ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু অক্ষয়-অব্যয়: আনোয়ার হোসেন মঞ্জু

জাতীয় পার্টি-জেপি’র চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর সময়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় অনেক জাতীয়তাবাদী নেতাকে হত্যা করা হয়েছিল। তারা কেউ ইতিহাসের পাতায়, জনমনে সেভাবে ফিরে আসেননি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু অক্ষয়-অব্যয়। তিনি বছরের পর বছর থাকবেন আমাদের মাঝে। তিনি আমাদের একটি রাষ্ট্র দিয়েছেন, জাতি দিয়েছেন। একটি পাসপোর্ট দিয়ে গেছেন।

শনিবার শনিবার সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবি সমিতি মিলনায়তনে পিরোজপুর জেলা সমিতি ঢাকা- আয়োজিত আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। 
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং ১৪ দলের সমন্বয়ক ও মুখপাত্র আমির হোসেন আমু। বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে আমির হোসেন আমু বলেন, দেশের রাজনৈতিক ধারাকে জাতীয় চার মূলনীতিতে ফিরিয়ে আনতে হবে। বঙ্গবন্ধু যে চার নীতি দিয়ে গেছেন সেটিই আমাদের রাজনীতির মূল ধারা। সেই ধারাকে ব্যাহত করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে। 

2

তিনি আরও বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর নতুন প্রজন্মকে বিভিন্নভাবে বিকৃত ইতিহাস জানানো হয়েছে। এদেশের কিছু শ্রেণি এই স্বাধীনতাকে মেনে নিতে পারেনি। এরা মূলত সাম্প্রদায়িক শক্তি। কিন্তু এদেশের সাড়ে ৭ কোটি মানুষ ছিল স্বাধীনতার পক্ষে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জিয়াউর রহমানসহ যারা বেনিফিশিয়ারি ছিলেন তাদের পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের স্বপক্ষে ছিলো না। এই বিষয়গুলো যদি বিশ্লেষণ করা যায় তাহলে কাদের মদদে কারা এই হত্যাকান্ড সংঘটিত করেছিলো তা বেরিয়ে আসবে।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনা শুধু বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারই করেনি, স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচারও করেছেন। এর ফলে তাকে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে রাজনীতি করতে হচ্ছে। তার প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা। তিনি যেটা ভালো মনে করেছেন সেটাই করেছেন এবং করে যাচ্ছেন এটাই হলো বাস্তবতা। শেখ হাসিনা কোনো দিন রাজনৈতিকভাবে কারো সাথে আপোষ করেননি। তিনি তার রাজনীতি থেকে লক্ষ্যচ্যুত হননি। ১৯ বার শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা করা হয়েছে। মহান আল্লাহতা’লা তাকে রক্ষা করেছেন।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার ‘খণ্ডিত’ বিচার হয়েছে। সম্পূর্ণ বিচার এখনো হয়নি। যারা ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত ছিল তাদের নাম চার্জশিটে আসেনি। 

তিনি আরও বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা মামলায় আরও অনেককে আসামি করা উচিত ছিলো, কিন্তু আসামি করা হয়নি। যারা ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলো তাদের নাম চার্জশিটে আসেনি। এখনো খোলস পড়ে মুখোশ পড়ে অনেকে বিচরণ করছেন। আমি চাই একটা পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হোক। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩(২) অনুযায়ী কোন মামলার তদন্ত শেষ হয়ে গেলেও অধিকতর তদন্তের সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ পুনরায় চার্জশিট দিতে আইনি কোন বাধা নাই। বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার শাসনামলে যদি ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উম্মোচন না করি তাহলে ইতিহাসের কাঠগড়ায় আমরাও দাঁড়াতে পারি। 

শ ম রেজাউল করিম বলেন, জিয়াউর রহমান ছিলেন বঙ্গবন্ধু হত্যার মাস্টারমাইন্ড। খুনিদের সঙ্গে জিয়ার বৈঠক হয়। সেখানে জিয়া বলেছেন, ‘গো এহেড’। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসন করেন জিয়া। এরই ধারাবাহিকতায় তাদের রক্ষার কাজটি করেছেন এরশাদ। তার সরকারের আমলে প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তি ও ফ্রিডম পার্টি নামে দুটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন খুনিরা। আর খালেদা জিয়া ষোলকলা পূর্ণ করেছেন খুনিদের সংসদে ঠাঁই দিয়ে। এ কারনেই বলছি জিয়া, এরশাদ ও খালেদা জিয়া সময়ের ধারাবাহিকতায় খুনিদের নার্সিং করেছেন। 

3

আলোচনা সভায় আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, যারা দেশে বিদেশে বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করে বেড়ান তারা কখনো ভেবে দেখেন না তাদের পকেটেও বাংলাদেশের পাসপোর্ট। যে বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতা অর্জন করেছে।

তিনি বলেন, দেশ বা কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে গেলে কেউ আলোচনা-সমালোচনার উর্দ্ধে থাকেন না। বঙ্গবন্ধু তার দায়িত্ব পালন করে গেছেন। তার মৃত্যু যেভাবে হয়েছে সেটা তিনি কখনো কল্পনা করতে পারেননি। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলাম। এখন কাগজ খুললেই আমরা প্রতিদিনই বিভক্তির কথা শুনতে পাচ্ছি। এই বিভেদ ভুলে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, বঙ্গবন্ধু উদারপন্থী ছিলেন। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগামী বছর শুধু বাংলাদেশই নয় পুরো বিশ্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরাশক্তিরা মরণ কামড় দিয়েছে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে আমাদের দেশের উপর কেমন প্রভাব পড়বে সেটা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। 

তিনি আরও বলেন, দেশে একটা সংকটময় পরিস্থিতি থাকলেও সংকটের কথা আমরা প্রকাশ্যে আনছি না। যদি আমরা আলোচনা না করি সমাধান পাব কোথা থেকে। তিনি বলেন, আজকে আমরা মোটামুটি বাতি জ্বালাচ্ছি। ফরাসির মত দেশও সড়কে বাতি জ্বালায় না। সেজন্য সংকটের কথা জাতিকে বলতে হবে। এই দেশ আমার, আপনার এবং আমাদের সকলের। এখানে কোন সমস্যা কার্পেটের নিচে লুকিয়ে রাখার কিছু নাই। 

আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, বঙ্গবন্ধু একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, জাদুকর। তিনি উগ্রপন্থী, ডানপন্থী, বামপন্থী, উদারপন্থী সকলকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। লক্ষ্য অর্জনের জন্য সকলকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে এটাই ছিলো তার উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, আমি মনে করি বঙ্গবন্ধুর জীবন ‘কমপ্লিট লাইফ’। তিনি জীবনে পুরোপুরি সফল ছিলেন। তিনি একটা রাষ্ট্রই প্রতিষ্ঠা করেননি একটি জাতিও তৈরী করে দিয়েছেন। তাই বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলা যাবে না। 

আলোচনায় সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. রুস্তম আলী ফরাজী এমপি বলেন, বঙ্গবন্ধু জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা। উনার অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক চেতনার কারনে এই বাংলাদেশ পেয়েছি। যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছেন তাদের বিচার হয়েছে। কিন্তু যারা এই হত্যাকান্ডের ষড়যন্ত্রে জড়িত তাদের চিহ্নিত করা জরুরি।

4ছবি: সামসুল হায়দার বাদশা

পিরোজপুর জেলা সমিতির আহবায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব এম. শামসুল হকের সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য দেন অধ্যক্ষ শাহ আলম, সমিতির সহসভাপতি অধ্যক্ষ এম.এ বারী ও আশরাফ আলী। আলোচনা শেষে ১৫ আগস্টে নিহতদের রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। সভা পরিচালনা করেন সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট তালুকদার জি. কিবরিয়া।