, তার পিতার নৃশংতম মৃত্যুর পর বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন নি:সন্দেহে একটি বড় ব্যাপার। তার এই সাহস সম্ভবত তিনি অর্জন করেছেন তিনি তার পিতার কাছ থেকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তার সাহস এবং তেজদীপ্ততার জন্য বাঙ্গালীর আস্থা অর্জন করেছিলেন।

কার্যত সেদিন সভানেত্রী শেখ হাসিনার আগমনে আস্থাহীন জতির যেন এক অনন্য রূপান্তর ঘটে যায়। যাত্রা করেছিল আলোর পথে। স্বকীয় প্রতিভাগুণে তিনি মুক্তিযুদ্ধের মহানায়কের আদর্শকে প্রবলভাবে পুরো জাতির মনে আবার জাগিয়ে তুললেন। হঠাৎ করেই মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ যেন জেগে উঠল। সেই যে তার যাত্রা শুরু তারপর তিনি আর পেছনে তাকাননি। তিনি আজ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী এবং বঙ্গবন্ধুপ্রেমী কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে তিনিই একমাত্র আশার প্রদীপ। ভরসার প্রতীক।

শেখ হাসিনা ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মধুমতি নদীর তীরবর্তী ঐতিহ্যবাহী জনপদ গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জš§গ্রহণ করেন। সবুজ আচ্ছাদিত মধুমতি ও বাইগার নদী তীরে কেটেছে তার শৈশব। ১৯৫৪ সালে যখন তার বয়স মাত্র ৭ বছর তখন তিনি বাবার সাথে গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসেন। এ বছরই পূর্ব পাকিস্তানে প্রদেশিক পরিষদের নির্বাচন হয়েছিল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট এনির্বাচনে মুসলিম লীগকে পরাজিত করে । ১৯৬১ সালে শেখ হাসিনা বাবা মার সঙ্গে ঢাকায় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বসবাস শুরু করেন। এ সময় তার সংগ্রামী পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তৎকালীন পাকিস্তান শাসকরা গ্রেফতার করে। মায়ের স্নেহেই তিনি এক প্রতিকুল পরিবেশে সততা, ত্যাগ এবং রাজনৈতিক দৃঢ়তা নিয়ে বেড়ে উঠতে থাকেন। ১৯৬২ সালে তিনি ঢাকার আজিমপুর গার্লস স্কুলের ছাত্রী। এ সময় কুখ্যাত হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট দিলে সারাদেশে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আজিমপুর গার্লস স্কুল থেকে একটি প্রতিবাদ মিছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে। ১৯৬৬ সালে বেগম বদরুন্নেসা কলেজের ছাত্রী সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগের প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে শেখ হাসিনা সহ সভাপতি পদে বিজয়ী হন। এ বছরই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফার ঘোষণা দেন। তিনি ছয় দফার পক্ষে রাজপথে সোচ্চার হন। ১৯৬৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রোকেয়া হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ইতিহাসের নৃশংসতম নারকীয় হত্যাকান্ড চালায় বাঙালিদের উপর। অপারেশন সার্চ লাইটের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার পর শেখ হাসিনাসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের অন্তরীন করে নিয়ে যাওয়া হয় ধানমন্ডির একটি বাড়িতে। সেই বাড়িতেই তিনি পরিবারের সবার সাথে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস অন্তরীন ছিলেন।


১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধা দামাল ছেলেরা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব এবং শেখ হাসিনা সহ বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের মুক্ত করেন। ১৯৭৩ সালে শেখ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ তিনি স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়ার সাথে পশ্চিম জামার্নীতে যান। সঙ্গে নিয়ে যান তার আদরেরর ছোট বোন শেখ রেহেনাকে। একারণে ৭৫ এর ১৫ আগষ্ট প্রানে বেঁচে যান দুই বোন। এসময় সামরিক শাসক জিয়া তাঁর দেশে ফিরে আসার উপর অলিখিত বিধি নিষেধ আরোপ করে। পরে সামরিক শাসক জনগণের প্রবল চাপে তাকে দেশে ফিরতে দিতে বাধ্য হয়।
দেশে ফিরেই বঙ্গবন্ধুর কন্যা জিয়ার অগণতান্ত্রিক স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। তার দেশে আগমনে তৎকালীন সামরিক শাসক জিয়া বেশ ভীত হয়ে পড়েছিল। চট্রগ্রাম সার্কেট হাউজে ১৯৮১ সালের ৩০ মে নির্মম ভাবে নিহত হন জিয়া। জিয়ার মৃত্যুর পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন বিচারপতি সাত্তার। এসময় বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থার দ্রত অবনতি হতে থাকে। এ সুযোগে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনা প্রধান জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন। জেনারেল এরশাদের ক্ষমতা দখল করে সামরিক আইন জারির পর প্রথম আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাই প্রতিবাদ করে। ৮২ সালের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ সামরিক আইন ভেঙ্গে সাভারে প্রথম জনসভার আয়োজন করে। এ সভায় তিনি ঘোষণা দেন আমরা এ সামরিক আইন মানিনা। মানবো না। তিনি বলেন অবিলম্বে সামরিক আইন বাতিল করতে হবে। নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে হবে। তিনি স্মৃতিসৌধের পাদদেশে দাঁড়িয়ে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণ আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান। একারণে ১৫ মে সামরিক সরকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের আওয়ামী লীগ অফিস বন্ধ করে দেয়। ১৯৮৩ সালে ৯ এপ্রিল শেখ হাসিনা এক সম্মেলনে সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের ১১ দফা কর্মসুচী ঘোষণা করেন। এ কর্মসুচী সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে নতুন গতি নিয়ে আসে।

তার রাজপথের লড়াকু সংগ্রামের কারণে ৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৩ বছর পর ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। শত বছরের ইতিহাসে এসময় বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণ হয় । শিল্পে আসে গতি। দারিদ্র সীমার নিচের মানুষদের বাঁচাতে নেওয়া হয় নানা পদক্ষেপ। পাবর্ত্য শান্তিচুক্তি ও ভারেেতর সাথে গঙ্গা পনি বন্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বাতিল হয় কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ। এই আইনে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচারের প্রক্রিয়া। এ সময়ে সারা বিশ্বে ক্রমেই বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হতে থাকে। শুরু হয় উন্নয়নের নবতর ধারা । ২০০১ সালে বিএনপি জামাত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবারও রুদ্ধ করার চেষ্টা করা হয় গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা।
বাংলাদেশে সংঘটিত ২০০৬ সালের ১ নভেম্বরে ঘটনা দেশকে ভয়াবহ সংকট থেকে রক্ষা করলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভ্রান্তনীতির কারণে ২০০৭ সালের ১৫ জুলাই আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে গ্রেফতার করা হয়। পরে প্রবল জনমত ও শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বিচক্ষনার কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় । অবশেষ ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর বহু প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট দুই তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়ে আবারও ক্ষমতায় আসে। আজ শেখ হাসিনা বিগত তিনটি সংসদীয় নির্বাচনে জিতে একটানা ১৫ বছর ধরে দেশ পরিচালনা করছেন। তার দৃঢ় নেতৃত্বে উন্নয়নের সোপানে এগিয়ে চলছে দেশ। ব আজ স্বল্প উন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে যাত্রা শুরু করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ আজ কৃষিতে স্বয়ং সম্পূর্ণ । তার অদম্য নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী অর্থনীতির ভিত। গড় প্রবৃদ্ধি ৭ এর উপর । বিশে^র অন্যতম থর¯্রােতা নদীর উপর নির্মিত পদ্মা সেতু পাল্টে দিয়েছে দক্ষিণ বাংলা জনপথ। এবছর প্রত্যন্ত এলাকার শত ভাগ বাড়ি বিদ্যুতের আলোতে আলোকিত হয়েছে। কর্ণফুলি বুক চিড়ে গড়ে তোলা হচ্ছে পাতাল পথ। দ্রুত এগিয়ে চলছে মেট্রো রেলের কাজ। ঢাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেস, উড়াল সেতু দাঁড়িয়ে আছে উন্নয়নের সাক্ষী হয়ে । শিক্ষায় এসেছে গতি। তিনি কার্য়কর করেছেন জাতির জনকের হত্যা মামলা রায় । যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও বিচারের রায় হয়েছে বাস্তবায়নের । তার দৃঢ় নেতৃত্বে আজ বিশ্বে বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল পরিনত হয়েছে। তার কারণেই ভারত- বাংলাদেশ সম্পর্ক পৌছিয়েছে নতুন উচ্চতায়। বিশ্বে যে পাঁচটি দেশ দ্রুত উন্নয়ন করছে তার মধ্যে বাংলাদেশ এখন একটি। বিশ্ব উন্নয়ন ও শান্তি প্রচেষ্টায় শেখ হাসিনা হয়ে উঠেছেন বিশ্বনেত্রী । তিনি দৃঢ়তার সাথে এগিয়ে চলছেন অভিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের পথে।

কার্যত চার দশকের মতো সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে উজ্জ্বল এক নক্ষত্রের মতো আলো ছড়াচ্ছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। আপোষহীন, তেজী দুরদৃষ্টি সম্পন্ন এই নেত্রী সংগ্রাম করেই আজ বিচক্ষণ এক রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হয়েছেন।

২৮ সেপ্টেম্বর তার ৭৬তম শুভ জন্মদিন । জন্মদিনে তাকে জানাই শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন এদিনে একজন সচেতন মানুষ হিসাবে এই চাওয়া তার নেতৃত্বে আগামীতে বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক , জঙ্গীবাদমুক্ত উন্ন্ত দেশ হিসাবে গড়ে উঠুক। সেই সুন্দর বাংলাদেশের আগমনী সুরই যেন যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে শারদীয় বাঁশির সুরে।
কবিগুরুর ভাষায় –,
সেই বাঁশিতে শুনতে পাবে
জীবন পথের জয়ধ্বনি
শুনতে পারে পথিক রাতের
যাত্রা মুখে নতুন প্রাতের আগমনী।

লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক
সহ সম্পাদক সাংস্কৃতিক বিষয়ক উপকমিটি , কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ