রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে এনজিওদের ভুমিকা

15

 

এম বি আখতার
উন্নয়নকর্মী ও বিশ্লেষক

বাস্তচ্যুত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে তৃতীয়বারে রমতো অবৈধ্য আগমনের পাঁচবছর হতে চলেছে। এই সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলিসংগঠিত, শৃঙ্খলায় আবদ্ধ হয়েছে, আবারঅনেকেরমধ্যে আগ্রহ তৈরীহয়েছে”মিয়ানমারে ফেরত না গিয়ে স্থানীয়দের সাথে মিশেযাওয়া”। এই কাজে সহযোগিতাকরছে এদেশের কিছু নাগরিক যাদের রয়েছে রোহিঙ্গাদের সাথে রাজনৈতিক দর্শনের একাত্মতা কিংবা আত্মীয়তা। এই সময়ে অনেক বারমিয়ানমারে ফেরত, ভাষান চরে সাময়িকভাবে স্থানান্তরকরার উদ্যেগ সরকার গ্রহন করেছে যা সাধারন নাগরিক দেখেছে। ২০১৭ সনে রোহিঙ্গাদের আগমনকে সাধারনজনগন যেভাবে স্বাগতজানিয়ে ছিলো কিন্তু পাঁচবছরে এসে তাদেরকে বোঝা মনেকরেছে। কেন? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়াটা অনেক বেশীজটিল ও বিশদ বিশ্লেষনের প্রয়োজন। বিগতপাঁচবছরে রোহিঙ্গা বাস্তচ্যুতদেও মাঝে রাজনৈতিক দর্শনের সমাবেশ ঘটেছে, দীর্ঘমেয়াদী শোষন ও অত্যাচারের অতিষ্ট রোহিঙ্গাদেও মধ্যেধর্মীয় ও সশস্ত্র সন্ত্রাসের মতো রেডিকালিজমভিত্তি তৈরীহচ্ছে, ড্রাগব্যবসারমাধ্যমে অনেকেই অর্থনৈতিক ভাবে লাভবান হয়েছেন, নিজেদের মধ্যে সামাজিক আধিপত্য বিস্তারে হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে।জনগন ভাবছে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুগণ আমাদের সহানুভূতিকে পুঁজি করে, সহানুভূতিকে দূর্বল ভেবেনিজেদের শক্তি প্রদর্শনকরছে, অনেক ক্ষেত্রে মনে হচ্ছে তারা বাংলাদেশ সরকারের অবস্থানের বিরুদ্ধে নিজেদেও শক্তি প্রদর্শনকরছে। রোহিঙ্গাদের আগ্রাসী মনোভাব ও আচরণ প্রদর্শন হয়তোপিছন থেকে কোনঅদৃশ্য শক্তির উস্কানিতে করছে কিংবা কোন প্রকার রাজনৈতিক দর্শন প্রতিষ্ঠিতকরার জন্য করছে। তবে দীর্ঘ সময় উদ্বাস্তু শিবিরে বসবাস করলে এধরনের পাশ্ব^প্রতিক্রিয়াহ ওয়াটা স্বাভাবিক। এই সকল কারনে হয়তো বাংলাদেশের সাধারন জনগনের কাছে রোহিঙ্গাদের প্রতি প্রথমদিকে যে সহানুভুতি ছিলোতা ধীরে ধীরে ক্ষয়হচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবসনেরজন্য গত ২২ আগষ্ট ২০১৯ তারিখ ঠিকছিলো, বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চিনের প্রতিনিধি গণ অপেক্ষা মানছিলেন রোহিঙ্গা নারী-পুরুষগণ সম্মানের সাথে আনন্দ চিত্তে ক্যাম্পের সামনে অপেক্ষামান গাড়ীতে উঠবেন এবং ফিরেযাবেন নিজ মাতৃভুমিতে। সেইঅভিযান সফল হয়নাই, সেইসময়ের মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়ের উক্তিছিলো ”রোহিঙ্গাদের আর আরামে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ানো যাবেনা”। তারপর থেকেই বিভিন্ন সামাজিক গণমাধ্যমে এনজিওদেও বিরুদ্ধে শুরুহয়আলোচনা, সমালোচনা ।চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক কোন পত্রিকায় লিখেছেন ”রোহিঙ্গাদের প্রতি আপনাদের দরদ বাঙালিদের চেয়ে বেশি হলে কে মানা করেছে আপনাদের নিজ দেশে নিয়ে যেতে? রোহিঙ্গা শিবির মৌচাকে পরিণতহয়েছে। একে কেন্দ্র করে দেশি-বিদেশি‘মধুসংগ্রহকারীরা’সুবিধাআদায় করতেচান। আবারঅনেকেই কক্সবাজারের ৫ তারা হোটেলের আরাম-আয়েশ ছেড়ে ভাসানচরের কম আরাম-আয়েশে যেতে চাননা বলে রোহিঙ্গা স্থানান্তর ঠেকিয়ে রাখতেচান”। এভাবেই হয়তো জনমনে ধারনাসৃষ্টি হয়েছে রোহিঙ্গাদের এদেশে আরাম ও আয়েশে রাখার জন্য এনজিওরা দায়ী, রোহিঙ্গারা এদেশে থাকলে এনজিও গুলিতে বেশী বেতনেচাকুরীবহাল থাকবে।বাংলাদেশে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধিনেএনজিও বিষয়ক ব্যূরোর পরিপত্র অনুসারে অর্থ সংগ্রহন ও ব্যয়করছে। নিয়মিত জবাব দিহীরব্যবস্থাও রয়েছে, অতএব এনজিওদের কাজসম্পর্কে খুব সরলীকরণ মন্তব্য গ্রহনযোগ্য হওয়া মুসকিল।
রোহিঙ্গাদের সাথে যে আস্থার সংকট যুগে যুগে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা কিংবা বিগতসুচি সরকার তৈরীকরেছে,কয়েকটি সভা কিংবা জাতি সংঘের উচ্চপর্যায়ে কয়েক জনপ্রতিনিধিরআগমন ও আলোচনায় সেই আস্থা পুনর্দ্ধার হবে এমন ভাবনা থেকে আমাদের ফিরে আসতেহবে।ভাবতেহবেঅত্যাচর ও নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের একক চিন্তায় আনার জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহন করা প্রয়োজন,নাকিএনজিওদের দোষারোপ কিংবা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলেরজন্য সরকারকে দোষারোপ করে আমাদের দায়িত্ব শেষ করাউচিত?আন্তর্জাতিকসংগঠনসমুহঅনেক ক্ষেতেমনেকরেবাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের অবাধেচলাফেরা, শিক্ষাগ্রহন ও আয়-রোজগারেরসুযোগ দেয়া উচিত। আমাদের মনে রাখতে হবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শরণার্থী চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি বিধায় রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ শরণার্থীর মর্যাদাও দেয়নি ফলে তাদের নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতার মধ্যেই বসবাস করতেহবে। হয়তো এই সকল কারনে সাধারন জনগনের মনে হয়েছে এনজিওদের দ্বারা সহায়তা প্রাপ্তিরকারনে রোহিঙ্গারা প্রত্যাবাসনেআগ্রহীনয়। প্রশ্ন আসে তবেকি রোহিঙ্গাদেও নিয়ে কর্মরত সকল এনজিও’রকার্য়ক্রম বন্ধকরলে রোহিঙ্গারা দেশে ফিরেযাবে? সেই নিশ্চয়তাও তো সরকার এযাবৎ তৈরী করতে পারে নাই। অতএব এনজিওদের এক তরফাভাবে দোষারোপ করা যায় না তবেতাদের কাজের সমালোচনা হতেপারে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনও আন্তর্জাতিকএনজিও গুলির অনুরোধে বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমারসীমান্ত উম্মুক্ত করে রোহিঙ্গাদের আগমনকে স্বাগতজা নিয়েছিলো, পাশাপাশি তাদের মানবিক সহায়তা হিসেবে নুন্যতম খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান ও শিক্ষারমতো মৌলিকসহযোগিতা গুলিপ্রদানেপ্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রাথমিকপর্যায়ে দেখা গেছে মুসলিমভ্রাতৃত্বরনিদর্শনপ্রকাশেসাধারনজনগনেরমধ্যে অনেক বেশীআগ্রহযা ২০১৭ সনেআগষ্টের শেষ সপ্তাহে সরকারকে রাজনৈতিক মাইলেজ গ্রহনে হয়তো উৎসাহিতকরেছিলো এমনএকটি দীর্ঘ মেয়াদী আঞ্চলিক,রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সমস্যাকে গ্রহন করতেদ্বিধা করে নাই। সরকারের গৃহিত যথাযথ পদক্ষেপ, এনজিও, দাতাসংস্থা ও জাতিসংঘেরসংশ্লিষ্টসংস্থা সমূহের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ১০ লক্ষের অধিকআশ্রিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীরপ্রাথমিক ও মৌলিকচাহিদাসমূহনুন্যতমভাবেপুরণ ও রোহিঙ্গাদের মাঝেনিরাপত্তা ও স্বস্থিরপরিবেশ তৈরীহয়েছে। শৈতপ্রবাহ, ভুমিধস, ঝড় ও অতিবৃষ্টিরমতোপ্রাকৃতিক দুর্যোগেওউদ্ববাস্তু শিবিরেজীবনহানি ঘটে নাইযাশরনার্থী ব্যবস্থপনায়হয়তোবাএকটিসফলতারউদহারণ।
গত কয়েক দশক থেকে রোহিঙ্গাদেও উপরমিয়ানমারসরকারেরঅন্যায়, অবিচার, অত্যাচার, নির্য়াতন চলছে এবং তাদের সকলপ্রকারনাগরিকঅধিকার থেকে বঞ্চিতকরেরাখাহয়েছে। সত্তরের দশকে, নব্বইয়ের দশকে, এবং বর্তমানশতকেকয়েকবার রোহিঙ্গা সম্প্রদায়বাংলাদেশে আশ্রয়নিয়েছেতাই রোহিঙ্গাদের অবৈধপ্রবেশাধিাকারেরবিষয়বাংলাদেশ সরকারের নিকট নিশ্চয়ই অপরিচিত ছিলোনা বা আকস্মাৎ কোন ঘটনা নিশ্চয়ইছিলোনা। জানিনা কেন এই বিষয়টি নিয়ে পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রনালয় গত ৪ দশকে কোন সুদুরপ্রসারী পরিকল্পনাবা পদক্ষেপ গ্রহন করে নাই। বাস্তচ্যুত রোহিঙ্গাদের জীবন-জীবিকানিরাপত্তাএবংনাগরিক অধিকার নিশ্চয়তা ছাড়া নিজ দেশে প্রত্যাবাসন করবেনা এটিই স্বাভাবিক। আশ্রিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কৃতি অনেক বেশী রক্ষনশীলবিধায়তাদের নিকট যুক্তির চেয়েধর্মীয় উম্মদনাঅনেক বেশীগ্রহনযোগ্য। রোহিঙ্গাদের আগমনের প্রথমথেকেই ধর্মীয় স্বার্থন্বাসীমহল রাজনৈতিক স্বার্থে কাজ করছে চলমান সমস্যার পথকে বাধাগ্রস্ত করছে। রোহিঙ্গাদের আগমন, অবস্থান, প্রত্যাবাসনে জটিলতা, সমস্যার রাজনৈতিক ও ধর্মীয়প্রলেফ, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলির অবস্থানেরইত্যাদি নিয়েএর পক্ষে কিংবাবিপক্ষে আলোচনা ও রাজনৈতিকবিশ্লেষনহওয়াউচিত।
এনজিও সমুহ রোহিঙ্গাদের সমস্যার গভীরে গিয়ে স্থায়ীসমাধানেরজন্য দীর্ঘমেয়াদীকর্মসূচী গ্রহনকরতেকতটুকুআগ্রহী সেইবিষয় টি নিয়ে এনজি ওদের প্রশ্নকরা যেতেপারে। আঞ্চলিকভাবে এনজিও গুলি মিয়ানমার সরকারের উপরচাপ তৈরীকরতেপারে, মিয়ানমারের মানবাধিকার সংগঠন গুলি সেই দেশেরজনগণের মধ্যে রোহিঙ্গাদেও অধিকারেরপক্ষেজনমত তৈরীকরতেপারে, জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক শক্তি গুলিরমাঝে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনেরপ্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবতাকে তুলে ধরতে পারে। সংগঠনগুলির এদেশিয় কিংবা আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে এই ধরনের কার্যক্রম গ্রহন ও বাস্তবায়নের দৃশ্যমানকাজ স্থানীয়পত্র-পত্রিকায় দেখা যায় না, এবিষয় নিয়ে এনজিওদেও কাজের সমালোচ না হতেপারে। দক্ষিন ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত, শ্রীলংকায়উন্নয়ন ও দূর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলি বিশদকার্য়ক্রম রয়েছে। এই দেশ গুলিতে সরকার বা জনগন বা সুশীলসমাজেরমধ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংগঠিত ইতিহাসের বর্বরতম হত্যাকান্ড বিরুদ্ধে জনমত তৈরীকরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উপর কাজ করতেপারে। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশে র মূলধারার গণমাধ্যম গুলিকে নিয়ে কাজক রার ক্ষেত্রেও এনজিওদের মধ্যে একধরনের দুরত্ব পরিলক্ষিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক এনজিও ও স্থানীয় উন্নয়নসংগঠন গুলির উচিৎপরোক্ষ ভাবেহ লেওসংশ্লিষ্ট দেশের জনগনকে সংগঠিত করে সমস্যা সমাধানে দেশীয় ও আঞ্চলিকচাপ সৃষ্টি করা
এবংসমস্যার টেকসইসমাধানেভূমিকারাখা।
বাংলাদেশ সরকারএবং দেশপ্রেমিকজনগনেরউচিতএনজিওদের উপরঢালাওভাবে দোষারোপনাকরেতাদের অভিজ্ঞতা, বাংলাদেশে ও মিয়ানমারের পাশাপাশি আঞ্চলিক উপস্থিতি ও কাঠামোকেকাজেলাগিয়ে রোহিঙ্গাদের জরুরী সেবার পাশাপাশি এমন কর্মসূচী গ্রহনে আগ্রহী
হওয়া যার মাধ্যমে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে স্থায়ীসমাধানে দায়িত্বশীলতার সাথে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক জনমত সৃষ্টিতে অগ্রণী ভুমিকা রাখতে পারেন।