সংকটের দিনগুলোতে আমাদের পথচলা

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. বায়েজিদ সরোয়ার, এনডিসি (অব.):

বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে একের পর এক সংকটের মুখোমুখি। এর মধ্যেও বিশাল দুটি অর্জন ছিল, পদ্মা সেতু উদ্বোধন ও রপ্তানি আয় ৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া। তবে গত ৪ জুলাই থেকে বাংলাদেশ হঠাৎ লোডশেডিং যুগে পুনরায় প্রবেশ করায় প্রায়-সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ প্রাপ্তিতে অভ্যস্ত নাগরিকদের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা ছড়িয়েছে। লোডশেডিং ঘোষণা আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতির ভবিষ্যতের সংকটের ইশারা মনে করা যেতে পারে। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এরই মধ্যে চলমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট পরিস্থিতিকে জটিলতর করে তুলেছে। তবে বিষণœ সংবাদের ভিড়ে কিছু সুসংবাদও আছে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রায় একই সঙ্গে অনেক সংকট আমাদের মোকাবিলা করতে হচ্ছে : মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যদ্রব্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, ডলার সংকট, রিজার্ভ পতন, বিদেশি ঋণ ও খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি ইত্যাদি…। সংকট সৃষ্টিতে সরকারের দায় হয়তো খুব বেশি নয়। কিন্তু জনগণ সরকারের কাছেই সব সমাধান আশা করে। এমন অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণের প্রথম ধাপ হলো, একে স্বীকার করে নেওয়া ও সংকটের প্রকৃত গভীরতা নির্মোহভাবে নির্ণয় করা। ‘শ্রীলঙ্কার ভয়াবহ আর্থিক সংকটের তথ্য গোতাবায়া রাজাপক্ষের সরকার গোপন করেছিল’ বলে সম্প্রতি দাবি করেছেন প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহে। বর্তমান সরকারের গত ১৩ বছরের অর্জনের বিবরণীতে সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে ছিল বিদ্যুৎ খাত। নিঃসন্দেহে এটি সরকারের বিশাল অর্জন। তবে সম্প্রতি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বেশ কিছু দুর্বলতা, নীতি, সিদ্ধান্ত, ত্রুটি, পরিকল্পনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা, চর্চা হচ্ছে। বিশেষত বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও হাজার হাজার কোটি টাকার ক্যাপাসিটি চার্জ প্রদান ও গ্যাস অনুসন্ধানে গুরুত্ব না দেওয়ার বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছে। এক সময় কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রেখেছিল। তবে এখন এগুলো যেন ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর থেকে এখন সরে আসাই উচিত। সরকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। এতে হয়তো বাংলাদেশ বিদ্যুৎ সমস্যা কাটিয়ে উঠবে।

রাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তা নামে দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা সরবরাহের যে দৃশ্যপট আঁকা হয়েছিল তা এখন আর ঠিক থাকছে না। ‘২৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আমদানিনির্ভর জ্বালানি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে বিশ্ববাজারে মূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নাজুক অবস্থানে পড়েছে বাংলাদেশ’- এমন সমালোচনা করেছেন একজন বিশেষজ্ঞ। দুঃখজনকভাবে ২০০০ সালের পর থেকে দেশে গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ প্রায় অকার্যকর রয়েছে বিশেষত সমুদ্র এলাকায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ মুহূর্তে নিজের গ্যাস ও কয়লা উন্নয়নের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতের পথে ক্রমাগতভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন করার নীতি গ্রহণ করাই হবে সঠিক নির্দেশনা।

 

বিদ্যুৎ ও গ্যাস মহাগুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বাংলাদেশের গ্যাসের ওপর চাপ কমাতে বর্তমান সরকার এলএনজি আমদানি (চাহিদার ২৫%) শুরু করে ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলে, যা জ্বালানি ক্ষেত্রে নতুন সংযোজন। এটি ইতোমধ্যে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। কিন্তু একই সঙ্গে গ্যাস ও কয়লা উন্নয়নে গুরুত্ব না দেওয়ার ফলেই এখন সমালোচনা হচ্ছে।

বাংলাদেশে যথেষ্ট মাত্রায় গ্যাস অনুসন্ধান না হওয়ার কারণে গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন। প্রকৃতপক্ষে গ্যাস সম্পদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বাপেক্ষা কম অনুসন্ধানকৃত দেশগুলোর একটি। এক সময় বলা হতো, ‘বাংলাদেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে’। এখন কেউ কেউ বলছেন, ‘দেশের গ্যাস সম্পদ শেষ হয়ে যাওয়ার পথে।’ দুটি ধারণাই অতিরঞ্জিত, অবৈজ্ঞানিক ও কিছুটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বাংলাদেশে আগামী নয়-দশ বছরের জন্য গ্যাস আছে বলে সাধারণভাবে মনে করা হয়। তাই গ্যাস সম্পদ আহরণ না করলে সামনে বড় ধরনের বিপদ অপেক্ষা করছে। বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে গ্যাস প্রাপ্তির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। ২০০২ সালে ভারত সরকার মিয়ানমারের (রাখাইনের) ‘শোয়ে গ্যাস ফিল্ড’ থেকে গ্যাস নিতে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে পাইপলাইন নেওয়ার প্রস্তাব করে। বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার ত্রিপক্ষীয় কূটনৈতিক পর্যায়ে অনেক বৈঠক আর আলাপ-আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়েছিল দিল্লিতে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে। এই সমঝোতায় এটাও উল্লেখ ছিল, প্রয়োজনে বাংলাদেশও এই পাইপলাইন থেকে গ্যাস সরবরাহ নিতে পারবে। তবে পরবর্তীতে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়নি। এতে আমরা কি কৌশলগত কোনো সুযোগ হারিয়েছিলাম?

ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তি (২০১২) হলেও সমুদ্রে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের জন্য উল্লেখযোগ্য অনুসন্ধান চালানো হয়নি। যদিও মিয়ানমার বেশ দ্রুততার সঙ্গেই গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে বাংলাদেশ বিশাল সমুদ্রসীমা লাভ করেছিল। এই অসাধারণ অর্জন ‘সমুদ্র বিজয়’ হিসেবে (২০১২) সাড়ম্বরে উদযাপন করেছিল বাংলাদেশ। সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। সাগরের সার্বভৌম অধিকার আদায়ে এক সময় বাংলাদেশ তার প্রতিবেশীদের তুলনায় ছিল সোচ্চার, চৌকশ ও কার্যকর। কিন্তু পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিকে অনুসন্ধান কাজে নিজেকে মোটেই আকৃষ্ট করতে পারেনি বাংলাদেশ।

দেশের গ্যাস সংকটের দুর্দিনে সাগরের গ্যাসই হতে পারে রক্ষাকবচ। বিভিন্ন সরকারের সময় তেল গ্যাস নিয়ে সিদ্ধান্তে ভুল হয়েছে, বিলম্ব হয়েছে, কৌশলগত সুযোগও হাতছাড়া হয়ে গেছে। ২০০৮ সালে সমুদ্রে সার্বভৌমত্ব ও গ্যাসসহ অন্যান্য সমুদ্র সম্পদ রক্ষার জন্য সেন্টমার্টিন দ্বীপের দক্ষিণাঞ্চলে বঙ্গোপসাগরের নীল জল কেটে যুদ্ধ সাজে এগিয়ে গিয়েছিল নৌবাহিনীর চারটি যুদ্ধজাহাজ। বিডিআর, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও সীমান্তে অগ্রবর্তী অঞ্চলে অবস্থান নিয়েছিল। আশা করি, বর্তমান বাস্তবতায় যুদ্ধকালীন জরুরি তৎপরতায় আমাদের সরকার তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের মহাযজ্ঞ শুরু করবে। জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালীকরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ক্ষেত্রের কিছু বিষয়ে জনগণের মধ্যে অস্পষ্ট ধারণা রয়েছে। সরকারের উচিত এ বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরা। না হলে জনগণ ভুল তথ্যে বিভ্রান্ত হতে পারে। কোনো সাফল্য বা অর্জন নিয়ে অতিকথন ও অতি প্রচারে আখেরে সরকারের ক্ষতি হয়। হঠাৎ রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসায় কিছুটা উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আগাম সতর্কতার অংশ হিসেবে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। কতিপয় দুর্ধর্ষ বঙ্গসন্তান বিদেশে পুঁজি পাচার ও দুর্নীতিকে প্রায় অপরূপ শিল্পে পরিণত করেছে। এটি বন্ধ না করলে বিপদ কাটবে না। বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স বৃদ্ধির উদ্যোগ এখন জরুরি। বড় প্রকল্পের বিদেশি ঋণ পরিশোধ ভবিষ্যতে নতুন চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ২০২৪ সাল থেকে এসব প্রকল্পের ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়তে পারে। তখন অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা আসতে পারে- এই মর্মে সাবধান করেছেন কিছু অর্থনীতিবিদ। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই পরিকল্পনা দরকার।

শ্রীলঙ্কার সংকটটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিসরে বহুল আলোচিত বিষয়। শ্রীলঙ্কার যে পরিণতি, আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশে তেমন প্রেক্ষাপট তৈরির লক্ষণ নেই। তবে শ্রীলঙ্কা সংকট থেকে বেশ কিছু বিষয়ে আমরা অবশ্যই শিক্ষা নিতে পারি। শ্রীলঙ্কার বিপর্যয় থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো- সময়মতো সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হওয়া। উল্লেখ্য, গোষ্ঠীতন্ত্রের কারণে শ্রীলঙ্কা সরকার সময়মতো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। তবে শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে ঋণগ্রস্ত দেশগুলো নিয়ে আইএমএফ সতর্কতা দিয়েছে। সেই সূত্র ধরে বিবিসির এক প্রতিবেদনে কয়েকটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের নামও এসেছে। দেশের সার উৎপাদনেও প্রভাব পড়েছে গ্যাস সংকটের। ইতোমধ্যে একটি সার কারখানা প্রায় এক মাস ধরে উৎপাদন করতে পারেনি। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বা আরও বাজে রূপ নিলে কৃষক সময়মতো সার পাবে না, এতে খাদ্য নিরাপত্তায় ঝুঁকি বাড়তে পারে।

বর্তমানে বিশ্বে বিভিন্ন দেশের সরকার বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে জনগণকে সচেতন করে ভিন্ন ভিন্ন পদক্ষেপের সঙ্গে শর্তও বেঁধে দিচ্ছে। যুদ্ধের ফলে উৎপাদন ঘাটতিতে পড়ে কোনো কোনো দেশ প্রয়োজনকেও কাটছাঁট করতে নাগরিকদের উৎসাহী করছে। এ তালিকায় আছে অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, জার্মানি, জাপান, ইতালি, স্পেনের মতো দেশ।

সংকট সমাধানে সরকার বিভিন্ন সময় নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে নতুন অর্থবছর শুরু করেছে কৃচ্ছ্রতা নীতির মাধ্যমে। নতুন অর্থবছরে নানা বিষয়ে ব্যয় কাটছাঁট করা হয়েছে। বিলাসী পণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। সর্বক্ষেত্রে ব্যয় সংকোচনসহ সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করেছে সরকার। জনগণকেও সাশ্রয়ী হতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরামর্শ দিয়েছেন। কাটছাঁট করা হচ্ছে উন্নয়ন ব্যয়। সরকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, জ্বালানি সাশ্রয় ও ভর্তুকি কমাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়। ১৯ জুলাই থেকে পরিকল্পিত লোডশেডিং শুরু হয়েছে। আপাতত তেলের দাম বাড়ানোর পরিবর্তে লোডশেডিংয়ে সমাধান দেখছে সরকার। তবে সতর্ক থাকতে হবে জ্বালানি সাশ্রয় করতে গিয়ে যাতে শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে না যায় ও কৃষি উৎপাদন ব্যাহত না হয়।

উল্লেখ্য, এ ধরনের সংকটের কোনো ‘জাদুকরী সমাধান’ নেই। কিছুদিন অনেকটা কষ্টকর অভিজ্ঞতা, ভোগান্তির মধ্য দিয়েই যেতে হয়। তবে সরকারকে জনসাধারণের ওপর যতটা সম্ভব কম পরিমাণে বোঝা চাপানোর বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে। এই ভোগান্তি যেন সব নাগরিক বা অঞ্চল সমান ভাগে বহন করে। জনগণ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট সংকটের জন্য সরকারের লোডশেডিং বা বিশেষ সাময়িক ব্যবস্থা কঠিন হলেও হয়তো কিছুদিন মেনে নিতে পারে। তবে জনগণ জ্বালানিসহ অন্যান্য সংকট মোকাবিলায় নিজের দায়িত্ব পালনে সরকারকে মনোযোগী, আন্তরিক ও দক্ষ দেখতে চাইবে।

এই সংকটময় সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক ও যোগাযোগ বজায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বকে অধিকতর বিভক্ত করেছে এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে বিকাশমান কৌশলগত পরিণতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ সহসা শেষ হওয়ার লক্ষণ নেই। বরং আরও দীর্ঘ সময় ধরেও চলতে পারে। তাই নিজেদের তাৎক্ষণিক আর দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগগুলো মোকাবিলায় সবচেয়ে বাজে পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে অধিকাংশ দেশ। আমাদেরও সেভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে।

এই কঠিন পরিস্থিতিতে নাগরিকদের ভূমিকা কী? এই সময় মিতব্যয়ী, সাশ্রয়ী হওয়া, ধৈর্য ধরা ও সহনশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষের সচেতনতা দরকার। উচ্চ আয়ের মানুষের সচেতনতা বেশি কাম্য। ব্যক্তিজীবনের মতো রাষ্ট্রীয় জীবনেও উত্থান-পতন থাকে। কণ্টকাকীর্ণ পথ মাড়িয়েই কখনো সামনের দিকে চলতে হয়। এ ধরনের সংকট কোনো সরকারের একার পক্ষে সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস। নাগরিকবৃন্দ, রাজনৈতিক দল, অর্থনীতিবিদ, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, সব অংশীজন, সিভিল সোসাইটি, প্রাইভেট সেক্টর, উদ্যোক্তা, মিডিয়া, একাডেমিয়া, সবাইকে নিয়েই দুর্যোগ মোকাবিলার পথ খোঁজা যেতে পারে। এই সময় সরকারের উদার, ঐক্যবদ্ধ জাতীয় পদক্ষেপ নাগরিকদের অসাধারণ প্রেরণা জোগাবে।

অনেক সংকট একসঙ্গে ধেয়ে আসছে। আবার এর ভিতর আশাবাদী কিছু সংবাদও আছে। যেমন ইতোমধ্যে ভোজ্য তেলের দাম কমেছে, আরও কমবে। জ্বালানি তেলের দাম কমছে, তুলার দাম কমছে, গমের দাম কমছে। জ্বালানির দাম কমে গেলে আমাদের বিপদ অনেক কমে যাবে। দুই-তিন মাসের মধ্যে হয়তো সুবাতাস বইতে পারে। গত ২২ জুলাই খাদ্যশস্য রপ্তানিতে রাশিয়া-ইউক্রেনের ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। অন্য দেশগুলোর মতো আগামী কয়েক মাস আমাদের চলার পথ হয়তো কঠিন হবে। সরকারের জন্য এটি নেতৃত্বের অ্যাসিড টেস্ট। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের দায়িত্ব নাগরিকদের পাশে নেওয়া। আশ্বস্ত করা। তাদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করা। নাগরিকদের কষ্ট ও ভোগান্তিতে সমব্যথী হওয়া। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন সরকার/দলের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, নেতা-কর্মীদের বিশেষ ভূমিকা আছে। কষ্টে থাকা মানুষ এসব বিষয় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে সরকারের ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নির্বাচন, সুশাসন, মানবাধিকারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যর্থতা, ঘাটতি থাকলেও বিভিন্ন জাতীয় সংকট উত্তরণে বর্তমান সরকারের সফলতার চমৎকার রেকর্ড আছে। এই সংকট বর্তমান সরকারকে যোগ্যতা প্রমাণের আরেকটি বিশাল সুযোগ এনে দিয়েছে। এই সংকট হয়তো সাময়িক নয়। অন্তত মধ্যমেয়াদি প্রস্তুতি প্রয়োজন। শুধু যুদ্ধের কারণে সংকটগুলো নয়, আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট, সমস্যা, দুর্বলতা, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি বিবেচনায় নিয়ে বিশেষত আর্থিক খাতের দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলা রোধে সরকারের কঠোর অবস্থান জরুরি। যা দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত জিরো টলারেন্স নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ব্যক্তিগত থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সাশ্রয়, মিতব্যয়িতা ও উৎপাদন বজায় রাখা। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের সংগ্রামী জনগণ এবারও সংকটে হেরে যাবে না। যদিও ‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ’। তবুও আলো আসবেই। ভয় বা হতাশা নয়। আমাদের অনুপ্রাণিত করুক শুধু আশা। সংকট শুধু ভোগান্তি নয়, আত্ম-উপলব্ধিও ঘটায়। সংকটের বেড়াজালেই শুরু হতে পারে ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় নতুন পথচলা।

লেখক : গবেষক।