জরুরি প্রয়োজন মেটাতেই খাবি খাচ্ছে ইউরোপীয়রা

কাপড় আয়রন করা কিংবা প্রতি বেলার খাবার ওভেনে গরম করে নেওয়া অথবা ঘরের তাপমাত্রা নিজের পছন্দমতো রাখার জন্য জ্বালানি খরচ করা—এমন ছোটখাটো প্রয়োজন মেটানোর কথা এখন চিন্তাই করতে পারছে না ইউরোপীয়রা। কারণ সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে গ্যাস-বিদ্যুত্সহ সব ধরনের জ্বালানির যে বিল দিতে হচ্ছে, তাতেই তাদের নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে।  

পূর্ব লন্ডনের গ্রিমসবি শহরের বাসিন্দা ফিলিপ কিটলে ঘর ঠাণ্ডা রাখার ফ্যানটা মোটেই চালু করেন না। অথচ এই মৌসুমে রেকর্ড দাবদাহে পুড়ছে ব্রিটেন।

কেন যে তিনি শীতলীকরণ ফ্যান চালান না তা তাঁর ব্যাংক হিসাব দেখলেই বোঝা যায়।  

কিটলে নিজেই বলেন, ‘জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে গেছে। অথচ আপনি আশা করছেন, যখন সংকট ছিল না, তখন যা আয় করতেন তা-ই দিয়ে এখনো খরচ চালিয়ে নেবেন। এই আয়ে হয় আমাকে খাওয়ার খরচ মেটাতে হবে, নয় তো ঘরের তাপমাত্রা ঠিক রাখতে হবে। ’ 

এই চিত্র শুধু যুক্তরাজ্যের নয়, বরং গোটা ইউরোপের। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অবস্থা বেগতিক বুঝে ইউরোপীয়রা তখন থেকেই গ্যাস, বিদ্যুত্ ও জ্বালানির ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে শুরু করে। এর মধ্যেই গেল ১২ মাসে ইউরোপে গ্যাসের দাম বেড়েছে ৫৫০ শতাংশ। ব্রিটিশ সরকার গতকাল শুক্রবার গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম ৮০ শতাংশ বাড়িয়েছে, যা সামনের অক্টোবর থেকে কার্যকর হবে। ফলে দেশটির বাসিন্দাদের গ্যাস-বিদ্যুত্ বাবদ বছরে চার হাজার ১৮৮ মার্কিন ডলার বিল গুনতে হবে।

কার্বন ব্রিফ নামের সংস্থার হিসাবে, এই শীতে গ্যাস, বিদ্যুত্ ও অন্যান্য জ্বালানির জন্য ব্রিটেনের বাসিন্দাদের আয়ের ১০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় করতে হবে। খরচের হিসাবে সংকটটা ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকের চেয়েও ভয়ানক আকার ধারণ করবে। যুক্তরাজ্য সবচেয়ে ভয়াবহ সংকট পার করেছে ১৯৮২ সালে। সে বছর সব ধরনের জ্বালানি বাবদ যুক্তরাজ্যবাসীকে তাদের আয়ের ৯.৩ শতাংশ ব্যয় করতে হয়েছে। সেই ব্যয় এবার ১০ শতাংশে পৌঁছাতে চলেছে এবং এই অঙ্কের ব্যয় হলে সেটাকে ‘জ্বালানি দারিদ্র্য’ আখ্যা দেওয়া হয়।
 
যুক্তরাজ্যের দাতব্য সংস্থা ন্যাশনাল এনার্জি অ্যাকশন (এনইএ) বলছে, সামনের অক্টোবর থেকে যুক্তরাজ্যের ৮৫ লাখ পরিবার জ্বালানি দারিদ্র্যের শিকার হতে পারে। গত অক্টোবরে এই সংখ্যা ছিল ৪৫ লাখ।  

পরিস্থিতি সামাল দিতে ইউরোপীয় সরকারগুলো সহযোগিতা দিচ্ছে, তবে তাতে জনগণের অবস্থার খুব একটা হেরফের হচ্ছে না বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।  

কিটলের কথাই ধরা যাক। গত এপ্রিলে চাকরি হারানোর পর থেকে তিনি সামাজিক নিরাপত্তা স্কিমের মাসিক ৭০৬.৪৪ মার্কিন ডলার দিয়ে কোনো রকমে জীবন চালিয়ে নিচ্ছেন। ওই অর্থের অর্ধেকই চলে যায় বাসা ভাড়ায়, বাকি অর্থে অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে তিনি হিমশিম খান। বিদ্যুত্-গ্যাসসহ সব জ্বালানির ব্যবহার একেবারে কমিয়ে দেওয়ার পরও বিল বাবদ চলে যায় তাঁর মাসিক অর্থের ১৫ শতাংশ। তিনি দিনে মাত্র একবেলা ভরপেট খেতে পারছেন।  

শুধু কিটলে নন, যুক্তরাজ্যের এক-তৃতীয়াংশ পরিবার ইলেকট্রিক কুকার ও ওভেনের ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন। ফিন্যানশিয়াল ফেয়ারনেস ট্রাস্টের জরিপে আরো দেখা যায়, গোসল করা কমিয়ে দিয়েছে যুক্তরাজ্যের এক-তৃতীয়াংশ পরিবার। দেশের অর্ধেক মানুষ তাদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বন্ধ রেখেছে।  

অনেকের জন্য জীবন রক্ষা করাই দায় হয়ে উঠছে। দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডের ৫৯ বছর বয়সী ডন হোয়াইট কিডনি রোগে আক্রান্ত। তিনি বলেন, ‘সপ্তাহে পাঁচবার মোট ২০ ঘণ্টা আমার (ডায়ালিসিস) মেশিন ব্যবহার করতে না পারলে আমি মারা যাব। ’

গোটা ইউরোপে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ) জানায়, চলতি বছরের শুরুতে গ্যাসের দাম যে হারে বেড়েছে তা  ১৯৭০, ১৯৮০ ও ২০০০ দশকের সংকটকে ছাড়িয়ে গেছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির বিচারে ইউরোপের বর্তমান অবস্থা অন্যান্য অগ্রসর অর্থনীতির দেশের তুলনায় নেতিবাচক।  

আইইএর উপাত্ত বলছে, আমেরিকানরা গত চার দশক ধরে প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য চড়া দাম দিয়ে আসছে। কিন্তু ২০২২ সালে আমেরিকানদের চেয়ে ইউরোপীয়দের ব্যয়ের মাত্রা বেড়ে গেছে।  

গ্যাসের দাম বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে অবস্থা সবচেয়ে খারাপ ইতালি ও জার্মানিতে। আইইএর উপাত্ত অনুসারে, গেল জুলাই থেকে জ্বালানি বাবদ বিশেষ করে গ্যাস ও বিদ্যুত্ বাবদ ইতালীয়দের আয়ের ৫ শতাংশ ব্যয় করতে হচ্ছে। ২০১৯ সালে এ হার ছিল সাড়ে ৩ শতাংশ।  

ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতির অধিকারী জার্মানিতে বাসবাড়ির গ্যাস বিল গত বছরের তুলনায় এ বছর জুলাইতে বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে।  
সূত্র : রয়টার্স