তার গানে শুরু হয়েছিল স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গানের ভাণ্ডারকে যেসকল মেধাবীরা করেছেন সমৃদ্ধ তাদের মধ্যে অন্যতম গাজী মাজহারুল আনোয়ার। বাংলাদেশের এই খ্যাতিমান গীতিকার গান লেখার পাশাপাশি চূড়ান্ত সাফল্য পেয়েছিলেন একজন চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক হিসেবেও। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতকে উপহার দিয়ে গেছেন একের পর এক ব্যবসাসফল ছবি।

গাজী মাজহারুল আনোয়ারের গান শুধু বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নয়, সমৃদ্ধ করেছে আমাদের আধুনিক ও দেশাত্মবোধক গানকেও। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী  ২০ হাজারেরও অধিক গান লিখেছেন তিনি। বিবিসি বাংলার তৈরি করা করা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিশটি বাংলা গানের তালিকায় রয়েছে তার লেখা তিনটি গান।

এই কিংবদন্তি গীতিকবি, চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক গাজী মাজহারুল আনোয়ার এখন আর নেই। আজ রবিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে তিনি ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর ৬ মাস ১৩ দিন।

এই মৃত্যুর খবর গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন গাজী মাজহারুল আনোয়ারের পুত্রবধূ শাহানা মির্জা।

তিনি জানান, আজ সকালে রাজধানীর নিজ বাসায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। পরে তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

১৯৪৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার দাউদকান্দি থানার তালেশ্বর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। বাবা ছিলেন ব্রিটিশ আমলের একজন নামকরা আইনজীবী। বনেদি পরিবারের সন্তান। দাদা ও দাদি দুজনই ছিলেন জমিদার বংশের।

বেড়ে উঠেছেন কুমিল্লাতেই। গাজী মাজহারুল আনোয়ারের শিক্ষাজীবন শুরু হয় কুমিল্লা জেলা স্কুলে। এরপর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ। বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী ছাত্র গাজী মাজহারুল আনোয়ারের আইনজীবী বাবা চাইতেন ছেলে ডাক্তার হবে। তাই কলেজ শেষ করে ছেলে ভর্তি হলেন ঢাকা মেডিকেলে। কিন্তু ওষুধের গন্ধ, পঁচা-গলা লাশের গন্ধ সহ্য করতে পারলেন না তিনি। বলা যায়, হাসপাতালের দিনযাপন সহ্য করতে না পেরে সিদ্ধান্ত নিলেন ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দেবেন। আর সেই সময়টাতেই তিনি শুরু করলেন গান লেখা। ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দিয়ে গান লেখার খবর তার বাবার কানে যেতেই বাবা বড় বিষাদ-বেদনা নিয়ে তাকে চিঠি লিখেছিলেন, ‘ইউ আর মাই লস্ট গেম’। 

১৯৬২-৬৩ সালে মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় প্রথম গান লিখেন তিনি। সেই গানটি ছিল— ‘বুঝেছি মনের বনে রং লেগেছে’, যার সুর করেছিলেন নাজমূল হুদা বাচ্চু ও শিল্পী ছিলেন ফরিদা ইয়াসমিন। এরপর ১৯৬৪ সাল থেকে তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানে গান লেখা শুরু হয় তার। সেইসময়ে গানপ্রতি ৫০ টাকা পেতেন যা দিয়েই তার পেশাদার গীতিকার জীবন শুরু হয়েছিল। বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে টেলিভিশনের জন্য গান লিখে গেছেন তিনি।

তার গানে শুরু হয়েছিল স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র

গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা অজস্র কালজয়ী গানের মধ্যে অন্যতম একটি গান— ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’। যে গানটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে প্রেরণাদায়ক গান হিসেবে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিল। যে গানের গ্রহনযোগ্যতা চিরকালীন। এ গান আজো গাওয়া হয় এবং গাওয়া হবে চিরকাল। ‘বিবিসি বাংলা’র তৈরি করা করা শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ বিশটি বাংলা গানের তালিকায় এই ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ গানটি ১৩তম স্থান লাভ করে।

সংবাদমাধ্যমকে এক সাক্ষাৎকারে এই কালজয়ী গানের সৃষ্টির কথা বলতে গিয়ে গাজী মাজহারুল আনোয়ার জানিয়েছিলেন, “১৯৭০ সালের ৭ মার্চ, রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিলেন। দেশের মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়লো স্বাধীনতার জন্য সেই ডাকে সাড়া দিয়ে। বঙ্গবন্ধু ভাষণ শেষ করলেন ‘জয় বাংলা’ দিয়ে। সেই জয় বাংলার বারুদ ছড়িয়ে গেল সর্বত্র। যেদিন ভাষণ দিলেন সেদিন সন্ধ্যায় ফার্মগেটে একটি স্টুডিওতে বসে আছি। সেটি তখন খুব বিখ্যাত স্টুডিও। বড় বড় সব গানের মানুষদের আনাগোনা। সেখানে ছিলেন সালাহউদ্দিন স্যার। তিনি আমার স্কুলের স্যার ছিলেন। বললেন, ‘জয় বাংলা’ নিয়ে একটা কাজ করতে পারো। এই মুহূর্তে এটা প্রচার করা খুব জরুরি। মানুষকে উৎসাহ দেবে। আমি ভাবতে থাকলাম ‘জয় বাংলা’ নিয়ে কি লেখা যায়। শেষে বাংলা শব্দটা থাকলে ছন্দ মেলাতে কষ্ট হচ্ছে। ভালো শব্দ পাই না। বাংলা, হ্যাংলা….! তারপর সেটাকে ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ করে নিলাম। দেখলাম দ্রুতই গান দাঁড়িয়ে গেল। এর সুর-সংগীত করলো আনোয়ার পারভেজ। শাহনাজ রহমতুল্লাহ আর আব্দুল জব্বার গাইলো। সঙ্গে আরও অনেক শিল্পী ছিলেন। গান তৈরি করে বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে গেলাম। তিনি শুনে খুব পছন্দ করলেন। বললেন, ‘এই গান দিয়েই যাত্রা করবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’। আর গান প্রকাশ হতেই রাতারাতি সবার মুখে মুখে চলে গেল ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’।” স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সূচনা সংগীত হিসেবে নিয়মিত প্রচার করা হতো এই গান।

তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাক্ষাৎকার অবলম্বনে