ভ্রমণকাহিনী, কাজের মাঝে ভ্রমণঃ

তানিয়া সুলতানা হ্যাপি:

ডেল কানের্গীর ভ্রমণ বিষয়ক একটি লেখায় পড়েছিলাম –
কাজ ফেলে ভ্রমণ নয়, কাজের মাঝেই ভ্রমণ করুন। বিখ্যাত লেখকের এই উদ্ধৃতিটি পড়ার পর আমি আমার পুরো ভ্রমণ পরিকল্পনায় পরিবর্তন এনেছিলাম। অনেকটা রথ দেখা কলা বেচার মতো। এবারের সাজেক ট্যুরটি ছিলো ঠিক তেমনি একটি ট্যুর।

১৫ ই জুলাই’২০২২ অপুদি ফোন দিয়ে নেত্রীর কারান্তরীণ দিবসের প্রোগ্রামের কাজের নির্দেশনা দিলেন। একটু পর ফোন দিয়ে তিনি বললেন- হ্যাপি তুমি আমার সাথে খাগড়াছড়ি সম্মেলনে যাবা। তৈরী থেকো। আমরা সেখানে ২৩ -২৬ জুলাই পর্যন্ত থাকবো। ৬-৭ টি শাড়ীসহ লাগেজ গুছিয়ে নিও। আমি বললাম আচ্ছা দিদি।

দিদির সাথে সম্মেলনে যাবো, দিদির কাছাকাছি ৪টা দিন থাকবো এই আনন্দের অনুভূতি ভাষায় অবর্ননীয়। দিদির সাথে কাটানো প্রতিটা মুহুর্ত শিক্ষনীয়। আমার মতো দিদির যেকোন কর্মী-সহযোদ্ধারা এই সুযোগটা আর্শীবাদ হিসেবে মানি।

রাঙামাটি জেলা যুব মহিলা লীগের সম্মেলনে ও দিদি আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। পাহাড় উপত্যকায় ঘেরা সবুজ বেষ্টনী আমার বরাবরই পছন্দের জায়গা। এবারের খাগড়াছড়ি জেলা যুব মহিলা লীগের সম্মেলনে দিদির সাথে আমরা সফরসঙ্গী ছিলাম ১১ জন। ১১ জনের টিমের আমরা সবাই দিদির পূর্ব নির্দেশনা অনুযায়ী হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরে পৌঁছলাম দুপুর ২ টার মধ্যে।

দিদি এসে পৌঁছলে তিনি আমাদের সবাইকে ভিআইপি লাউঞ্জে নিয়ে গেলেন। সেখানে বসে আমরা লেমন টি পান করলাম। খাগড়াছড়িতে আমরা যে কদিন থাকবো, আমরা কিভাবে চলবো দিদি আমাদের সে নির্দেশনা দিলেন। সম্মেলন শেষে আমরা সাজেক বেড়াতে যাবো, অনেক আনন্দ করবো, অনেক মজা করবো সেটি ও বললেন। তখন ঢাকা মহানগর উত্তরের নীলু আপা বললেন- দিদি ওরা তো ( কক্সবাজারের জেলা যুব মহিলা লীগের সম্মেলনে) বেশি মজা করেছে। আমরা কি এতো মজা করতে পারবো? দিদি বললেন – একেক জায়গায় একেক রকমের সৌন্দর্য রয়েছে। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের এই বাংলাদেশ। তাই টেনশনের কোন কারন নেই সাজেকে ও আমরা অনেক মজা করবো, মেঘের ভেলায় ভাসবো, তুলোর মতো মেঘকে চোখের সামনে উড়তে দেখবো। খুব মজা করবো। তারপর দিদি বললেন গ্রুপ ছবি তুলো, সম্মেলনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিচ্ছি ফেইসবুকে পোস্ট দাও।

৩ঃ১৫ মিনিটের চট্টগ্রাম গামী বাংলাদেশ বিমানে আমরা রওয়ানা হলাম খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে। প্রায় ৪০ মিনিটের ফ্লাইট শেষে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে পৌঁছলে চট্টগ্রাম জেলা যুব মহিলা লীগের আহবায়ক সাইরা রশ্মি আপা অসংখ্য নেতা-কর্মীদের নিয়ে বাংলার নারী সমাজের অহংকার, বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগের সংগ্রামী সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক অপু উকিল দিদিকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।

চট্টগ্রাম যুব মহিলা লীগের নেতাকর্মীদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে চট্টগ্রাম থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের কূল ঘেষে। পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত আমি আগেও দেখেছি কয়েকবার । সাগর পাড়ের বালুকা রাশি, বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ মন ভরিয়ে দেয় মুহুর্তেই। সৈকত জুড়ে চার কোণ বিশিষ্ট কংক্রিটের ব্লকগুলো দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। এতে সৈকতের সৌন্দর্য আরো বেড়েছে বহুগুণে।

ঢাকায় যেখানে বিগত কয়েকদিনের তাপদাহে ছিলাম অতিষ্ঠ সেখানে চট্টগ্রাম পৌঁছার সাথে সাথেই গুড়িগুড়ি বৃষ্টির কারনে ঠান্ডা আবহাওয়া মনে প্রাণে নিমিষেই প্রশান্তি এনে দিলো। প্রায় আড়াই -তিন ঘন্টার জার্নিতে টাইম সেইভ করতে গাড়ীতেই ছিলো দুপুরের খাবার। খাবার শেষে ধরলাম গান। গানের কলি কলি খেলা। উপলব্ধি করেছি এই পর্বটিতে বরাবরই আমার মতো সবাই খুব মজা পায় । কারন সবার সাথে গান গাইলে সুর- লয় তালের মিল না থাকলে ও ঠোঁট মিলালেও শিল্পী শিল্পী একটা ভাব নেয়া যায়।

এরিমাঝে সূর্য ডুবে গেলো। শান্ত -নিবিড় পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে আমরা চললাম গন্তব্যে। দীর্ঘ জার্নিকে আরামদায়ক ও স্বস্তিময় করার জন্য দিদি আমাদের কে দু’টি গাড়ীতে ভাগ করে দিয়েছিলেন। আমরা অবশ্য প্রতি মুহুর্তেই দিদিকে মিস করছিলাম। গাড়ীতে হাল্কা ঘুম থেকে জেগে নীলু আপা বললেন – নারে আমার ভালো লাগছে না। আমি থাকবো দিদির কাছাকাছি সেজন্যই তো আসছি। দিদির গাড়িতে আমাকে নেয়নি, আমার ভালো লাগছে না। ঠিক সে মুহুর্তেই দিদি আমাদের শামসুন্নাহার রত্না আপাকে ফোন দিয়ে গাড়ী থামানোর নির্দেশনা দিলেন। গাড়ী থামিয়ে দিদি বললেন – তোমরা সবাই আমার গাড়ীতে উঠো। তোমাদের ছাড়া গাড়ীটা খালি খালি লাগছে। আনন্দ করতে পারছি না । লাইভ দিতে পারছি না। তখন আমরা সবাই খুশিতে আধখানা হয়ে উঠলাম। নীলু আপা একটু বেশি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলো সে বলার সাথে সাথেই আল্লাহ তার মনের আশা পূরণ করায়। দিদিকে সে কথা বলে ধন্যবাদ জানালেন।

দিদি বললেন এখনো ঘন্টা দেড়েক লাগবে পৌঁছতে। হাল্কা চা নাস্তা করে নেই।। তারপর বললেন চলো এবার সবাই মিলে গান গাই। আমাদের সবার ইনবক্সে “হাওয়া” সিনেমার গান “সাদা সাদা, কালা কালা” গানটির লিরিক পাঠালেন। লিরিক মুখস্ত করতে বললেন সবাইকে। শামসুন্নাহার রত্না আপাকে নির্দেশনা দিলেন আমাদের সবাইকে রিহার্সাল করাতে। আমরা এই গানটি ৬ বারে কাছাকাছি ধরতে পেরেছি। তারপর দিদি লাইভ দিলেন।
আর আমরা গাইলাম—

তুমি বন্ধু কালা পাখি
আমি যেন কি ?
বসন্ত কালে তোমায়
বলতে পারিনি।

সাদা সাদা কালা কালা
রং জমেছে সাদা কালা,
সাদা সাদা কালা কালা
রং জমেছে সাদা কালা।

হইছি আমি মন পাগলা
বসন্ত কালে ..
তুমি বন্ধু কালা পাখি
আমি যেন কি ?

বসন্ত কালে তোমায়
বলতে পারিনি।
বসন্ত কালে তোমায়
বলতে পারিনি।

পিরিত ভালা গলার মালা
বললে কি আর হয়,
যারে ভালো লাগে আমার
দেখলে তারে চোখে নেশা হয়
রে বন্ধু চোখে নেশা হয়।

সাদা সাদা কালা কালা
রঙ জমেছে সাদা কালা,
সাদা সাদা কালা কালা
রঙ জমেছে সাদা কালা।

হইছি আমি মন পাগলা
বসন্ত কালে ..
তুমি বন্ধু কালা পাখি
আমি যেন কি ?

বসন্ত কালে তোমায়
বলতে পারিনি,
বসন্ত কালে তোমায়
বলতে পারিনি ..

বসন্ত কালে তোমায়
বলতে পারিনি,
বসন্ত কালে তোমায়
বলতে পারিনি ..

গান গাইতে গাইতে ততক্ষণে আমরা পৌঁছে গেছি খাগড়াছড়ির “খাস্রাং হিল রিসোর্ট -১”। সেখানে পৌঁছে দেখি যুব মহিলা লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ ও জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগের সংগ্রামী সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক অপু উকিল দিদিকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে রিসিভ করার জন্য অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে অপেক্ষা করছে।

দিদিকে বরণ করার পর শুরু হয় পরিচিতি পর্ব। আমাদের সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিতে অপুদি সংরক্ষিত আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগের সহ- সভাপতি আদিবা আনজুম মিতা আপাকে নির্দেশনা দেন। মিতা আপা আমাদের সবাইকে সাংগঠনিক পরিচয়ে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমার জন্য বাড়তি পাওনা বা ভালো লাগার বিষয় আমার নামের সাথে কবি বিশেষণটি যোগ করেছেন। এতে আমি ভীষণ অভিভূত হয়েছি। রাত জেগে লেখালেখির সার্থকতা এখানেই।

আর খাগড়াছড়ি জেলার নারী নেতৃবৃন্দদের পরিচয় করিয়ে দিলেন খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক শতরুপা ত্রিপুরা দিদি। তারপর শতরুপা দিদি বললেন- অপুদি আপনারা লং জার্নি করে এসেছেন তাই আমাদের জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বাবু কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা এমপি মহোদয় বলেছেন- তোমরা তোমাদের নেত্রীকে আগে রিসিভ করো, হাল্কা রেস্ট করতে দাও তারপর তিনি আসবেন আপনাদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে। এতোক্ষণ তিনি পাশে থেকেই সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তারপর স্হানীয় নেতৃবৃন্দসহ তিনি এলেন অপুদির সাথে স্বাগত শুভেচ্ছা জানাতে।

কিভাবে সম্মেলন পর্বটি পরিচালিত হবে তা নিয়ে সাংগঠনিক মিটিং হলো। মিটিং শেষে আমরা রাতের ডিনারে বসলাম পাশের সুসজ্জিত ডাইনিংয়ে। মুখরোচক ও মজাদার সব খাবারের সাথে ব্যাম্ব চিকেনের স্বাদ ছিলো অতুলনীয়। ডিনার শেষে আমরা গেলাম পূর্ব নির্ধারিত গ্রীণ হোটেলে। দিদি আমাদের প্রতি দুজনকে একটি রুমে থাকার ব্যবস্হা করে দিলেন। তখন রাত সাড়ে বারোটা।

ফজরের আযানের আগে অথবা কাছাকাছি সময়ে আমার ঘুম থেকে উঠার অভ্যেস দীর্ঘদিনের। এলার্ম দেয়া লাগে না। যেহেতু অপরিচিত জায়গা এবং সারাদিন জার্নিতে ছিলাম তাই চার’টায় এলার্ম সেট করে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম থেকে জেগে ওঠে আযান শোনার অপেক্ষা করছিলাম। ফজরের আযান শুনতে আমার খুব ভালো লাগে। কিন্ত ৪ঃ৪৫ মিনিটেও আযান শুনতে না পেয়ে বুঝতে পারলাম এটি আমার বাসা নয়। চারিদিক থেকে আযানের সুমধুর ধ্বনি শোনা যাবে না! তাই নামাজ আদায় করে নিলাম।

সকালের নাস্তা সেরে আমরা সম্মেলনের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। সম্মেলনের শুরুতে জাতীয় সংগীত বাজানো হয়, তারপর জাতীয় পতাকা,দলীয় পতাকা এবং শান্তির প্রতীক পায়রা উড়ায়ে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতা উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগের সংগ্রামী সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক অপু উকিল দিদি। তারপর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।

বিউটি ত্রিপুরার সভাপতিত্বে সম্মেলনের শুরুতেই পবিত্র কুরআন পাঠ, গীতা পাঠ ও ত্রিপিটক পাঠ করা হয়। তারপর সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ফারজানা আজম সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন। প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগের সংগ্রামী সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক অপু উকিল দিদি। সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বাবু কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা এমপি, এছাড়াও উপস্হিত ছিলেন- খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি কল্যাণ মিত্র বড়ুয়া, সাধারণ সম্পাদক নির্মলেন্দু চৌধুরী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শতরুপা ত্রিপুরা, মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ত্রুুইসায়ো চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক শাহিনা আক্তার, খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুই চিং থুই মারমা, রাঙামাটি জেলা যুব মহিলা লীগের সংগ্রামী সভাপতি রোকেয়া আক্তার সহ খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন উপজেলা, ইউনিয়নের অসংখ্য নারী নেতাকর্মীবৃন্দ।

সম্মেলনের প্রথম অধিবেশন শেষে দ্বিতীয় অধিবেশনে শুরু হয় নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়া। এতে বিউটি ত্রিপুরাকে সভাপতি ও বিলকিস আক্তারকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়। নবনির্বাচিত কমিটি বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগের সংগ্রামী সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক অপু উকিল দিদিকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। এবং দিদির দোয়া ও আশীর্বাদ নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে আমৃত্যু কাজ করে যাওয়ার শপথ নেন।

মধ্যাহ্ন ভোজন শেষে আমরা রওয়ানা হলাম সাজেক ভ্যালির উদ্দেশ্যে। গুগল ঘেঁটে জানলাম সাজেক সমতল থেকে ১৮০০ ফুট উঁচুতে। চিটাগাং হতে ১১৪ কি.মি. খাগড়াছড়ি, সেখান থেকে প্রায় ৭০ কি.মি.দূরে সাজেক রাংগামাটি জেলায় অবস্থিত । পাহাড়ি উচু নিচু রাস্তা, আঁকাবাঁকা শেষ তিন কি.মি. রাস্তা সোজা ৪৫ ডিগ্রি হয়ে উঠে গেছে। সেই সাথে বিপজ্জনক বাঁক। তবে রাস্তা ভাল।

অনেক আগে থেকেই পাহাড় তার বিশালতা নিয়ে মানুষ কে আকর্ষন করে আসছে। এই বিশাল সৃষ্টির পাশে মানুষ বারে বারে ছুটে যেতে চায়, এর সৌন্দর্যের অংশ হতে চায়, অল্প সময়ের জন্য হলেও। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের অপরুপ মনোমুগ্ধকর দৃশ্য আর সেনাবাহিনীর কঠোর নিরাপত্তায় ঘেরা সাজেক ভ্যালিতে বেড়াতে যাওয়া মানুষের অন্যতম শখ।

সাজেকের আদিগন্ত উচু নিচু পাহাড়, থরে থরে সাজানো, চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে অনন্ত কাল ধরে যা খুব সহজে মানুষকে আর্কষণ করে থাকে। আর মেঘেরা লুকোচুরি খেলে এরই ফাঁকে ফাঁকে। কখনো রোদ, কখনো বৃষ্টি। এই আছে এই নেই। এক পলকে গুচ্ছ মেঘ এসে ঢেকে দেয় সবকিছু। কাছের কিছুই দেখা যায় না। ভিজিয়ে দিয়ে হারিয়ে যায়। এমন নির্মল সবুজের সমারোহ অভিভূত হয়ে তাই হয়তো সৈয়দ মুজতবা আলীর বলেছেন- “এক নিশ্বাস নিলে আয়ু বেড়ে যায় দশ বছর, আর নিশ্বাস ছাড়লে হাজারটা অসুখ বের হয়ে যায়।”

আর আমি বলি আমার সহযাত্রীদের তোমরা গান গাও। আমি গানের কলি খেলবো না, আমি শুধু পাহাড়ের ভিউ দেখবো। স্তরে স্তরে সাজানো আকাশ দেখবো। সবুজ অরণ্য দেখবো। প্রাণ ভরে মুক্ত বাতাসে নিশ্বাস নিবো। অফুরন্ত প্রাণশক্তি নিবো প্রতি নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে। বিখ্যাত কবি সাহিত্যিকদের মতো আমিও লেখালেখির উপকরণ খুঁজে নিবো।

এরিমধ্যে পৌঁছে গেছি সাজেকে। মেঘের ঘর রিসোর্ট, পেদা টিংটিং রেস্টুরেন্ট, সেনাবাহিনী পরিচালিত রুনময় পেরিয়ে আমরা এসে পৌঁছেছি খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বাবু কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা এমপি মহোদয়ের “খাস্রাং হিল রিসোর্ট ২” এ। যেখানে আমরা রাত্রি যাপন করবো। এসো সুন্দর এই রিসোর্ট দেখেই ভীষণ খুশী হলাম। আসলেই “খাস্রাং হিল রিসোর্ট -২” অনেক সুন্দর। আমরা সাথে সাথেই ভিডিও করে, ছবি তুলে পোস্ট দিয়েছি। মাননীয় এমপি মহোদয় কতোটা নান্দনিক মনের মানুষ তা এই রিসোর্টটি দেখেই বুঝেছি।

তারপর চায়ের আড্ডা শুরু হলো। আড্ডা শেষে রিসোর্ট ম্যানেজার ও শতরুপা ত্রিপুরা দিদিসহ খাগড়াছড়ি জেলা যুব মহিলা লীগ ও মহিলা আওয়ামী লীগের টিম আমাদের ব্রিফ করলেন – রিসোর্ট থেকে আমরা কিভাবে সাজেকের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবো, কিভাবে সূর্যোদয়- সূর্যাস্ত দেখতে পারবো ইত্যাদি ইত্যাদি। রাতের ডিনার শেষে দিদি আমাদের রুম বুঝিয়ে দিলেন। আমি যে রুমটি বরাদ্দ পেলাম সে রুমের নাম ছিলো ‘জোৎস্না বিলাস’। ভীষণ পছন্দ হলো রুমের নামটি। আমার রুমমেটের নাম ছিলো রুমা। আর রুমাদের অর্থাৎ আমাদের রুমটি ছিলো অনেক সুন্দর। কিন্তু আমরা যে সময়টাতে সাজেক বেড়াতে এসেছি তখন চলছে ঘোর অমাবস্যা আর টেপাটেপা বৃষ্টি। তবে রুম থেকে জোৎস্না উপভোগ করতে পারলে আরো বেশ লাগতো।

সুন্দর সকালে সূর্যোদয় দেখার অপেক্ষায় ঘুমাতো গেলাম। কথা ছিলো মিতা আপার নেতৃত্বে আমরা সবাই মিলে একসাথে সূর্যোদয় দেখবো। কিন্তু ভোর সাড়ে টায় উনার নাম্বার এনগেজড থাকায় তা সম্ভব হয়নি। সাজেকে এসে একসাথে সূর্যোদয় দেখা হলো না! তবে সুন্দর এই রিসোর্ট থেকে সাজেকের সকাল দেখা মিস করতে চাইলাম না। তাই রুম থেকে বের হয়ে রিসোর্টের উপরে ওঠে দেখি নার্গিছ মাহতাব ভাবী ও নীলু আপা ছাতা মাথায় দিয়ে টিংটিং করে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর ছবি তুলছে। আমি আর রুমা আপাও তাদের সাথে যোগ দিলাম।

তুলার মতো মেঘমালা, চারদিকে সারি সারি সবুজ পাহাড়। সবুজের রাজ্যে এ যেন সাদা মেঘের হ্রদ! যেখানে পাহাড়ের উপরে সাদা সাদা মেঘ উড়ে উড়ে খেলা করে। একটু দূরে তাকালেই ঘন কুয়াশায় ঘেরা, আবার এগিয়ে যেতেই বৃষ্টিতে ভিজে যাই। উপত্যকা পেরিয়ে ক্রমশ পাহাড়ের ভাঁজ যেন আকাশচুম্বী হয়েছে ওখানে। আর এই দীর্ঘ উপত্যকা জুড়ে আরণ্যের সীমানা। কী অপূর্ব সৃষ্টি বিধাতার!

আদিবাসীদের বুননে ম্যাচিং ম্যাচিং শাড়ী পড়ে আমরা সবাই একত্রিত হলাম নাস্তার টেবিলে। নাস্তা সেরে আমরা “খাস্রাং হিল রিসোর্ট-২” এ গ্রুপ ছবি তুললাম। তখন শামসুন্নাহার রত্না আপা বললেন- দিদি আমাকে এই সুন্দর গলার মালাটা আমাদের হ্যাপি পরিয়ে দিয়েছে। তখন দিদি বললেন -আমারটা কই? আমি বললাম দিদি আমি এখানে এসে কিনি নি। আমার কাছে আরো কাছে। পুরো বক্স ধরে বাসা থেকে নিয়ে এসেছি। দিদি বললেন আমার জন্য নিয়ে এসো। দিদি পরলেন সাদা পালের মালাটি। অরেঞ্জ শাড়ীর সাথে এই মালাটি পরায় দিদিকে চমৎকার লাগছিলো। প্রায় সবার গলায় মালা হয়ে গেলো। বৃষ্টি ফোঁটা যেন আমাদের গায়ে না লাগে সেজন্য দিদি আমাদের সবার জন্য ছাতার ব্যবস্হা করলেন।

তারপর আমরা ঐতিহ্যবাহী লুসাই গ্রামে বেড়াতে গেলাম। লুসাই গ্রামে পৌঁছলে দায়িত্ব প্রাপ্ত সিকিউরিটি গার্ড অপুদিকে চিনতে পেরে এগিয়ে এলেন কুশল বিনিময় করতে। গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়লো সততার একটি দোকান। এই দোকানে পণ্যের গায়ে মূল্য লেখা আছে। ক্রেতারা মূল্য পরিশোধ করে পণ্য নিয়ে যায় । জেনেছি নৈতিকতার শিক্ষা দিতেই এই দোকানটি পরিচালিত হয়।

পূর্বেই আমাদের জন্য লুসাই ড্রেসের অর্ডার করা ছিলো। আমরা লুসাই ড্রেস পরে আদিবাসীদের সাথে একাত্ম হওয়ার চেষ্টা করছিলাম। তাদের মতো করে নেচে, গান গেয়ে। কনসার্ট স্পষ্টে আমরা অবশ্য ম্যাচিং ম্যাচিং শাড়ীতে ছাতা মাথায় দিয়ে “হাওয়া” সিনেমার “সাদা সাদা,কালা কালা” গানটি আবার গেয়েছিলাম।

এবং আদিবাসীদের সুন্দর এই গানটি গাইলাম চামেলি ত্রিপুরার নৃত্যের তালে তালে । যা ভিডিও করার দায়িত্বে ছিল আমাদের সবার প্রিয় সাংবাদিক শ্যাম কুবি।
গানটি—

উত্তন পেগে মেঘে মেঘে
মেঘুলো দেবা তলে
মপারানান যেদ মাগে
তারা লগে লগে
উত্তন পেগে মেঘে মেঘে
মেঘুলো দেবা তলে
মপারানান যেদ মাগে
তারা লগে লগে
উত্তন পেগে মেঘে মেঘে।।
চেরো হিত্ত্যে নানান পেগে
উরি উরি গীদ গাদন
সেই গিদন্দি মন ভুলিনেই
ফুল ফুদি যাদন
চেরো হিত্ত্যে নানান পেগে
উরি উরি গীদ গাদন
সেই গিদন্দি মন ভুলিনেই
ফুল ফুদি যাদন
গেদুং চেলে গেনপারং
তারা দগে দগে
গেদুং চেলে গেনপারং
তারা দগে দগে
মপরানান যেদ মাগে
তারা লগে লগে
উত্তন পেগে মেঘে মেঘে
মেঘুলো দেবা তলে
মপারানান যেদ মাগে
তারা লগে লগে
উত্তন পেগে মেঘে মেঘে।।
এই দেশ মুরই মুরই
গাজ বাজ তারুম্বর
চাল চিলিয়ে দক্ক্যা গড়ি
চাদে লাগে গম
এই দেশ মুরই মুরই
গাজ বাজ তারুম্বর
চাল চিলিয়ে দক্ক্যা গড়ি
চাদে লাগে গম
জারত সমি এগা মনে
গাই গাই গরি বেরেলে
জারত সমি এগা মনে
গাই গাই গরি বেরেলে
মপারানান যেদ মাগে
তারা লগে লগে
উত্তন পেগে মেঘে মেঘে
মেঘুলো দেবা তলে
মপারানান যেদ মাগে
তারা লগে লগে।।

সাজেকের হেলিপ্যাড থেকে দেখেছি তপ্ত দুপুরে রৌদ্রস্নাত ঝলমলে নীলাকাশ কেমন করে উড়ে বেলায়। আমার মনে হয়েছে আমি-তুমি, তুমি-আমি মিলে আকাশ দেখার চেয়ে আমরা সবাই মিলে আকাশ দেখা অনেক মজার, অনেক আনন্দের । আমরা একসাথে বাঁশের কাপে চা খেয়েছি। একসাথে লিচি জুস খেতে খেতে আড্ডা দিয়েছি।

তারপর সাজেককে টাটা বাই বাই জানিয়ে আমরা রওয়ানা হলাম খাগড়াছড়ি উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে আমরা খেলাম দুধের তৈরি দীঘিনালার ভাপাপিঠা মিষ্টি। এতো সুস্বাদু ছিলো মিষ্টিটি প্রত্যেকে অন্তত দুটো করে খেয়েছি।

সেদিন মাননীয় এমপি মহোদয়ের আয়োজনে “খাস্রাং হিল রিসোর্ট -১” আমাদের লাঞ্চের আয়োজন ছিলো। লাঞ্চ সেরে আমরা রেস্ট রুমে বসলাম। তখন জেলা প্রশাসনের চেয়ারম্যান মহোদয় এলেন দিদির সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে। এবং তিনি আমাদের সবার জন্য সাজেকের “খাস্রাং হিল রিসোর্টে-২” যে গ্রুপ ছবিটি তুলে ছিলাম সেটি বাঁধাই করে উপহার দেন। দিদির সাথে আরো সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এসেছেন খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামী লীগের সম্মানিত সদস্য এডভোকেট হিরু সাহেব । যার পৈতৃক নিবাস নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় । যে আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক বাবু অসীম কুমার উকিল দাদা। যিনি অপুদির স্বামী।

বিকেলে মায়াবিনী লেকে ঘুরতে যাবো। তখন খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা এমপি মহোদয় আমাদের সবাইকে আদিবাসী থামি ড্রেস উপহার দিলেন। আমরা সে থামি ড্রেস পরে মায়াবিনী লেকে কায়াকিং করতে গেলাম। সন্ধ্যা নেমে এলে আমাদের শামসুন্নাহার রত্না আপা বললেন- দিদি আমরা কি এখনি নামবো? দিদি সাথে সাথে বললেন – না, তোমরা আরো মজা করো, আনন্দ করো, গান গাও, ভিডিও করো, লাইভ দাও। আর তাতেই যেন আমরা
সবাই আরো বেশি খুশিতে উদ্বলিত হয়ে উঠলাম।

কায়াকিং শেষে দিদি আমাদের সবাইকে শপিং করার সময় দিলেন। আমরা যে যার প্রয়োজন মতো শপিং করলাম। আমি অবশ্য বার্মিজ আচারই বেশি কিনেছি।
বাকী সবাই বাচ্চাদের ড্রেস, শাড়ী আচার সবই কিনেছেন।

শপিং শেষে আমরা আবার গ্রীণ হোটেলে এসে দেখি খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা অপেক্ষা করছেন দিদি সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করার জন্য। কেউ কেউ ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, কেউবা ক্রেস্ট, সন্মাননা স্মারক তুলে দিলেন দিদির হাতে।

খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামী লীগের সম্মানিত সদস্য এডভোকেট হিরু সাহেবের আমন্ত্রণে আমরা ডিনারে অংশ নিলাম। উনার মাধ্যমে জানতে পারলাম খাগড়াছড়িতে নেত্রকোনার প্রায় ৬০০ জনগোষ্ঠী বসবাস করে। দিদি খাগড়াছড়ি যাওয়ায় তারা খুবই উচ্ছ্বসিত। সবসময়ই দিদিকে টকশোতে, টেলিভিশনে দেখেন। এবার বাস্তবে দেখার সুযোগ নিতে তারাও সকালে আসবেন দিদির সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে। এটাই মা, মাটির প্রতি ভালোবাসা। এটাই বলে সম্মানি ব্যক্তির মর্যাদা। দিদি ও তাদের প্রতি ভালোবাসা জানিয়ে বলেছেন পরবর্তীতে সময় সুযোগ করে উনার স্বামীকে নিয়ে তাদের সবার
সাথে সাক্ষাৎ করতে আসবেন।

ডিনার শেষে রুমে পৌঁছতে প্রায় বারোটা। সুন্দর সকালে ফজরের ভোরে ঘুম থেকে উঠবো বলে ঘুমাতে গেলাম। ফজরের নামাজ আদায় করার পর সাধারণত পাখিদের খাবার দেই। কিন্তু আমি খাগড়াছড়তি থাকায় সেটা সম্ভব নয়। যদিও পর্যাপ্ত খাবার ছিটিয়ে গিয়েছিলাম যাতে আমি আসার আগ পর্যন্ত খেতে পারে। যখনই মনে হলো হয়তো তাদের খাবার শেষ হয়ে গেছে, তারা এসে খাবার না পেয়ে ফিরে যাচ্ছে ঠিক তখনই একটি চড়ুই বারান্দায় এসে স্বশব্দে আওয়াজ দিলো। আর তাতেই আমার মন প্রাণ জুড়ে কেমন যেন একটা অনুভূত হলো! ওরা কি সত্যি আমার অব্যক্ত কথা বুঝে? না হয় কি করে এটা সম্ভব হয় একই সময়ে। এর আগে বান্দরবানের লামাতে একই ঘটনা ঘটেছিলো।

প্রায় রেডি হয়েছি নীচে নামবো নাস্তা করতে। তখনই রুমে এলেন খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুই চিং থুই মারমা। খুবই সুন্দর এবং পরিপাটি মানুষটিকে গাড়ী থেকে নেমে প্রথমেই চোখে পড়েছিলো আমার । একই কথা তিনিও আমাকে বললেন – আমার মাঝে কি যেন একটা আছে, আসার পরেই উনার এটা মনে হয়েছে। আমি নাকি something special. আমি বললাম – আমি জানি না। তবে আমি ও তাকে একই কথা বললাম – আপনার মাঝে specially কিছু আছে সেটা কি যেন! তিনি বললেন – তিনি ও তা জানেন না। তবে আমরা দুজনেই রাজনীতির বাইরে
Quantum সদস্য । এটা একটা কারন হতে পারে। দুজনেই দুজনের সাফল্য কামনা করলাম। যোগাযোগ রাখার প্রতিশ্রুতি দিলাম।

নাস্তা সেরে যখন রওয়ানা হবো তখন হোটেলের রিসিপশনে উপস্থিত হয়েছে অসংখ্য নেতাকর্মীবৃন্দ।
দিদির নেত্রকোনার মানুষসহ খাগড়াছড়ির রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা এসেছেন দিদিকে বিদায়ী শুভেচ্ছা জানাতে।

পথিমধ্যে আমরা দেখলাম আলু টিলা গুহা। অনেকগুলো সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামতে হয়েছে। আমরা ১১ জন সহ খাগড়াছড়ি জেলা যুব মহিলা লীগের নবনির্বাচিত সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ মহিলা আওয়ামী লীগ, ও আওয়ামী লীগের নারী নেতৃবৃন্দসহ প্রায় ২৫ জন মিলে আলু টিলা গুহা দেখতে নামার সময় খাগড়াছড়ির বোনেরা গাইলো আলপনা চাকমার এই গানটি—–

আমা দেচ্ছান মুরোমুরি গাঙে ছরায় ভরা
আমা দেচ্ছান সাগর মানজ্যর
সাগর আজায় গড়া।
আমা দেচ্ছান হীরে মানেক
সোনায় রুবোয় ভরা ।।

নানান্ জাদর মানেই আঘন
নানান্ ভাঝায় মা দাগন।
নানান্ ধগে দিন হাদে যান তারা ।।

বেন্যা অ্লে বেল্’ পহরে
সোনার আজি ঝরে
রেত্তু এলে জুন্’ পহরে
মেয়্যায় বুক ভরে ।।

ওলি ওলি ওলি বাঝক পাদা ঝুলি
সোনা চিজি ঘুমান যাই দুলনানত পোরি
আয় আয় চাঁন,আয় আয় তারা
লক্ষি মাবো ওলি ডাগি পোবো,
ঘুম নেয়্যে ।।

এঝান দেচ্ছান হোন হিত্ত্যে
আর-দ ন দেবে
এঝান দেচ্ছান হন হিত্ত্যে
তোগেই নপেবে
এ দেচ্চান মর দ্বি-চোঘত
দোলর বেগর সেরা ।।

লিরিক-আমা দেচ্ছান মুরোমুরি
কথা – সুগত চাকমা
সুর – রনজিত দেওয়ান
কন্ঠ – আলপনা চাকমা

আর আমরা সবাই মিলে গাইলাম–
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের এই গানটি —-

ধনধান্য পুষ্প ভরা
আমাদের এই বসুন্ধরা
তাহার মাঝে আছে যে এক
সকল দেশের সেরা…
আ…
তাহার মাঝে আছে যে এক(আ… আ…)
সকল দেশের সেরা(আ… আ…)
সে যে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে দেশ(আ… আ…)
স্মৃতি দিয়ে ঘেরা(আ… আ…)
এমন দেশটি কোথাও খুঁজে
পাবে নাকো তুমি
সকল দেশের রাণী সে যে
আমার জন্মভূমি
সে যে আমার জন্মভূমি
সে যে আমার জন্মভূমি…
ভায়ের মায়ের এত স্নেহ
কোথায় গেলে পাবে কেহ
ভায়ের মায়ের এত স্নেহ
কোথায় গেলে পাবে কেহ
ওমা তোমার চরণ দুটি
বক্ষে আমার ধরি…
ওমা তোমার চরণ দুটি
বক্ষে আমার ধরি
আমার এই দেশেতে জন্ম যেন
এই দেশেতে মরি
সে যে আমার জন্মভূমি…
পুষ্পে পুষ্পে ভরা শাখি
কুঞ্জে কুঞ্জে গাহে পাখি
পুষ্পে পুষ্পে ভরা শাখি
কুঞ্জে কুঞ্জে গাহে পাখি
গুঞ্জরিয়া আসে অলি
পুঞ্জে পুঞ্জে ধেয়ে
(পুঞ্জে পুঞ্জে ধেয়ে)
আ…
গুঞ্জরিয়া আসে অলি
পুঞ্জে পুঞ্জে ধেয়ে
তারা ফুলের ওপর ঘুমিয়ে পড়ে
ফুলের মধু খেয়ে
এমন দেশটি কোথাও খুঁজে
পাবে নাকো তুমি
সকল দেশের রাণী সে যে
আমার জন্মভূমি
সে যে আমার জন্মভূমি
সে যে আমার জন্মভূমি

আলু টিলা গুহা দেখা শেষে খাগড়াছড়ি জেলার সকল নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা চললাম চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে সেনাবাহিনী পরিচালিত cafe splac রেস্তোরাঁয় যাত্রা বিরতি করে বন-মিষ্টি- দধি খেলাম। তখন সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা দিদিকে চিনতে পেরে কুশল বিনিময় করতে এলেন। বললেন তিনিও ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ করতে। তার বাড়ি ময়মনসিংহের গৌরীপুরে।

চট্টগ্রামের বোট ক্লাবে আমরা লাঞ্চ করলাম। সেখানে চট্টগ্রাম যুব মহিলা লীগের আহবায়ক রশ্নি আপা বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আয়োজন করেন। দিদি প্রধান অতিথি হিসেবে উক্ত কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। কর্মসূচি
শেষে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে দিদিকে বিদায়ী শুভেচ্ছা জানান চট্টগ্রাম যুব মহিলা লীগ ।

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছলে আমাদের যাত্রা শেষ হয়। আমরা এখান থেকে আলাদা হয়ে যে যার বাসায় যাবো। এমন চমৎকার, আনন্দময় ও মজার সম্মেলনে আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য সবাই দিদিকে কৃতজ্ঞতা জানালাম।৷ ভুলক্রটির জন্য ক্ষমা চাইলাম। দিদি একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বললেন – তোমরা প্রত্যেকেই খুব ভালো সেজন্যই তো তোমাদের নিয়ে গেছি। সংগঠনের কাজ ভালো ভাবে করলে আবারো অন্য কোথাও নিয়ে যাবো। বাসায় পৌঁছে মেসেজ দিও।

খাগড়াছড়ি জেলা যুব মহিলা লীগের সম্মেলন এবং সম্মেলন পরবর্তী ভ্রমণ শেষে আমার মনে হয়েছে প্রকৃতি অপার সৌন্দর্যের মতো খাগড়াছড়ি এলাকার মানুষের মন ও সত্যিই খুব উদার। খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বাবু কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা এমপি মহোদয়ের আমন্ত্রণে এতো আতিথেয়তা, সম্মান ভালোবাসা পেয়েছি যা চিরদিন স্মৃতি হয়ে থাকবে।

আর দীর্ঘদিন দিদির যতো কাছাকাছি থাকার সুযোগ পেয়ে উপলব্ধি করেছি সংগঠনের মঙ্গলার্থে আমাদের ভুলত্রুটি শোধবার জন্য দিদি যখন আমাদের কঠোর শাসন করেন তখন কখনো কখনো মনে হয় মোটেও ভালোবাসেন না মোদের, আবার যখন ভালোবাসেন, বিপদে – আপদে ঢাল হয়ে পাশে দাঁড়ান তখন মনে হয় দিদির চেয়ে আপন কেহ নাই ভবে।

লেখকঃ রাজনীতিক ও কবি
তানিয়া সুলতানা হ্যাপি
সহ- তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক
বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগ
সাবেক সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ
কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ
সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক
ইডেন কলেজ ছাত্রলীগ।