১/১১এ জননেত্রী শেখ হাসিনার কারাবন্দি দিবস- প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

 

এম এ করিম-

১৬জুলাই ২০০৭ইং ছিল বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার কারাবন্দি দিবস। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নীল নক্সায় ধানমন্ডির সুধা সদন থেকে আটক করে এবং সংসদ ভবন এলাকায় স্থাপিত বিশেষ কারাগারে দীর্ঘ ১১ মাস আটক রেখেছিলেন। ১১জুন মুক্তি দিয়েছিলেন। রাজনৈতিক ও সরকারের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা মাইনাস ফর্মুলার পক্ষ নিয়ে দলের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কেন্দ্রীয় নেতাদের অপতৎপরতা বিগত হলেও ভূলে যাওয়ার নয়।
১/১১ এ সেনা সমর্থিত অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলের শুরুতেই আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা কর্মীরা গ্রেফতার,হয়রানি,নির্যাতনের সম্মূখীন হয়েছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অগণতান্ত্রিক কার্যক্রমের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের জাতীয় কাতারের নেতাদের গ্রেফতার,মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির এক পর্যায়ে জননেত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক ভাবে মিথ্যা মামলা সাজানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করে অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকার। রাজনীতিতে মাইনাস ফর্মুলার অংশ হিসেবে প্রথমেই বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়। সদ্য ক্ষমতা থেকে বিদায়ী বিএনপি-জামায়াত জোটের নেতৃত্বাধীন পর পর পাঁচ বার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন সরকার প্রধান খালেদা জিয়াকে প্রথমে আটক না করার পক্ষ অবলম্বন গ্রহণ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। বিলম্বে বিএনপি নেত্রী বেগম জিয়াকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
মাইনাস ফর্মুলার রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় জোটের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েক জন নেতার সাথে কতিপয় নেতারা সেনা সমর্থিত অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্বে পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার লিপ্সায় ছিলেন।


২০০৭ সালের ১৫ জুলাই শেষে ১৬ জুলাই শুরুতে ধানমন্ডির সুধাসদনে বসবাসরত বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার বাসভবনে যৌথ বাহিনীর ঘেরাও খবর পেয়ে আতঙ্কিত হলাম। কর্মরত সাংবাদিকদের সাথে ফোনালাপে অবগত হলাম গন মানুষের নেত্রীকে আটক করার প্রক্রিয়া চলছে। গভীর রাতে জননেত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ অবলম্বন কারী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাইনাস ফর্মুলার প্রতিবাদী কন্ঠ বিশেষ করে অগ্নি কন্যা বেগম মতিয়া চৌধুরী, এডভোকেট সাহারা খাতুন ,ডঃ হাছান মাহমুদ,ক্যাপ্টেন (অবঃ) এ বি তাজুল ইসলাম সহ অন্যান্য কয়েকজন নেতৃবৃন্দের সাথে ফোনালাপ করি-আমাদের করণীয় কী। গভীর রাত হওয়ায় শ্রদ্ধেয় নেতা জিল্লুর রহমান,সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী কে ঘুমিয়ে যাওয়ার কারনে ফোনে পায়নি। জননেত্রী শেখ হাসিনা গ্রেফতারের প্রস্তুতিতে ভীত না হয়ে আমাদের অনেকের সাথেই ফোনে কথা বলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছিলেন। ১৬ জুলাই ভোরে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করে কোর্টে নেয়া প্রাক্কালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকেরা প্রতিবাদের শ্লোগানে মুখরিত করে যৌথ বাহিনীর হামলা,নির্যাতন এবং কয়েকজন নারী নেত্রী গ্রেফতার হয়েছিলেন। পাতানো কোর্টে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে গ্রেফতারে শুনানিতে এডভোকেট সাহারা খাতুন সহ আমাদের অন্যান্য আইনজীবীগন অংশ গ্রহণ করেন। পাতানো কোর্ট জননেত্রী শেখ হাসিনার জামিন না মঞ্জুর করা হলো। কোর্ট থেকে কারাগারে যাওয়ার প্রাক্কালে কোর্টে উপস্থিত আওয়ামী লীগের সভাপতি মণ্ডলীর অন্যতম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী এবং আওয়ামী লীগের তৎকালীন আইন সম্পাদক এডভোকেট সাহারা খাতুন কে ডেকে কথা বলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে জননেতা জনাব জিল্লুর রহমানকে দায়িত্ব দিয়ে যান। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে জাতীয় সংসদ এলাকায় স্থাপিত অস্থায়ী কারাগারে নেয়া হয়। এদিকে বেগম মতিয়া চৌধুরী কোর্ট এলাকা থেকে আমাকে গাড়ীতে উঠিয়ে গুলশানে জিল্লুর রহমান সাহেবের বাসভবনে যাবার পথে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে আমাদেরকে। অনেক বাধা-চেষ্টার পর মতিয়া আপা এবং আমি গুলশান আইভি কর্নকডে জিল্লুর রহমান সাহেবের বাসায় পৌছতে সক্ষম হলাম। আমাদের গাড়ীর পিছনে বিভিন্ন টিভি-প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকরা এসে আইভি কর্নকডে জড়ো হয়। সাংবাদিকদের নীচে অবস্থান করার অনুরোধ করলে তারা অপেক্ষায় থাকেন। মতিয়া আপা আমাকে নিয়ে লিফটে ছয়তলায় উঠে বাসায় শ্রদ্ধেয় জিল্লুর রহমান কে নেত্রী গ্রেফতার বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন । বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করার জন্য জিল্লুর রহমান সাহেবকে অবহিত করা হয়। এদিকে ভবনের নীচে অপেক্ষারতঃ সাংবাদিকরা বার বার ফোন করে জিল্লুর রহমান সাহেবের সাক্ষাত নেয়ার জন্য তাড়া দিচ্ছিল। অনুমতি সাপেক্ষে পরক্ষণেই সাংবাদিকদের উপস্থিতি । ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে জিল্লুর রহমান সাহেব মতিয়া আপা ও আমাকে পাশে রেখে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার গ্রেফতারের প্রতিবাদ করে অবিলম্বে নেত্রীকে নিঃশর্ত মুক্তির দাবী জানান। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হীন কার্যকলাপের সমালোচনা করেন । উল্লেখ্য বঙ্গবন্ধু কন্যার গ্রেফতারে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষ অবলম্বনকারী মাইনাস ফর্মুলার ষড়যন্ত্রকারীরা উল্যাসিত হয়ে বেশী দিন ঠিকে থাকতে পারেনি। তারাই বঙ্গবন্ধু কন্যাকে আটক রেখেই জাতীয় নির্বাচনে আগ্রহী ছিলেন। নেতা কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এগারো মাস আটক শেষে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় । তাই মাইনাস ফর্মুলার ষড়যন্ত্রের রাজনীতির সফলতার মুখ দেখেনি। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সংরক্ষিত কারাগারে আটক থাকাকালীন তাঁর নিঃশর্ত মুক্তির দাবীতে আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা রাজধানী সহ অন্যান্য এলাকার বিভিন্ন পেশার ২৫ লাখ মানুষের গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে (তেজগাঁও- বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়) ২০০৮ সালের ২৮ এপ্রিল জমা করা হয়েছিল।
দলের ত্যাগী,পরীক্ষিত নেতা কর্মীদের তোপের মূখে সংস্কারবাদীরা অপদস্থের পাশাপাশি তাদের সিদ্ধান্ত পাল্টিয়ে মূলধারার রাজনীতিতে ফিরে এসে নিজেদের রক্ষায় সক্ষম হয়েছে। উল্লেখ করা যেতে যে, সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে আর বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি আস্হাশীলে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দ্বিধা বিভক্ত ছিল। সেই সময় জীবনের ঝুকি মোকাবিলা করে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে যারা বলিষ্ঠ ভুমিকা রেখেছিলেন তারা অবশ্যই স্মরণীয় থাকবে। শ্রদ্ধেয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে রয়েছে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, বেগম মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিম, প্রয়াত এডভোকেট সাহারা খাতুন, ওবায়দুল কাদের, প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, রাজি উদ্দীন রাজু, ক্যাপ্টেন (অব) এবি তাজুল ইসলাম, স্থপতি ইয়াফেস ওসমান, ডাঃ দিপু মনি, হাবিবুর রহমান সিরাজ, প্রয়াত এডভোকেট রহমত আলী, ডঃ হাছান মাহমুদ, ঢাকা মহানগর নেতৃবৃন্দের মধ্যে এডভোকেট কামরুল ইসলাম, ফয়েজ উদ্দিন মিয়া, বজলুর রহমান, প্রয়াত আসলামুল হক,শাহে আলম মুরাদ, আব্দুল হক সবুজ, ডা দিলীপ রায়, হেদায়েতুল ইসলাম স্বপন, আবুল কালাম আজাদ সহ আরো অনেকে। বর্তমান মহামান্য রাষ্ট্রপতি এডভোকেট আব্দুল হামিদ, মেজর জেনারেল (অব) সুবিদ আলী ভুঞা, প্রয়াত কর্নেল (অব) শওকত আলী, ডঃ এম এ জলিল জননেত্রী শেখ হাসিনার মুক্তি আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন।
উল্লেখ করা যেতে পারে যে তৎ সময়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭জন সাংগঠনিক সম্পাদকের মধ্যে ৬জনই জননেত্রী ‘শেখ হাসিনা’ মাইনাস ফর্মুলার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। মাইনাস ফর্মুলায় দলের কয়েক জন সিনিয়র নেতার ব্যর্থ চেষ্টা সফল হয়নি।
বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সহ আরো নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলায় ব্যারিস্টার সফিক আহমেদ (সাবেক আইন মন্ত্রী), প্রয়াত ব্যারিস্টার রফিকুল হক, এডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু সহ অন্যান্য আইনজীবীরা বিশেষ সংস্থার বাধার মোকাবিলা করেও কাজ করেছেন। ইলেকট্রনিক মিডিয়া (টিভি) টকশোতে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার পক্ষ অবলম্বন করে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অগণতান্ত্রিক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে এডভোকেট স ম রেজাউল করিম সহ হাতে গোনা ক’জন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব কথা বলেছেন। আত্ম গোপনে থেকে ও জননেত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ অবলম্বন ও মুক্তি আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভুমিকা রেখেছিলেন মোফাজ্জল হোসেন মায়া চৌধুরী, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আফম বাহাউদ্দিন নাসিম, মির্জা আযম, একেএম এনামুল হক শামীম। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার পক্ষে অবস্থান ও তাঁর মুক্তি আন্দোলনে সাবেক ছাত্র নেতাদের মধ্যে ছিলেন আহমদ হোসেন, বি এম মোজাম্মেল হক, সুভাষ সিংহ, এস এম কামাল হোসেন, সুজিত রায় নন্দী, এডভোকেট রিয়াজুল কাউছার, বলরাম পোদ্দার, শাহজাহান আলম সাজু,আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, এডভোকেট আফজাল হোসেন, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, মারুফা আক্তার পপি, সাইফুজ্জামান শিখর প্রমূখ। আওয়ামী লীগের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সহ তৃণমূলের নেতাকর্মীরা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আস্হাশীল হয়ে কাজ করেছে। তাছাড়া শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আব্দুল জলিল, কামাল আহমেদ মজুমদার, পংকজ দেবনাথ, ডঃ আওলাদ হোসেন সহ অনেকেই গ্রেফতার হয়েছিলেন। যারা সুবিধার প্রলোভনে পড়ে দলে খুনী খোন্দকার মোস্তাকদের ন্যায় বিশ্বস্ততার ভাব নিয়ে সর্বক্ষেত্রেই তাদের বিচরণ রয়েছে।
এতে ত্যাগী,নির্যাতিত,নিপীড়িত নেতাকর্মীরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। আমি প্রাণপ্রিয় নেত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার দীর্ঘায়ু কামনা করছি।
আল্লাহ্ মহান
জয় বাংলা-জয় বঙ্গবন্ধু

লেখক- সাবেক সহ সভাপতি ,বাংলাদেশ কৃষক লীগ