জেলা পরিষদ নির্বাচন : কেন্দ্রের দূর্বলতায় আওয়ামী লীগে বিদ্রোহী প্রার্থীর ছড়াছড়ি

 

বিশেষ প্রতিবেদন –

‘দল সমর্থিত একক প্রার্থীর পক্ষে দলের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। বিদ্রোহীদের আর কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। দল করতে হলে দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে যারা বিদ্রোহী প্রার্থী হবেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।’

গত ১০ সেপ্টেম্বর গণভবনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সংসদীয় ও স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের যৌথসভায় উপরোক্ত হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দলীয় সমর্থন না পেয়ে যারা এবারও জেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের উদ্দেশে এই সতর্কমূলক বার্তা দেন তিনি। আগামী ১৭ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় দেশের ৬১টি জেলা পরিষদের নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ঐ দিন আওয়ামী লীগ একক প্রার্থী হিসেবে দল সমর্থিতদের তালিকা প্রকাশ করে।

তবে আওয়ামী লীগ প্রধানের সেই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে দেশের অন্তত ৩২টি জেলা পরিষদে চেয়ারম্যান পদে দলের বিদ্রোহীরা মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। বৃহস্পতিবার ছিল ৬১ জেলা পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন। এতে দেখা যায়, অন্তত ৩২ জেলায় আওয়ামী লীগের এক বা একাধিক বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। কোথাও কোথাও তিন-চার জন বা তারও বেশি বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার লক্ষ্যে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯টি জেলায় চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর বিপরীতে অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। ফলে তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হতে যাচ্ছেন।

চেয়ারম্যান পদে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার জন্য আওয়ামী লীগের অনেকে মনোনয়নপত্র দাখিল করায় ধন্দে পড়েছেন জেলা পরিষদ নির্বাচনের ভোটাররা এবং দলটির স্থানীয় নেতাকর্মী-সমর্থকরা। দলীয় শৃঙ্খলা অনুযায়ী দল সমর্থিত একক প্রার্থীকে তারা ভোট দেবেন কিংবা তাদের পক্ষে প্রচারণা চালাবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিদ্রোহী প্রার্থীদের কেউ কেউ যখন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন এবং দলও তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বরং বরণ করে নেবে—তখন বিপাকে পড়তে পারেন ভোটাররা এবং স্থানীয় নেতাকর্মী-সমর্থকরা। বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে যিনি নির্বাচিত হবেন তিনিও দলেরই লোক, কিংবা স্থানীয় কোনো না কোনো পর্যায়ের নেতা, কোথাও কোথাও তারা প্রভাবশালীও বটে। কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্ত তোয়াক্কা না করায় এবং শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে দল যদি তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে জেলা পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যানের মাধ্যমে তারা নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে পারেন।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জেলা পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, অতীতেও উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভাসহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনের আগে দলের কেন্দ্র থেকে বলা হয়েছিল—বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমনকি এমনো বলা হয়েছিল, দলের যেসব সংসদ সদস্য বিদ্রোহীদের পক্ষে কাজ করবেন তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে দুই-চারটি ব্যতিক্রম ছাড়া বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে দল কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বিশেষ করে, ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিদ্রোহীদের পক্ষে কাজ করা দলীয় এমপিদের বিরুদ্ধেও সাংগঠনিক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং নির্বাচন শেষে দেখা গেছে, বিদ্রোহীরা বিজয়ী হয়ে দ্বিগুণ প্রভাব-প্রতিপত্তি নিয়ে এলাকায় রাজনীতি করছেন, দলও তাদের সাদরে গ্রহণ করে নিয়েছে।

২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত জেলা পরিষদ নির্বাচনের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। ঐ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থন না পেয়েও দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে ১১ জন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে তাদের কারো বিরুদ্ধেই আওয়ামী লীগ কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়নি। অবশ্য, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে চেয়ারম্যান পদে যারা ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হয়েছিলেন তারা এবার আওয়ামী লীগের সমর্থন পাননি।

আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের মতে, অতীতে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় এবারও জেলা পরিষদ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীর ছড়াছড়ি দেখা যাচ্ছে। কারণ, অতীতের ঘটনাপ্রবাহে বিদ্রোহীদের এমন বিশ্বাস জন্মেছে যে, দলের কেন্দ্র থেকে যত শক্ত কথাই বলা হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত আসলে কিছু হবে না। আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের কেউ কেউ এমন প্রশ্নও তুলছেন, যদি বিদ্রোহীদের ব্যাপারে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে ভোটের আগে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়ারও-বা দরকার কী। দলীয় সিদ্ধান্ত না মানায় যদি সাংগঠনিক ব্যবস্থা না নেওয়া হয় তাতে বরং দলের শৃঙ্খলা নিয়েই প্রশ্ন দেখা দেয়।

আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একাধিক নেতা জানান, এখনো মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সুযোগ থাকায় শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা কমে আসতে পারে। নির্বাচনে বিএনপি জোট প্রার্থী দেয়নি। জাতীয় পার্টি (জাপা) তিন-চারটি জেলায় প্রার্থী দিয়েছে। এর বাইরে ১৪ দল শরিক জাসদ ও বাংলাদেশ জাসদ একটি করে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী দিয়েছে। কয়েকটি জেলায় বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকলেও স্বতন্ত্র কিংবা নিবন্ধনহীন দলের প্রার্থী রয়েছেন। এছাড়া মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের পরেও হয়তো প্রার্থীর সংখ্যা কমে আসতে পারে।

উল্লেখ্য, আগামী রবিবার মনোনয়নপত্র বাছাই হবে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ২৫ সেপ্টেম্বর। আগামী ১৭ অক্টোবর ইভিএমে ভোট গ্রহণ করা হবে। এতে সারা দেশের ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত ৬৩ হাজারের বেশি জনপ্রতিনিধি ভোট দেবেন। ইসির তথ্যমতে, ৬১ জেলার চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন ১৬২ জন, সাধারণ সদস্যপদে ১ হাজার ৯৮৩ জন ও সংরক্ষিত সদস্যপদে ৭১৫ জন।