তিনিই বাংলাদেশ

 

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার পিএসসি (অব.)

১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতীর জন্য কালো অধ্যায়ের সূচনা হয় ১৯৭৫ সালের এই দিনে। বাঙালি পরিচয় দিতে গর্ববোধ করে এমন সব মানুষের জন্য ১৫ আগস্ট অত্যন্ত মর্মান্তিক, বেদনাদায়ক ও গ্লানিকর দিবস। গত ৫১ বছরে যে বিষয়টি বাংলাদেশে প্রমাণিত হয়েছে তা হলো, একটি জাতি রাষ্ট্র গঠনে কীভাবে একজন মহান নেতার ভূমিকা একক এবং অনন্য হয়ে ওঠে, যেটি ব্যতিরেকে কোনো জাতির রাষ্ট্র গঠন সম্ভব হয় না। ইতিহাস ঘাঁটলেই এর অনেক প্রমাণ মিলবে। তাই ওই মহান নেতার মৃত্যুতে বা তাকে হত্যা করে সেই জাতি রাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘটানো যায় না। বাংলাদেশ সৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একক অবদান গবেষণালব্ধ দৃষ্টিতে দেখলে এবং তাঁর মৃত্যুর ৪৭ বছর পর বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতি আবার যেভাবে জেগে উঠেছে তার দিকে তাকালে আমার উপরোক্ত কথার যথার্থতা প্রমাণিত হয়। ১৯৭৫ সালে ২৮ আগস্ট, ঘটনার মাত্র তিন দিনের মাথায় লন্ডনের খ্যাতনামা পত্রিকা দ্য লিসনার মন্তব্য প্রতিবেদনে বলেছিল, শেখ মুজিব রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে এবং জনগণের মধ্যে উচ্চতম আসনে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবেন। এটা শুধুই সময়ের ব্যাপার। সেটা যখন ঘটবে, তখন নিঃসন্দেহে বুলেটে ক্ষতবিক্ষত তাঁর বাসগৃহ, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্মারকচিহ্ন এবং তাঁর সমাধিস্থল পুণ্যতীর্থে পরিণত হবে। এই ভবিষ্যদ্বাণীটি আজ সত্য হয়েছে। ১৯৭৫ সালের পর অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীরা এবং একাত্তরে পরাজিত এ দেশীয় পাকিস্তানি দালাল গোষ্ঠী সীমাহীন অপপ্রচার শুরু করে এই মর্মে যে, কোনো একজন বা একক ব্যক্তির দ্বারা একটি জাতি ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। এই অপপ্রচার এখনো অব্যাহত আছে। তাই ঐতিহাসিক কয়েকটি ঘটনার তাৎপর্য তুলে ধরা প্রয়োজন যাতে নতুন প্রজন্ম ওই অপপ্রচারের ফলে বিভ্রান্তিতে না পড়ে।

এক. গত শতকের ষাট দশকের শুরুতে বাংলাদেশ স্বাধীন করার সিদ্ধান্ত নেন বঙ্গবন্ধু এবং উপলব্ধি করেন, তার জন্য প্রয়োজন হবে ভারতের সমর্থন ও সহযোগিতা। তখন থেকেই তিনি ভারতের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেন। গত শতকের ষাট দশকের মধ্যভাগে আগরতলায় পুলিশের আইজি ছিলেন ফণীন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, যিনি সবার কাছে নাথবাবু নামে পরিচিত ছিলেন। নাথবাবু উদ্যোগ নেন বঙ্গবন্ধুকে আগরতলায় এনে ত্রিপুরার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রনাথ সিংহের সঙ্গে বৈঠক করবেন। কিন্তু দিল্লির মতামত ব্যতীত এসব করা সম্ভব নয়। তাই নাথবাবু মুখ্যমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে দিল্লি যান এবং ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের তৎকালীন সংশ্লিষ্ট রাজনীতিক ও কর্মকর্তাদের সব জানান। তখনই সিদ্ধান্ত হয় মুজিবের সঙ্গে ভারতের শীর্ষ রাজনীতিকদের একটি বৈঠক করাবেন। নাথবাবু বৈঠকের স্থানও নির্ধারণ করেন। সে সময়ে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রী। ১৯৬৫ সালের জুন মাসে শাস্ত্রীর সঙ্গে লন্ডনে কমনওয়েলথ সম্মেলনে যান তৎকালীন তথ্য ও প্রচারমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। নাথবাবুই প্রথমে লন্ডনে গিয়ে দুই নেতার বৈঠক ঠিক করেন। স্থান ছিল লন্ডনের সাউদাম্পটন রোডে ড. তারাপদ বসুর বাড়িতে। ফিরোজ গান্ধী ও ইন্দিরা গান্ধী দুজনের সঙ্গেই তারাপদ বসু খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। সে সময় ওই বাড়িতেই বঙ্গবন্ধু ও ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয়। সেই বৈঠকেই স্থির হয় পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তান বেরিয়ে আসবে। ভারতের প্রখ্যাত প্রবীণ সাংবাদিক সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত লিখেছেন, এ খবর ড. তারাপদ ও নাথবাবু আমায় বলেছেন। ১৯৬৬ সালে তাসখন্দে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী মারা যাওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন ইন্দিরা গান্ধী। ফলে কাজটা আরও সহজ হয়ে যায়। এই তথ্যগুলো ২০১৪ সালে বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে লিখেছেন সাংবাদিক সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত।

দুই. ছয় দফা বাংলাদেশের স্বাীনতার ম্যাগনাকার্টা। ছয় দফা গ্রহণ ও রোষণার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুকে একলা চলতে হয়েছে। তখনকার আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাসহ পূর্ব পাকিস্তানের সব রাজনৈতিক নেতা ছয় দফার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তাদের মতে, এটা বিচ্ছিন্নতাবাদী ও দেশদ্রোহের শামিল। আইয়ুব খান সবাইকে ফাঁসিতে ঝোলাবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ছয় দফার ওপর অনড় থাকেন এবং কেউ না এলে একাই এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ছয় দফাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তাজউদ্দীন আহমদ এবং অন্যান্য অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতাকে নিয়ে আওয়ামী লীগকে নতুনভাবে পুনর্গঠিত করেন। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধু ছয় দফার ওপর সম্পূর্ণ অনড় থাকার কারণেই ইয়াহিয়া ব্যর্থ হয়ে পাকিস্তানে ফিরে যান। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। বঙ্গবন্ধু ছয় দফা এমনভাবে তৈরি করেন, যাতে এটাকে সরাসরি বিচ্ছিন্নতাবাদী দলিল বলার সুযোগ নেই, অন্যদিকে পাকিস্তান এটা মেনে নিলে তার পথ ধরেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর বিচক্ষণতা ও কৌশলের কাছে সেদিন পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সামরিক শাসককুল সবাই পরাজিত হয়। তাই এটা এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, ছয় দফাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য এক নম্বর অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। নেতৃত্বের বিচারে এর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব বঙ্গবন্ধুর একার।
তিন. ষাট দশকে ছয় দফা উত্থাপনের পর আইয়ুব খান বঙ্গবন্ধুর সামনে বন্দুক তাক করার ভান করলেও পিছনে হাজারো লোভনীয় প্রস্তাব নিয়ে দেনদরবার করার চেষ্টা করেছেন। আইয়ুব খান প্রস্তাব করেন মোনেম খাঁর পরিবর্তে শেখ মুজিবকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর করা হবে। একই সঙ্গে আইয়ুবের ছেলে গওহর আইয়ুবের মালিকানাধীন গান্ধারা (বর্তমান বাংলাদেশের প্রগতি) ইন্ডাস্ট্রিজের শতকরা ৪৯ ভাগ শেয়ার বঙ্গবন্ধুকে দেওয়া হবে। এই শেয়ার কেনার টাকার ব্যবস্থাও আইয়ুব খান করবেন। এই প্রস্তাব বঙ্গবন্ধু একাই শুধু ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন তা নয়, বেগম মুজিব প্রস্তাবকারীকে বলেন, শেখ মুজিবকে মোনেম খাঁ বানানোর চেষ্টা করবেন না।

চার. ইয়াহিয়া খানের এলএফও এবং ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর দক্ষিণ বাংলায় ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের অজুহাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নেতারা নির্বাচনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং নির্বাচন স্থগিত করার দাবি তোলেন। মওলানা ভাসানী, আতাউর রহমান খান, ইউসুফ আলী চৌধুরী, কৃষক শ্রমিক পার্টির সভাপতি এস এম সোলায়মান নির্বাচনে ভোট দেননি। কিন্তু নির্বাচন স্থগিত করার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দৃঢ় প্রতিবাদ এবং বঙ্গবন্ধুর আপসহীন অবস্থানের কারণে শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পূর্ব পাকিস্তানে ১৬২টি নির্বাচনী আসনে সরাসরি নির্বাচন হয় এবং তাতে আওয়ামী লীগ একাই ১৬০ আসনে জয়ী হয়। তার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিজয়ী দল হয়ে এককভাবে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের ন্যায্য ও আইনগত অধিকার পায় আওয়ামী লীগ। সারা বিশ্বে সেটা প্রচার হয়ে যায়। তখন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের নির্বাচন না হলে এবং তাতে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সুদূরপরাহত হয়ে যেত। একাত্তরে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না।

পাঁচ. একাত্তরে যুদ্ধের ৯ মাস বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে নির্জন কক্ষে বন্দি ছিলেন। তিনি কারও সঙ্গে কথা বলতে পারতেন না। সংবাদপত্র, রেডিও, টিভি-কোনো কিছুই তাকে দেওয়া হয়নি। তিনি জানতে পারেননি বাংলাদেশে কী হচ্ছে। এ রকম অবস্থায় নির্ঘাত ফাঁসির কথা জেনেও পাকিস্তানের সব ধরনের আপস প্রস্তাব বঙ্গবন্ধু প্রত্যাখ্যান করেছেন। ভেবে দেখুন, তখন বঙ্গবন্ধু যদি পাকিস্তানের সঙ্গে একটা আপস রফায় স্বাক্ষর করতেন, তাহলে কি স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্বের কোনো দেশের সমর্থন পাওয়া যেত?

ভারত কি এভাবে সমর্থন ও সরাসরি সশস্ত্র বাহিনী দ্বারা সাহায্য করতে পারত? এরকম সব প্রশ্নের উত্তর হবে না। তাহলে কি স্বাধীনতা অর্জন সুদূরপরাহত হয়ে যেত না? এসব কারণে এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, বঙ্গবন্ধুর একক সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্বে এবং ভূমিকায় বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর সীমাহীন ত্যাগ, আদর্শ, চিন্তা, দর্শন ও দূরদর্শিতার কাছে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই পাকিস্তান পরাজিত হয়ে যায়। তারপর যুদ্ধ ছিল পাকিস্তানের শেষ যবনিকা টানার উপলক্ষ মাত্র। তাই বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম এবং আদর্শ, ত্যাগের দৃষ্টান্ত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে প্রোথিত করার কার্যক্রম অব্যাহতভাবে চলা দরকার। এই সময়ের বাংলাদেশে বিরাজমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বঙ্গবন্ধুকে শুধু পোস্টার, সাইনবোর্ড, স্লোগান আর বক্তৃতার কথামালার মধ্যে সীমিত ও সাজিয়ে রাখলে তার থেকে মানুষ কিছু পাবে না। বঙ্গবন্ধুকে সম্পূর্ণভাবে তুলে ধরতে হবে। বঙ্গবন্ধুকে জানলে বুঝলে দেশ, জাতি, মানুষ, তরুণ প্রজন্ম কীভাবে উপকৃত হবে, তার পক্ষে তথ্য সমৃদ্ধি যুক্তি সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে ষড়যন্ত্র, অপপ্রচার, মিথ্যাচার ও ইতিহাস বিকৃতি থেকে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মকে বাঁচাতে হবে। বঙ্গবন্ধুর চিন্তা দর্শন আমরা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে পারিনি বলেই আজ রাজনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রনীতিতে ভয়াবহ অবক্ষয় ঘটেছে। এটা আমাদের জাতীয় ব্যর্থতা। তরুণ প্রজন্মের উপলব্ধিতে আনতে হবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ রাষ্ট্র-রাজনীতিসহ সর্বত্র পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে চলমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় তারা নতুন প্রজন্ম কীভাবে বৈষয়িক এবং আত্মিকভাবে লাভবান হবে। জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর মর্মান্তিক হত্যাকান্ড সম্পর্কে গবেষণালব্ধ কিছু তথ্যের উল্লেখ করে আজকের লেখাটি শেষ করব। প্রখ্যাত সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার লেখা, বাংলাদেশ অ্যা লেগাসি অব ব্লাড গ্রন্থে ১৫ আগস্ট হত্যাকান্ডের পটভূমি বর্ণনাসহ ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তি ও পক্ষের একটা ধারাবাহিক প্রাঞ্জল বিবরণ পাওয়া যায়। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে। মোট পৃষ্ঠা ১৮৬। পুরো বইটি না পড়েও আগ্রহী পাঠক শুধু পৃষ্ঠা ৯০-এর পর দুটি পাতায় যে কয়টি ছবি আছে সেগুলোর দিকে একটু পরিপক্ব দৃষ্টিতে তাকালে হত্যাকান্ডের সঙ্গে প্রধানত কারা জড়িত সে সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা পাবেন। একটি পাতার প্রথম পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর মরদেহ গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ধানমন্ডির বাড়িতে পড়ে আছে। ওই পাতারই অপর পৃষ্ঠায় দুই খুনি কর্নেল ফারুক ও রশিদের ছবি পাশাপাশি। এ দুটি ছবির ঠিক ওপরেই কালো চশমা পরা জেনারেল জিয়াউর রহমানের দৃষ্টিরেখা দুই খুনির মাথার ওপর দিয়ে দূরে নিক্ষেপিত হওয়ার ছবিটি আছে। পরের পৃষ্ঠায় আছে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি কারাগার থেকে ফিরে এলে বিমানবন্দরে খন্দকার মোশতাক কর্তৃক বঙ্গবন্ধুকে জড়িয়ে ধরে চুম্বনরত একটা ছবি, সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক ছবিটি আছে তারপরের পৃষ্ঠায়। চট্টগ্রাম হালিশহরের অন্ধ হাফিজ পরিচয়ে লম্বা চুল দাড়ি গোঁফওয়ালা একজন বিহারির ছবি-তার প্রকৃত নাম বইতে নেই, অন্য কোনোভাবেও জানতে পারিনি। লোকমুখে প্রচার ছিল তিনি নাকি আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। বইয়ের ভিতরের বর্ণনায় পাওয়া যায়, ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট কর্নেল ফারুকের স্ত্রী ফরিদা রহমান এই অন্ধ হাফিজের কাছ থেকেই হত্যাকান্ডের চূড়ান্ত সবুজ সংকেত পেয়ে ফারুককে দ্রুত কাজ সেরে ফেলতে বলেন। বিভিন্ন তথ্যসূত্রে জানা যায়, ওই বিহারি অন্ধ হাফিজ ছিলেন পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের নিয়োজিত এজেন্ট। জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে লেখা এই প্রবন্ধের উপসংহারে প্রশ্ন আকারে দুয়েকটি বিষয় তুলে ধরতে চাই। এক. একবার ভেবে দেখুন, পাকিস্তানি শাসকদের লোভনীয় প্রস্তাবের প্রলোভনে পড়ে বঙ্গবন্ধু যদি গভর্নর মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী হতেন, তাহলে বাংলাদেশ কি একাত্তরে স্বাধীন হতো? দুই. ছয় দফা নিয়ে বঙ্গবন্ধু যদি এককভাবে সেদিন এগিয়ে যাওয়ার সাহস না দেখাতেন এবং একাত্তরের মার্চ মাসে ইয়াহিয়ার সঙ্গে আপস করতেন, তাহলে কি বাংলাদেশ স্বাধীন হতো? তিন. সত্তরে নির্বাচন না হলে এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ১৬২টি সরাসরি নিবাচনী আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ এককভাবে যদি ১৬০টি আসন না পেত, তাহলে কি বাংলাদেশ এত অল্প সময়ের মধ্যে স্বাধীন হতো? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই বলে দেয় বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু এক এবং অভিন্ন। তাই তিনিই বাংলাদেশ।

 

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

sikder52@gmail.com