প্রার্থনা, দ্রুত সুস্থ হোন রুশদী

5

 

সালমান রুশদী আমার খুব প্রিয় লেখক। এই মুহূর্তে বিশ্বের জীবিত বিশজন বিখ্যাত ও শীর্ষ ঔপন্যাসিকদের একজন। তার লেখায় প্রাচীন ইতিহাস ও পৌরাণিক কাহিনি (মিথ) থাকে। এই কারণে তার লেখা আমার খুব ভালো লাগে।
১৯৮৯ সালে তার নামের সাথে আমি প্রথম পরিচিত হই। তখন হঠাৎ দেখলাম বাংলাদেশে তার ফাঁসির দাবি করা হচ্ছে। রাস্তাঘাটে মিছিল হচ্ছে। কেন? তিনি নাকি ইসলামের নবী মোহাম্মদ ও আল্লাহর বিরুদ্ধে স্যাটানিক ভার্সেস নামে একটি উপন্যাস লিখেছেন। ইরানের ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি তার মাথার দাম ৫ কোটি ডলার ঘোষণা করেছেন। আচ্ছা, বই লিখলে কারও মাথা কাটতে হবে কেন? প্রশ্ন এলো মনে।
রুশদীর বইয়ের কোনো তথ্য কিংবা বক্তব্য নিয়ে আপত্তি থাকলে আপনি পাল্টা আরেকটি বই লিখুন। পাঠক দুটো বই পড়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। কিন্তু একটা বই লেখায় আপনি একজন মানুষকে হত্যা করবেন—সে কেমন কথা! শান্তির ধর্ম ইসলাম এটা কি অনুমোদন দেয়? কোরানে আমি এটা পাই নি!
মুসলমানদের মধ্যে চরমপন্থী একটি অংশের হন্যে হয়ে রুশদীর ফাঁসির দাবিতে রাস্তা গরম ও মোড়ে মোড়ে কুশমূর্তি পোড়ানো দেখে স্যাটানিক ভার্সেসের প্রতি আমার ব্যাপক আগ্রহ জাগে। ততদিনে বাংলাদেশে বইটি নিষিদ্ধ হয়েছে। তবুও খুঁজতে থাকি। খুঁজি রুশদীর অন্য বইও। একদিন হঠাৎ পেয়ে যাই ১৯৮১ সালে তার বুকার জয়ী বই মিডনাইটস চিলড্রেন। বইটি পড়ে অভিভূত হই।
তারপর একে একে পড়ি শেইম, দ্য মুরস লাস্ট শাই, ইমাজিনারি হোমল্যান্ডস, ইস্ট-ওয়েস্ট, দ্য উইজার্ড অব ওজ, দ্য জাগুয়ার স্মাইল, ইজ নাথিং স্যাকরেড, ইন গুড ফেইথ, ফিউরি ও দ্য গ্রাউন্ড বিনিথ হার ফিট। বইগুলো পড়ে আমি রুশদীর রীতিমতো ভক্ত হয়ে যাই।
এরপর হাতে এলো সেই কাঙ্খিত বই স্যাটানিক ভার্সেস। ৫৪৬ পৃষ্ঠার বইটি আমি অন্তত দশবারো বার পড়েছি। কিন্তু তাতে নবী মোহাম্মদ ও আল্লাহকে নিয়ে কোনো আপত্তিকর কথা খুঁজে পাই নি। বুঝলাম ইসলাম উদ্ধারকারীরা না পড়েই লাফালাফি করছেন। কারণ মোছলমানদের কিছু পড়তে হয় না!
স্যাটানিক ভার্সেসে রুশদী কি লিখেছেন? রুশদী ইসলামের স্বর্ণযুগের এবং সর্বকালের গ্রহণযোগ্য দুই বিখ্যাত ইসলামের ইতিহাসবেত্তার বই থেকে তথ্য নিয়ে বইটি লিখেছেন।
তারমধ্যে একজন মহানবীর জীবনীকার আবু আবদুল্লাহ মোহাম্মদ ওমর ইবনে ওয়াকিদ আল আসলামী যিনি আল ওয়াকিদি নামেই বেশি পরিচিত। তার জন্ম ৭৪৭ সালে এবং মারা যান ৮২৩ সালে। ইসলামের স্বর্ণযুগ আব্বাসীয় শাসনামলে খলিফা হারুন অর রশিদ যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় তখন তিনি বিচারক ছিলেন।
আরেকজন আবু জাফর মোহাম্মদ ইবনে জারির ইবনে ইয়াজিদ আল তাবারি। তার জন্ম ৮৩৯ ও মৃত্যু ৯২৩ সালে। ইসলামের ইতিহাসে তিনি অনেক বড় পণ্ডিত ও ইসলামী গবেষক।
রুশদী তাদের বই থেকে তথ্য নিয়ে লিখেছেন—কোরআনের কিছু আয়াত জিব্রাইল ফেরেশতার রুপ ধরে শয়তান নিয়ে এসেছিলো। শয়তান বলেছিলো—মোহাম্মদের অনুসারীরা এখন থেকে দেবতা লাত, উজ্জা ও মানাতের পূজা করতে পারবে। কিন্তু তারা কোনো কিছু না বুঝেই শয়তানের কথায় প্ররোচিত হয়ে ওইসব দেবতার পূজা করে ফেলেছিলো। ইসলামের দুই পণ্ডিতের মতে ওই আয়াতগুলোকে বলা হয় শয়তানের বাণী।
এই কথাগুলো রুশদীর নয়, ইসলামের দুই পণ্ডিতের বই থেকে তিনি নিয়েছেন। এখানে রুশদীর দোষ কোথায়? খোমেনিও বইটি না পড়েই রুশদীকে হত্যা করতে পারলে ৫ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে ইরান যখন তাদের ভুল বুঝতে পারে—তখন খোমেনির আদেশটি প্রত্যাহার করে নেয়।
পরে আরও পড়ি শালিমারস দ্য ক্লাউন, হারুন অ্যান্ড দ্য সি অব স্টোরিজ, লুকা অ্যান্ড দ্য ফায়ার অব লাইফ, দ্য এনচানট্রেস অব ফ্লোরেন্স,
টু ইয়ারস এইট মান্থস, দ্য গোল্ডেন হাউজ, কুইকোট এবং সবশেষে পড়ি ল্যাংগোয়েজেজ অব ট্রুথ।
রুশদীর বই পড়ে আমার মনে হয়েছে তিনি পৃথিবীর অন্যতম একজন সেরা লেখক। তার লেখা পড়ে কোটি কোটি মানুষ সমৃদ্ধ হয়েছেন এবং আগামীতেও হবেন। তাই তার আরও অনেকদিন বেঁচে থাকা প্রয়োজন।
আমি তার সুস্থতার প্রার্থনা করছি।
আর রুশদীর উপর হামলাকারীর প্রতি তীব্র ঘৃণা জানাই।

সাংবাদিক আহমেদ রাজুর ফেসবুক থেকে
https://www.facebook.com/ahmed.razu.583