ওঁরাওদের কারাম উৎসব

দিনাজপুর প্রতিনিধি
-আদিবাসীদের সমৃদ্ধ লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতির অন্যতম কারাম পূজা বা উৎসব। লাল হলুদ শাড়ি আর খোঁপায় রঙিন ফুল সাজে বাদ্যের তালে তালে নেচে-গেয়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ওঁরাও সম্প্রদায় উদযাপন করে তাদের বড় পর্ব কারাম উৎসব। দিনাজপুরের সুইহারী খালপাড়ায় আদিবাসী পল্লীতে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে সারা রাত চলে এ উৎসব।

দিনাজপুরের সুইহারী খালপাড়ায় আদিবাসী পল্লীতে এই ঐতিহ্যবাহী কারাম উৎসবের পূজা অর্চনা পাঠ করান ওঁরাও সম্প্রদায়ের ‘মাড়েয়া’ (পুরোহিত) সানে এক্কা। সকাল থেকে নেচে-গেয়ে আসতে শুরু করে ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর নারী-পুরুষ। চলে মাদল আর মন্দিরার শব্দের সঙ্গে দলবদ্ধ পথনৃত্য। ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষায় গাওয়া গান আর ছন্দময় নাচে অংশ নেয় তরুণ-তরুণী আর আবালবৃদ্ধরা। সমতল ভূমির ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর বিভিন্ন জাতিসত্তা নেচে-গেয়ে নিজস্ব সংস্কৃতি তুলে ধরে তাদের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে। বৈচিত্র্য এ অনুষ্ঠান উপভোগ করতে ঢল নামে নানা পেশার মানুষের।

কারাম উৎসবটি ওঁরাওদের বছরের সবচেয়ে বড় পর্ব হিসেবে বিবেচিত। এই কারাম উৎসব তিনটি পর্বে অনুষ্ঠিত হয়। একক কারাম যা একক প্রচেষ্টায় নিজ বাড়িতে অনুষ্ঠিত হয়, দোমাসি কারাম এটি ভাদ্র মাসের শেষে শুরু হয় এবং আশ্বিন মাসের শুরুতে শেষ হয়, ১০ কারাম এটি এলাকার সবাই মিলে পালন করে ভাদ্র মাসের চাঁদের দশম দিনে। এ উৎসবটি মূলত ধান কাটার আগে এবং অবসর সময়ে প্রচুর ফসল উৎপাদনক্ষম উৎসব ও শস্য মাঠে দাঁড়ানোর শক্তি জোগানোর জন্য করা হয়ে থাকে। এ ছাড়াও কারামে গ্রামের যুবক-যুবতীদের সুসন্তান লাভের জন্যও প্রার্থনা করা হয়। কারাম উৎসবের প্রধান অনুষ্ঠানটি কারাম গাছের তিনটি ডাল কেটে গ্রাম্য আখড়ার মাঝখানে কারাম রাজা হিসেবে গ্রামের নারীদের দ্বারা পোঁতা হয়। ডালের চতুর্দিকে বসে কারামের কাহিনি শোনা হয়। এরপর গ্রামের ছেলে-মেয়েরা কারাম রাজার চতুর্দিকে সারা রাত ধরে নাচে। পরদিন সকালে যুবতী মেয়েরা বিশেষভাবে গোজানো জাওয়া পুঁপ তাদের ভাই ও আত্মীয়-স্বজনের মাঝে বিতরণ করে। সকালের সূর্যের তাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কারাম ডালগুলো তুলে কাছাকাছি পুকুর বা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয় এবং পারিবারিক ভোজে অংশগ্রহণ করে। ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় পুরোহিত সানে এক্কা জানান, বহুদিন আগে পাটনার রোহিতাসগড় হতে আর্যদের দ্বারা যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ওঁরাওরা প্রাণ রক্ষার্থে পালাতে থাকে এবং আর্যরা তাদের পিছু ধাওয়া করতে থাকে। অনেক দূর আসার পর ক্লান্ত ওঁরাওরা একটি কারাম গাছের নিচে আশ্রয়গ্রহণ করলে আশ্চর্যজনকভাবে আর্যরা ফিরে যায় এবং ওঁরাওরা বিপদমুক্ত হয়। ওঁরাওদের বিশ্বাস এ কারাম বৃক্ষ তাদের রক্ষা করেছে। এ বিশ্বাস থেকেই ওঁরাওরা কারাম বৃক্ষের উপাসনা শুরু করে এবং এই স্মৃতিকে স্মরণ করে এ উৎসবটি পালন করে।