জিহাদ’এর নতুন সংস্করণঃ নারী ও পোষাক

17

 

এম আখতার
উন্নয়ন কর্মী ও বিশ্লেষক

রাজনৈতিক স্লোগান ”সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ বাংলাদেশ”, অথচ দেশের সাধারণ জনগন আজকে সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শে বিভক্ত এবং রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যেই এই বিভাজনকে সমর্থন করছে অনেক রাজনৈতিক দল কিংবা রাজনৈতিক দলের কর্মী ও নেতৃবৃন্দ। দেশের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সংস্কৃতিক উন্নয়ন ও অর্জন সমূহ পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয় পর্যায়ে আজ সংকটের মুখোমুখি। শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবি সমাজ ভিন্ন ভিন্ন ধারার রাজনৈতিক, সামাজিক মুক্ত চিন্তার বাহিরে গিয়ে রক্ষনশীল মতাদর্শের আবর্তে বন্দী হয়েছে। ফলে শ্রমজীবি ও উৎপাদনমুখী সাধারন মানুষ, নারী ও যুব সমাজ আস্থাহীনতা ও অস্থিরতার মধ্যে দিন যাপন করছে, যা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে গ্রহনযোগ্য হতে পারে না। এমতবস্থায় সরকারী কর্তৃক গৃহিত উন্নয়ন কার্যক্রম সমূহ জনগনের মানবিক উন্নয়নের বিকাশকে প্রভাবিত করছে না। এই বিষয় গুলি অবশ্যই রাজনৈতিক, সামাজিক ও সংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গীর মাধ্যমে বিশ্লেষন করা প্রয়োজন। কেন এমন হচ্ছে এবং কেন কাঙ্খিত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধুর শোষনমুক্ত সমাজ ও ধর্ম নিরপেক্ষ রাজনৈতিক আবহ থেকে দেশ বঞ্চিত হচ্ছে।
১৯৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধের ও স্বাধিকার আন্দোলনের বীজ রোপন হয়েছিলো ১৯৫২ সনের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যদিও আমরা পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি ১৯৪৭ সনে পেয়েছিলাম বিভাজনমুলক ধর্মীয়ভাবে দ্বিজাতী তত্ত্বের ভিত্তিতে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সনের ২৬ মার্চ পর্য্যন্ত পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্রে বিভিন্ন নীতি, স্বসস্ত্র বাহিনী ও বৈষম্যমুলক নীতি দ্বারা নিষ্পেষন, নিপীড়ন এবং বৈষম্য সঠিকভাবে উপলদ্ধি করতে পেরেছিলো বিধায় সংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আর্দশের ভিত্তিতে স্বাধীনতা সংগ্রামের সুচনা এবং সাধারন নারী-পুরুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিলো। আমরা এমন রাষ্ট্র চেয়েছিলাম যেখানে আত্ম-নিয়ন্ত্রন থাকবে, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমে আসবে, সমতা ভিত্তিক একটি সমাজ গঠিত হবে, যেখানে গণতান্ত্রিকভাবে মত ও পথ চলার অধিকার নিশ্চিত হবে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশের উন্নয়ন সাধিত হবে। যে দেশে ধর্ম হবে ব্যক্তি বিশেষের এবং রাষ্ট্র হবে সকলের, ধর্মের নামে, জাতিগত ভাবে অথবা ভাষার ভিত্তিতে বৈষমের শিকার হবে না, নির্যাতনকে মেনে নেবে না, লিঙ্গ ভিত্তিক সামাজিক সকল বাধা দুর হবে, সম্পদের সুষম বন্টন, সকল ক্ষেত্রে মতামত প্রকাশের গনতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে। কিন্তু ১৯৭৫ সনের ১৫ আগষ্টের পথ যে দেশ উল্টো পথে চলা শুরু করেছিলো সেই চলা থামানোর সম্মিলিত প্রয়াস আজ অবধি দৃশ্যমান হয় নাই।
স্বাধীনতার ৫০ বছর, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ সমূহ ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রীয় জীবনে কতটুকু প্রতিফলিত করতে পেরেছি? বর্তমান সময়ে দাড়িয়ে আমি বা আমরা অবশ্যই বলতে পারি – মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে আমরা অনেক দুর সড়ে গিয়েছি বা সুচতুর ভাবে আমাদের সড়িয়ে দেয়া হয়েছে। যার ফলে উন্নয়ন সংগঠিত করার নিয়ামক শক্তি গুলির অন্যতম রাজনৈতিক কর্মকান্ড আজ দ্বিধাগ্রস্থ, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ব্যহত ও মেধা বিকাশে অসাম্যতা, অন্যায্যতা অনেক বেশী প্রভাব বিস্তার করছে। ধনী ও দরিদ্রর মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুচকে ব্যবধান অনেক বেড়েছ্।ে নতুন প্রজন্ম সঠিক নির্দেশন ও ইতিহাস থেকে কেন বঞ্চিত, সেই বিষয় সমূহ ও পরিবর্তনের খেলা সমূহ আমাদের কমবেশী জানা আছে। স্বাধীনতা বিরোধীদের ক্ষমতায় আহোরণ পর্যায়ক্রমে চাতুরতার সাথে জনগণকে বিভাজিত করেছে ভিন্ন ভিন্ন ধারায়, এবং স্বাধীনতা বিরোধীতাকারীরা সুযোগ পেয়েছে তাদের পñাদপদ আদর্শিক ধারার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বাধগ্রস্থ করতে। আজ যেখানে আমাদের প্রযুক্তি উন্নয়নের সাথে নিজের সম্পৃক্ত করে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখার কথা, প্রতিযোগিতামুলক বিশে^ আমাদের যোগ্য কওে তোলার সময় তখন আমরা প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ধর্মীয় উম্মাদনা সৃষ্টি করা করছ। বিশেষ করে মানুষের মনে ক্ষোভ তৈরী করা হচ্ছে ”৯১ ভাগ মুসলমানদের দেশে ইসলাম আজ হুমকির সম্মুখিন”, পোষাক দিয়ে ধর্মীয় বিদ্বেষ তৈরী করা হচ্ছে, আর এগুলি করার পিছনে উদ্যোগী ভুমিকা পালন করছে শিক্ষিত সমাজ বিশেষ করে শিক্ষিত যুব সমাজ। সুনামির মতো পানির নীচে দেশবিরোধী মৌলবাদি অপশক্তি যেভাবে শক্তি সঞ্চয় করছে এবং স্বাধীনতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভাবধারাকে সংখ্যালঘুতে পরিনত করছে তা হয়তো আমরা এখনও অনুধাবন করতে পারছি না। সমাজ সংস্কারক ও রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে যদি সঠিক সিদ্ধান্ত না নিতে পারি তাহলে উন্নয়নের ফল ব্যহত হবে ও ভবিষ্যত প্রজন্মর কাছে আমাদের জবাবদিহীতার সুযোগ থাকবে না।
আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বিভিন্ন সময় জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তীতে বাংলাদেশের বেশ কিছু অঞ্চলে ধর্মীয় সংখ্যালঘূ জনগোষ্ঠীর উপর নির্যাতন সংগঠিত হয়েছে, মৃত্যু ও যৌন নির্যাতনের মতো ঘটনার স্বাক্ষী দেশ হয়েছে। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী দেশ, সমাজ ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা হারিয়েছে, নিজেদের বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে কুন্ঠিত। বাংলাদেশ কি তাহলে সৃষ্টি হয়েছে শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে গুরুত্ব দিয়ে সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মকান্ড পারিচালিত করবে? এক সময় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে সৃষ্টি হয়েছিলো ‘বাংলা ভাই‘ নামক ধর্মীয় গোষ্ঠীর, পেয়েছিলো সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা এবং তারা প্রকাশ্যে সাধারণ মানুষ, প্রগতিশীল চিন্তার মানুষদের হত্যা করেছিলো। এই ধরনের উগ্রতা হয়তো বর্তমানে নেই, কিন্তু এই গোষ্ঠীর কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে? অবশ্যই না। এখন চলছে ধর্মীয় শিষ্টচারের প্রচার, প্রসার, কে কোন কাপড় পড়বে, কতটুকু মাপের কাপড় পড়বে, টিপ দিবে কি দিবে না ইত্যাদি। টাকনুর নিচে নাকি উপরে পেন্ট পড়বে, হিজাব নাকি শাড়ি পড়বে, এগুলি আবার কিছু মানুষ মনিটরিং করার চেষ্টা করছে। এখন আর এই কাজের জন্য বাংলা ভাই এর মতো উগ্রতার প্রয়োজন নেই, আমাদের মতো যে কেউ এই গুলি করতে পারে। ধর্মীয় কাজ তাই কেই প্রতিবাদ করে না, আবার তাদের পক্ষে জনসমর্থন বাড়ানোর জন্য প্লাকার্ড নিয়ে রাস্তায় দাড়াতেও দ্বিধাবোধ করছে না।,
গত ২০১৩ সনে হেফাজতের ঢাকা আক্রমনের পর থেকে এই ধরনের চিন্তার প্রসারে অনেক বেগমান হয়েছে। মৌলবাদি চিন্তায় বিশ^াসী মানুষগুলি বলছে, ‘আপনারা যেটাকে বলেন নাশকতা-সহিংসতা, আমরা সেটাকে বলি জিহাদ, আমরা আওয়ামী সরকারের বিরুদ্ধে জিহাদ করে যাচ্ছি। এই যুদ্ধে মারা গেলেই শহিদ, এই শহিদগণ সরাসরি বেহেশতে চলে যায়।‘ ২০১৩-২০১৫ পর্যন্ত কিছু রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকতায় গ্রামে গঞ্জে অনেক রাস্তা কেটে ফেলা হয়েছিলো। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছিলো ‘এলাকার রাস্তা কাটলে ও ব্রিজ নষ্ট করলে তো আপনাদেরই সমস্যা হয়‘ উত্তর ছিলে, ‘কষ্ট তো আমাদেরই হয়, তবে ইসলামের জন্য কষ্ট মেনে নিতে হয়‘। আজকে হয়তো সেই ধরনের উগ্রতা নেই তবে এখানে সেখানে মুর্তি ভাঙ্গা, হিন্দু জনগোষ্ঠীর উপর আক্রমণ কিন্তু থেমে নেই। এছাড়াও সুচতুর ভাবে হিজাব, পোষাক, টিপ, নারীর চলাফেরা ইত্যাদি বিষয় গুলি রাজনৈতিক অবয়বের বাহিরে নিয়ে প্রচার প্রসারের চেষ্টা চলছেই। সেখানে জড়ালো প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ নেই। আদর্শের লড়াই কিন্তু দৃশ্যমান হয় না, তাই এর ক্ষতিও আমরা তাৎক্ষনিক ভাবে বুঝতে পারছি না।
বর্তমান সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিকল্পিত ভাবেই ধর্মীয় উম্মাদন তৈরী করা হচ্ছে পরিকল্পিত ভাবে। ফেসবুকের কোন এক পোষ্ট নিয়ে হঠাৎ করেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর আক্রমন করা হচ্ছে, ভীতি তৈরী করা হচ্ছে। ঘটনার পর হয়তো আইন শৃঙ্খলা বাহিনী পদক্ষেপ গ্রহন করছে কিন্তু বিশেষ একটি জনগোষ্ঠীর যখন সমাজের প্রতি আস্থা নষ্ট হয়ে যায় তখন সরকারী পদক্ষেপ গুলি সেই জনগোষ্ঠীর পূর্ণ আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে না। আবার অনেক সাম্প্রদায়িক ঘটনায় দেখা গেছে মৌলবাদি গোষ্ঠীর প্ররোচনায় সরকারী ক্ষমতায় দায়িত্বপ্রাপ্ত দলের অনেক সদস্য অগ্রণী ভুমিকা পালন করছে। এগুলি সংগঠিত হচ্ছে ব্যক্তি কিংবা অর্থনৈতিক স্বার্থে। অথচ আমরা ভাবতে অক্ষম মৌলবাদি শক্তির এই আগ্রাসী আচরণ দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি তৈরী করছে। এটি খুব স্পষ্ট যে, আওয়ামীলীগ, প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল গুলি, সুধী সমাজ, বেসরকারী উন্নয়ন সংগঠন গুলি দেশ ও সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সৃষ্টি জন্য জনমত তৈরীর ক্ষেত্রে কিংবা সংখালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা প্রদানে আশানূরূপ দৃশ্যমান ফলাফল দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। এভাবেই সমন্বিত প্রয়াসের অভাবে অসম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চেতনায় ধরছে ভাঙ্গন, তৈরী হচ্ছে স্বাধীনতার মুল্যবোধের অবক্ষয় আর মৌলবাদি রাজনৈতিক শক্তি ও জিহাদী চেতার উম্মেষ। অতএব এখনই সময় দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান ধর্মী ভিত্তিক ঘটনা গুলির রাজনৈতিক মোকাবেলা করার, কারন আমাদেও মনে রাখতে হবে ১৯৭০ সনের নির্বাচনে ২৭ শতাংশ আওয়ামী বিরোধী ভোট এখন রাজনৈতিক ভাবে মহিরুহ।