বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিশ্বনেতা : স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার

জয়ন্ত আচার্য:

কয়েক হাজার বছরের আর্য, দ্রাবিড়, নিশাদ, মোঘল, পাঠান জাতির সংমিশ্রনে গড়ে ওঠা বাঙ্গালী এক সংকর জাতি। তার সংস্কৃতি বিশ্ব সংস্কৃতিই সংমিশ্রন। তবে ইতিহাসের কোন পাকেই বাঙ্গালী কোন জাতি রাষ্ট্র গঠন করতে পারেনি। হাজার বছরের বাঙ্গালীর ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুই প্রথম বাঙ্গালীর জন্য বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করেন। বাঙালির জন্য একটি স্বাধীন দেশের তিনিই প্রথম রূপকার ।

প্রাচীন বাংলা এমনকি মধ্যযুগেও আনেকে এই ভুখন্ডে স্বাধীন রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছিলেন । তারা কেউই বাঙ্গালী ছিলেন না । সেদিক থেকে বঙ্গবন্ধু প্রথম বাঙালি যিনি স্বাধীন বাংলার প্রথম নৃসতি। বাঙালিদের স্বাধীন ভূমি এনে দেওয়ার প্রয়াস ছিল অনেক বাঙালি নেতারই এবং বাঙালিকে ভালোবেসেছিলেন অনেক জননেতাই। মাষ্টারদা সূর্যসেন, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, নেতাজী সুভাষ বসু, এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রমুখের অবদান বাঙালি সমাজে চিরস্মরণীয়। স্মরনীয় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তারা বাঙ্গালী জাগিয়েছে, উজ্জীবীত করেছেন বাঙ্গালী সত্ত্বার বিকাশে ও স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখাতে । কিন্ত বঙ্গবন্ধু হাজার বছরের বাঙ্গালীর সকল মনিষীর চেতনা ধারণ করে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। বাঙ্গালীকে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন একটি রাষ্ট্র দিয়ে গিয়েছেন। বাঙ্গালীর হাজার বছরের সাংস্কৃতির অসাম্প্রদায়িক ধারাকে লালন করে ধর্মনিরপেক্ষ ও উন্নত রাষ্ট্রের রূপরেখা তিনি দিয়ে গিয়েছেন । তাইতো তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী। কার্যত ‘বঙ্গবন্ধু’র সব খেতাবকে ছাড়িয়ে গেছেন এবং তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে আছে বিশ্বময়। বিশ্বের বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলোর মধ্যে স্থান লাভ করেছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। এ ভাষণের অন্য নাম ‘বজ্রকণ্ঠ’। এ কণ্ঠ কাঁপিয়ে দিয়েছিল সমগ্র দুনিয়ার মুক্তিকামী মানুষকেও। তাই বিশ্বের বড় বড় জননেতাকেও ছাড়িয়ে গেছেন বঙ্গবন্ধু। একারনেই বিবিসির বাংলা সার্ভিসের জরিপে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত ঘোষণায় সর্বত্র আনন্দের ঢেউ উঠেছিল।
বঙ্গবন্ধুর স্থান বাংলাদেশ ও বাঙালির ইতিহাসে নির্ধারিত হয়ে আছে। কেউ ইচ্ছে করলেই তাঁকে ইতিহাস থেকে নির্বাসিত করতে পারবে না। মহাত্মা গান্ধীকে বাদ দিয়ে যেমন ভারতের ইতিহাস লেখা যায় না, মাও সেতুংকে বাদ দিয়ে চীনের, হো চি মিনকে বাদ দিয়ে ভিয়েতনামের ইতিহাস লেখা যায় না, জর্জ ওয়াশিংটনকে বাদ দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস লেখা যায় না, তেমনি বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস লেখা যায় না। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যত কাব্য, মহাকাব্য ও অন্যান্য সাহিত্য কিংবা প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও গবেষণা হয়েছে, দুনিয়ার আর কোনো জননেতা সম্পর্কে হয়তো এত রচনা এখনো রচিত হয় নি। তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের মহিমা কেউ ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। তিনি তাই অনন্য, অসাধারণ এক ব্যক্তিত্ব।

কার্যত রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু বাঙ্গালী জাতির জাতীয়তাবাদের চেতনার উন্মেষ ঘটায় । ৫৪ যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে তার প্রতিফলন ঘটে । ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর আয়োজিত এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলার নামকরণ করেন ‘বাংলাদেশ’। তিনি বলেন, “একসময় এদেশের বুক হইতে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে ‘বাংলা’ কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকুও চিরতরে মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইয়াছে। ..একমাত্র ‘বঙ্গোপসাগর’ ছাড়া আর কোন কিছুর নামের সঙ্গে ‘বাংলা’ কথাটির অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই। ..জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি- আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম পূর্ব পাকিস্তানের পরিবর্তে শুধুমাত্র বাংলাদেশ”।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তার দল পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে জয়লাভ করে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩১০টি আসনের মধ্যে ৩০৫টি আসন লাভ করে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী মুজিবের স্বায়ত্বশাসনের নীতির পুরোপুরি বিপক্ষে ছিলো। আওয়ামী লীগের সরকার গঠন ঠেকাতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সংসদের অধিবেশন ডাকা নিয়ে টালবাহানা শুরু করেন। বঙ্গবন্ধু তখনই বুঝে যান যে, পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের দুঃশাসনের অবসান ঘটাতে লড়াইয়ের কোনো বিকল্প নেই।
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এক ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দেন। রেসকোর্সের জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। ঐতিহাসিক এ ভাষণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে শৃংখল মুক্তির আহ্বান জানিয়ে ঘোষণা করেন, “রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ্। ২৫ মার্চ পাকিস্তানী বাহিনীর সারা দেশে চালায় ইতিহাসের জঘন্যকম হত্যাযজ্ঞ । পাকিস্তানী সেনা বাহিনীর হাতে গ্রেফতারের আগে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এ ঘোষণায় তিনি বলেন, এটাই হয়ত আমার শেষ বানী । আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন । বাংলাদেশের জনগণ যে যেখানে আছে এবং তাদের কাছে যা কিছু আছে তা দিয়ে দথলদার সেনাবাহিনীকে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ করার জন্য আমি আহ্বান জানাচ্ছি। বাংলাদেশের মাটি থেকে পাকিস্তানের দখলদার সেনাবাহিনীকে তাড়িয়ে দিয়ে চুড়ান্ত বিজয় লাভ না করা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। জয় বাংলা ।

পাকিস্তানের কারাগার থেকে ৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু ফিরে আসেন তার প্রিয় স্বাধীন দেশে। আনন্দে আত্মহারা লাখ লাখ মানুষ ঢাকা বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান পর্যন্ত তাঁকে স্বতঃস্ফূর্ত সংবর্ধনা জানান। বিকাল পাঁচটায় রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ১০ লাখ লোকের উপস্থিতিতে তিনি ভাষণ দেন। পরের দিন দৈনিক ইত্তেফাক, সংবাদসহ বিভিন্ন পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিয়ে এভাবেই লিখা হয় ‘স্বদেশের মাটি ছুঁয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের নির্মাতা শিশুর মতো আবেগে আকুল হলেন। আনন্দ-বেদনার অশ্রুধারা নামলো তার দু’চোখ বেয়ে। প্রিয় নেতাকে ফিরে পেয়ে সেদিন সাড়ে সাত কোটি বাঙালি আনন্দাশ্রুতে সিক্ত হয়ে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু ধ্বনিতে প্রকম্পিত করে তোলে বাংলার আকাশ বাতাস। জননন্দিত শেখ মুজিব সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দাঁড়িয়ে তাঁর ঐতিহাসিক ধ্রুপদী বক্তৃতায় বলেন, ‘যে মাটিকে আমি এত ভালবাসি, যে মানুষকে আমি এত ভালবাসি, যে জাতিকে আমি এত ভালবাসি, আমি জানতাম না সে বাংলায় আমি যেতে পারবো কি-না। আজ আমি বাংলায় ফিরে এসেছি বাংলার ভাইয়েদের কাছে, মায়েদের কাছে, বোনদের কাছে। বাংলা আমার স্বাধীন, বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।’ সশ্রদ্ধচিত্তে তিনি সবার ত্যাগের কথা স্মরণ করেন, সবাইকে দেশ গড়ার কাজে উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি তার ভাষণে জোরালো কন্ঠে ঘোষণা দেন, আগামীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা কেউ হরণ করতে পারবে না। বাংলাদেশ হবে সমাজতান্ত্রিক গনতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র । এ লক্ষ্য নিয়েই সংবিধান প্রনয়ন করেন তিনি।
বঙ্গবন্ধু তার অন্তবর্তী সংসদকে একটি নতুন সংবিধান রচনার দায়িত্ব দেন এবং বাঙ্গালী “জাতীয়তাবাদ , ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র” মূল ভিত্তি করে সংবিধান রচিত হয় । ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর থেকে নতুন সংবিধান কার্যকর করা হয় ।

তিনি শতাধিক পরিত্যাক্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কোম্পানি রাষ্ট্রীয়করণ করেন এবং ভূমি পূনর্বণ্টনের মাধ্যমে কৃষকদের সাহায্যের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। । মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী প্রায় ১ কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসনের জন্য বড় পদক্ষেপ নেন। এর ফলে অর্থনৈতিক সঙ্কট অবসান হতে শুরু করে । তিনি প্রাথমিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, খাদ্য, স্বাস্থ্য, পানি ও বিদ্যুত সরবরাহ নিশ্চিতকল্পে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহন করেন। ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রণীত বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চ-বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় কৃষি, গ্রামীণ অবকাঠামো ও কুটির শিল্প উন্নয়নে অগ্রাধিকারমূলক সরকারি অর্থ বরাদ্দের নির্দেশ দেন। বঙ্গবন্ধু এদেশের জনগণের রাজনৈতিক স্বাধীনতার সাথে অর্থর্নৈতিক মুক্তির জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গিয়েছেন। ঘোষণা করেছিলেন দ্বিতীয় বিপ্লবের। ক্ষুধা ও দারিদ্র মুক্ত সোনার বাংলা গড়ারই ছিল তার জীবনের মুল লক্ষ্য। কার্যত বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক বৈষম্যহীন উন্নত দেশ বিনির্মানের জন্য নিয়েছিলেন সর্বাত্মক উদ্যোগ। তার রাজনৈতিক দর্শন ছিল, বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক বৈষম্যহীন , ধর্মনিরপেক্ষ অধুনিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা ।

রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে অসাম্প্রদায়িক ও জাতীয়তাবাদী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের সরকার পদ্ধতি নির্ধারণে মনোনিবেশ করেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের প্রথম মুজিবনগরে গঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার-কাঠামো ছিল রাষ্ট্রপতি শাসিত যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার ব্যবস্থায় সংসদীয় গণতান্ত্রিক সরকার। তবে বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সে সময় নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করতেন। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার এক স্থানে উল্লেখ করা হয়, সংবিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট থাকবেন এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রজাতন্ত্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকবেন। ঘোষণায় দুই পদের ক্ষমতার বিষয়ও উল্লেখ ছিল। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের সরকার পদ্ধতি নির্ধারণের বিষয়টি পাকিস্তানের কারাগার থেকে ববঙ্গবন্ধু তাঁর অন্তরে চির লালিত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন এবং দেশের শাসনব্যবস্থাসহ সব উন্নয়ন ও পুনর্গঠনের বিশাল কর্মকান্ড এগিয়ে নেওয়ার কাজে ব্রতী হয়েছিলেন। রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোয় বঙ্গবন্ধু সর্বদাই সংসদীয় গণতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন। তাই মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি করা হলেও স্বাধীন দেশে তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। সংসদীয় সরকার কাঠামোর অধীনে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করে বঙ্গবন্ধু সেই রাষ্ট্রপতির অধীনেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

বঙ্গবন্ধু শুধু বাঙ্গালীর নেতা ছিলেন না, ছিলেন বিশ্ব নেতা । বিশ্ব মানবতার আগ্রদূত। বঙ্গবন্ধুকে গিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে কিউবার প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মহানায়ক ফিদেল কাস্ত্রো

আলজেরিয়াতে আনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎ পেয়ে অবেগে উচ্ছ্বাসিত হয়ে বলেছিলেন, আমি কথনও সামনা সামনি হিমালয় দেখিনি। আমি দেখেছি শেখ মুজিবকে । ব্যাক্তিত্বে ও সাহসে এই মানুষটি যেন হিমালয়সম। ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি ছিলেন বর্ষীয়ান রাজনীতিক প্রণব মুখার্জি। ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দলের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন তিনি। তার এই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এর আগে তিনি ভারতের অর্থ, পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মদিনে তাকে নিয়ে লিখেছেন ভারতের সাবেক এই রাষ্ট্রপতি। পাঠকদের জন্য সেই লেখাটি হুবুহু তুলে ধরা হল:
কালের শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর দূরদৃষ্টি, নেতৃত্ব, মানবিকতা এবং আত্মত্যাগই ‘সোনার বাংলা’ গঠনের স্বপ্নের সৃষ্টি। আজ বাংলাদেশ সেই স্বপ্ন পূরণের পথে অগ্রগামী দেখে যারপরনাই খুশি আমরা। মুজিবুর রহমান সম্পর্কে একটি প্রবন্ধে পড়েছিলাম, হাজার বছরের বাঙালির ইতিহাসে তিনি নক্ষত্রের অক্ষরে রচিত একটি নাম; যা নিজ আলোতেই ভাস্বর হয়ে থাকবে। তিনি এক অসাম্প্রদায়িক আদর্শের প্রবর্তক। যা আজকের দিনে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি তাঁর আত্মজীবনীতেই লিখেছেন, সেই সময়ের প্রধান নেতাদের উল্লেখ করেছিলেন হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের ঐক্যের কথা।
৭৫ এর ১৫ আগষ্ট তাকে হত্যার মাধ্যমে কার্যত ঘাতকেরা তার স্বপ্নকেই হত্যা করতে চেয়েছিল। বাংলাদেশকে বানাতে চেয়েছিল মিনি পাকিস্তান। জাতির জননকের সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর ম্বপ্নের পথ ধরেই এগিয়ে চলছেন। কার্যত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণ আজকের দিনে অন্যতম পাথেয় হওয়া উচিত সব সমাজ নেতাদের কাছে।

বঙ্গবন্ধুর জীবন পর্যালোচনায় দেখা যায়, মূলত তার জীবনটাই বাঙালি জাতির ভাগ্য রচনার এক সুদীর্ঘ অধ্যায়। একটি স্বাধীন ভূমির জন্য বঙ্গবন্ধু অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। বছরের পর বছর তাকে কারাগারে কাটাতে হয়েছে। দেশের প্রতি, দেশের মাটির প্রতি তার ভালোবাসা ছিল বলেই তিনি এটা পেরেছেন। তিনি যে বাঙালির ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন তার প্রমাণ তার জীবনের প্রতিটি ঘটনা পরম্পরার মধ্যেই সুস্পষ্ট। নতুন প্রজন্মকে তার জীবস দর্শনকে সামনে রেখে এগিয়ে যেতে হবে। তার কর্মময় জীবন হোক আমাদের এগিয়ে চলার আলোক বর্তিকা । আজ ১৫ আগষ্ট বাঙ্গালী ইতিহাসে কলঙ্গময় দিন। জাতীয় শোক দিবস। বাঙ্গালীর সর্বকালের সর্বশ্রষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধুর প্রতি রইল শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক
সহ সম্পাদক , আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় সাংসাস্কৃতিক উপ কমিটি।