আমাদের পদ্মা সেতু : মোঃ বায়েজিদ সরোয়ার

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ বায়েজিদ সরোয়ার, এনডিসি (অবঃ):

পদ্মা নদী ভ্রমণকালে পদ্মা সেতু দেখার মিশন নিয়ে গ্রীষ্মের এই সকালে (জুন, ২০২২) আমরা বেরিয়েছি। মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার থেকে নামার পরই গাড়িগুলি দৃষ্টিনন্দন ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে প্রবেশ করলো। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে তৈরী, চোখঁ ধাধাঁনো দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়েতে উঠে এক ধরনের রোমান্টিকতাও জাগে। গাড়িতে চড়েই যেন বিমানের অনুপম মুগ্ধতা।

ইতিহাস সমৃদ্ধ মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর-শ্রীনগরের সবুজাভ জনপদের মধ্য দিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে থাকি। যাত্রা পথে চোখে পড়ে, গ্রীষ্মের রঙিন ফুলগুলোঃ কৃষ্ণচুড়া, সোনালু, জারুল….। খুব অল্প সময়েই পৌছে যাই সার্ভিস এরিয়া সংলগ্ন মাওয়া ক্যাম্পে। চোখে পড়ে পদ্মা সেতুর এপারের কর্মযজ্ঞ। ততক্ষনে থেমে গেছে বৃষ্টি। মাওয়া ক্যাম্পে খানিক বিরতির পর পৌছে যাই মাওয়ার শিমুলিয়া ঘাটে। সেখান থেকে পদ্মায় চমৎকার এক পেট্রল বোটে ওঠা হলো।

সকাল প্রায় দশটা। বৃষ্টি থামার পর চমৎকার নদীর শোভা। নরোম রোদ। আমাদের আপাত গন্তব্য পদ্মার ওপারের কাঁঠালবাড়ি ঘাট। ভ্রমণ শুরুর কিছুক্ষন পরই দূরে পদ্মা সেতুর অস্পষ্ট অবয়ব চোঁখে পড়ে। পদ্মায় চলছে অসংখ্য জলযানঃ ফেরি, ট্রলার, লঞ্চ, স্পীড বোট, মাছ ধরার নৌকা….। মাছ ধরার নৌকাগুলোও ইঞ্জিন চালিত। মনে পড়ে মানিক বন্দোপাধ্যায়ের উপন্যাস- ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র কথা। এ যুগের কুবের, কপিলা, ধনজ্ঞয়, হোসেন মিয়া, আমিনুদ্দিনদের অবস্থা কতটা বদলেছে? কেউ কি এদের খবর রাখে? বোটের ওপারেটর তরুন আবদুল কাদের পদ্মা পারের মানুষ। আমরা তার দেখা পদ্মা ব্রীজ তৈরির রানিং কমেনট্রি শুনতে থাকি।

আমাদের দ্রুতগামী তরীটি পদ্মা ব্রীজের কাছে আসতে থাকে। এক পর্যায়ে, নদীর প্রায় মাঝখান থেকে আমরা প্রায় সম্পূর্ণ সেতুটি দেখতে পাই। অদ্ভুত এক ভালোলাগা আমাদের আচ্ছন্ন করে। বোটটি চলতে চলতে সেতুর একেবারে কাছে চলে আসে। অভিজ্ঞ চালক ছবি তোলার জন্য বোটের ইঞ্জিনটি বন্ধ করে দেয়। একদম চোখের সামনে ধুসর রঙের কাঙ্খিত বিশাল সেতু। একধরনের রোমান্টিকতা, ভালোলাগা, মুগ্ধতা ও বিস্ময়ে কিছুক্ষন আবিষ্ট হয়ে থাকি। এই “গ্রেট” সেতুটি নির্মানে জড়িত সকলকে মনে মনে অভিবাদন জানাই। ব্রিজের পটভূমিতে যুগলে রোমান্টিক ভঙ্গিতে ছবি টবিও তোলা হয়। অতপর ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দ্বিস্তরের ইস্পাত ট্রাস সেতুটির নীচ দিয়ে নদীর অপর পারে এগিয়ে যেতে থাকি।

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং উন্নয়ন প্রকল্প এই পদ্মা বহুমুখী সেতু। আওয়ামী লীগ শাসনামলে, ১৯৯৯ সালে পদ্মা সেতুর প্রকল্পের জন্য প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা শুরু হয়। ২০০১ সালের ৪ জুলাই সেতুর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনা। বিএনপি সরকারের সময়ে, ২০০৩ সাল থেকে এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষার কাজ শুরু হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্মা সেতুর কাজ হাতে নেয় এবং ২০০৭ এর আগষ্টে একনেক সভায় পদ্মা সেতু প্রকল্প (শুধু সড়ক সেতু) পাস করা হয়।

২০০৮ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইস্তেহারে এই সেতু নির্মানের প্রতিশ্রুতি ছিল। ২০০৯ সালে সরকার গঠনের করেই প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু নির্মানের কাজ হাতে নেন। ২০১১ সালে তিনি পদ্মা সেতুতে রেলপথ সংযোজনের নির্দেশ দেন এবং সেভাবেই সেতুর নক্সা পরিবর্তন করা হয়। নক্সা তৈরী জন্য নিউজিল্যান্ডভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মনসেল এইকমকে নিয়োগ দেওয়া হয়। সরকারের পরিকল্পনা ছিল বিশ্বব্যাংকসহ কয়েকটি সাহায্যদাতা সংস্থার অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মান করা হবে। ২০১১ সালে বিশ্বব্যাংক, জাইকা, আইডিবি ও এডিবির সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। স্বপ্নের সেতু নির্মানের কাজ শুরু হলো। কিন্তু আছমকা ছেদ। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে বিশ্বব্যাংক অভিযোগ করে যে, পদ্মা সেতু প্রকল্পে দূর্নীতি হয়েছে।

 

পদ্মা সেতুর কথিত দূর্নীতি নিয়ে মিডিয়ায় তখন তুমুল আলোচনা। দেশে বিদেশে আলোচনা, সমালোচনা, বিরোধীতা ও বিতর্কের ঢেউ প্রমত্তা পদ্মার ঢেউকে যেন হার মানালো। ২০১২ সালে দূর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক সেতু প্রকল্পে ঋণ চুক্তি বাতিল করে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তে ছিল অবিচল। ২০১৩ সালের মে মাসে প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনা দৃঢ়চিত্ত ও প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মানের সংকল্প ব্যক্ত করেন। এই সাহসী সিদ্ধান্তই সবকিছু বদলে দেয়। অবশেষে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে সেতুর নির্মান কাজ শুরু হয়। বাংলাদেশ সেতু কতৃপক্ষ হলো পদ্মা সেতুর প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা। সুদক্ষ প্রকৌশলি মোঃ শফিকুল ইসলাম এই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক, যার নেতৃত্বে চলছে সেতু নির্মানের কর্ম-যুদ্ধ। নির্মান কাজ দূর্বার গতিতে চলে আজ এই সেতু বাস্তব। এসব ভাবতে ভাবতে সুবিশাল পদ্মা পেরিয়ে মাদারিপুর জেলার শিবচর উপজেলার কাঁঠালবাড়ি ঘাটে পৌঁছলাম।

কাঁঠালবাড়ি থেকে আশে পাশের কয়েকটি স্থানে যাওয়া হলো। কৌশলগত কারন ও নিরাপত্তার জন্য শরীয়তপুর জেলার জাজিরায় গড়ে উঠেছে অত্যন্ত আধুনিক নির্মান শৈলীর শেখ রাসেল সেনানিবাস। এখানে মোতায়েনকৃত ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেড ব্রিজের নির্মান কাজে নিরবিচ্ছিন্ন নিরাপত্তা প্রদান করছে। এই এলাকাটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিধন্য। বিশেষ করে মাদারীপুর ও শিবচর এলাকা। জীবনের ওপারে চলে যাওয়া আমাদের বঙ্গবন্ধু হয়তো কখনো জানবেন না, জাজিরায় তার প্রানপ্রিয় পুত্র শেখ রাসেলের নামে একটি সেনানিবাস আছে। মানুষ মরে গেলে তার বয়স আর বাড়ে না। পরিচিত মানুষের স্মৃতিতে সেই প্রানচ্ছল নিস্পাপ চেহারার শেখ রাসেলের বয়স এখনো নয়-দশ বছর।

অপরূপ বৃক্ষ লতা ও ফুলে ফুলে ভরা জাজিরা ক্যাম্প/এপারের সার্ভিস এরিয়ায় চমৎকার সময় কাটে। এখানে বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের মিথস্ত্রিয়ায় পদ্মা ব্রীজ নির্মানের অনেক বিষয় জানা যায়।  পদ্মা সেতু নির্মানের প্রাথমিক পর্যায়ে তৎকালীন সেতুমন্ত্রি সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রশংসনীয় কর্মতৎপরতা ও দক্ষতা বিশেষভাবে উল্লেখ্যযোগ্য। তৎকালীন সচিব মোশারফ হোসেন ভুইয়াও চমৎকার ভূমিকা পালন করেছিলেন। তবে দুঃখজনকভাবে তাদের দায়িত্ব থেকে সরে যেতে হয়েছিল। সৈয়দ আবুল হোসেন তার “আমি ও জবাবদিহিতা” গ্রন্থে সেই সময়ের ঘটনাবলী সবিস্তারে তুলে ধরেছেন।

বর্তমানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রি ওবায়দুল কাদের এর সার্বিক তত্ত্বাবধান চলছে সেতুর নির্মানযজ্ঞ। সেতু বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন মোঃ মনজুর হোসেন । পদ্মা সেতু নির্মানে জাতীয় অধ্যাপক ডঃ জামিলুর রেজা চৌধুরী অসাধারন অবদান রেখেছেন। এই কিংবদন্তিতুল্য পূরকৌশল প্রকৌশলী ছিলেন সেতু প্রকল্পের আন্তজার্তিক প্যানেল অব এক্সপার্টদের সভাপতি। উল্লেখ্য এই প্যানেলে কর্মরত বাংলাদেশের প্রকৌশলী-অধ্যাপকগন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

পদ্মা সেতু প্রকল্পে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিশেষত কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স এর অসাধারন ভূমিকা রয়েছে। ২০১৩ সালে সরকার, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে পদ্মা সেতুর কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন কনসালটেন্ট (সিএসসি) হিসেবে নিয়োগ দেয়। এই সময়ে সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া। পদ্মা ব্রীজের জন্য গড়ে ওঠে অস্থায়ী এডহক সিএসসি। হাতিরঝিল প্রকল্প বাস্তবায়নের নায়ক মেজর জেনারেল আবু সাইদ মোঃ মাসুদ সিএসসি এর চীফ কর্ডিনেটর হিসেবে অসাধারন অবদান রেখেছেন। পদ্মা বহুমুখী প্রকল্পের ভৌত কাজকে মূলত ৫টি প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে। মূল সেতু, নদী শাসন, অ্যাপ্রোচ রোড, টোল প্লাজা ও সার্ভিস এরিয়া নির্মান।

সেনাবাহিনীর সিএসসি দলটি ৫টির মধ্যে প্রথম তিনটি প্যাকেজের (অ্যাপ্রোচ রোড, টোল প্লাজা ও সার্ভিস এরিয়া) সুপারভিশন কনসালটেন্সি অত্যন্ত দক্ষতা ও গতিশীলতার সঙ্গে সুসম্পন্ন করে। উল্লেখ্য, বুয়েটও (বিআরটিসি) এখানে কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করে। এই তিনটি প্যাকেজের কনট্রাকটর হিসেবে কাজ করে আবদুল মোনেম লিঃ। মূল সেতু নির্মানের অনেক আগে, পরিকল্পিত সময়ের মধ্যে অ্যাপ্রোচ রোড ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মিত হওয়ায়, জনগনের মনে আশা জাগে যে, পদ্মা সেতু আর স্বপ্ন হয়, এটি বাস্তব হতে চলেছে।

পদ্মা সেতু ছাড়াও বর্তমানে চলমান মেগা প্রজেক্ট “পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পেও” কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন কনসালটেন্ট (সিএসসি) হিসেবে সেনাবাহিনী কাজ করছে । বর্তমানে সিএসসি’র চীফ কর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মেধাবী সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল এফ এম জাহিদ হোসেন।

কাঁঠালবাড়ি থেকে শিমুলিয়া ঘাটে ফিরতি নৌ ভ্রমণ শুরু হয়। ততক্ষনে দুপুর গড়িয়ে গেছে। মূল নদীতে এলে বৃষ্টি শুরু হয়। আকাশ ঢেকে যায় কালো মেঘে। হঠাৎ উত্তাল হয়ে ওঠে নদী। পদ্মার জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা, সাহসী বোট চালক আবদুল কাদের, আমাদের অভয় দেয়। উত্তাল নদীতে, দুলতে থাকা স্মার্ট নৌকায় বসে ভাবি, পদ্মা ব্রীজ নির্মান করতে কত ঝড় ঝাপড়াই না সামলাতে হয়েছে আমাদের সরকার ও প্রকৌশলীদের। কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও বর্তমান সরকার সেতু নির্মান সম্পন্ন করেছে। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনার অদম্য ইচ্ছা শক্তি ও অসাধারণ গতিশীল নেতৃত্ব ইতিহাস হয়ে থাকবে।

নদী কিছুটা শান্ত হলে একালের স্মার্ট মাঝি আবার সেতু নির্মানের গল্প বলতে থাকে। এটি এক নির্মান মহাযজ্ঞ। মূল সেতুর নির্মান প্রতিষ্ঠান (কনট্রাকটর) চীনের চায়না মেজর ব্রীজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনষ্ট্রাকশন কোম্পানী লিঃ। অন্যদিকে নদী শাসনের কাজ করছে চীনের সিনোহাইড্রো কর্পোরেশন। খরস্রোতা পদ্মা নদীর বুকে ভাসমান বিশাল এ স্থাপনা নির্মানের পেছনে রয়েছে বিরাট এক কর্মযজ্ঞের গল্প। ২০ টি দেশের বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী টেকনিশিয়ান, শ্রমিক ও কর্মীসহ প্রায় ১২ হাজার মানুষের মেধা ও অক্লান্ত শ্রমে তৈরি হয়েছে পদ্মা সেতু। এই বড় প্রকল্পে বিদেশীদের পাশাপাশি বাংলাদেশী প্রকৌশলী ও কন্ট্রাকটারগন কাজ করেছেন সমান তালে। চীনের নিবেদিত প্রাণ শ্রমিক-প্রকৌশলীর সংখ্যা প্রায় ১২০০। এর বাইরে প্রায় সবাই বাংলাদেশের। এই বড় কাজে ব্যবহৃত রড, সিমেন্ট, বালুর মত উপকরণ বাংলাদেশেই তৈরি। সেতুর কাজ শুরুর পর এক দিনের জন্যও নির্মান কাজ বন্ধ রাখা হয়নি।

১৫ নং স্প্যানের নিচ দিয়ে সেতু পার হচ্ছি। সেতুটিকে প্রকৌশল জগতের বিস্ময় বলা যায়। এতে বিশ্বের গভীরতম পাইল ফাউন্ডেশন ব্যবহার করা হয়েছে। নদীর তলদেশে মাটির ১২২ মিটার গভীরে পাইল বসানো ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিয়ারিং করা হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং নদী শাসন ব্যবস্থাও এই প্রকল্পে। এসব কারনে সারা বিশ্বের প্রকৌশলীদের মধ্যে এই সেতুর একটা বিশেষ অবস্থান আছে। এই সেতু নির্মানে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। প্রাকৃতিক ও প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জগুলো জয় করে শেষ পর্যন্ত গড়ে উঠেছে এই সেতু। এটি যেন প্রকৌশলীদের বসন্ত।

নদী আবার শান্ত হয়ে যায়। মুগ্ধ নয়নে চোখের সামনের প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার বিশাল সেতুটি আবার দেখি। এই সেতু হতে চলেছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গেম চেঞ্জার। দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের সোনালী ভবিষ্যতকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত করে সার্বিক উন্নয়নে প্রভূত ভূমিকা রাখার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এটি শুধু প্রকৌশলগত অর্জন নয়। বরং একে প্রযুক্তি, শিক্ষা, উন্নয়ন, ভূ-রাজনীতি ও সামাজিক সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোন থেকেও মূল্যায়ন করা যেতে পারে। জাতির আকাঙ্খার প্রতীক সেতুটি অপেক্ষাকৃত অনুন্নত অঞ্চলের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিল্পায়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। সেতুটি নির্মানের ফলে দেশের জিডিপি ১.২ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলে ধারনা করা হয়। সেতুটি নির্মানের ফলে দক্ষিনাঞ্চল ট্রান্স-এশিয়ান হাইওয়ে ও ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে।

এক ঝাক মায়াবী পাখি, আমাদের যেন এস্কট করে শিমুলিয়া ঘাটে পৌঁছে দেয়। এভাবেই শেষ হয় পদ্মায় পারিবারিক নদী ভ্রমণ ও সেতু দর্শন। হয়তো এরপর, সেতু থেকেই পদ্মার রূপ দেখবো কোন এক কোজাগরী পূর্ণিমায়। ঘাটের জনারন্য পেরিয়ে আবার মাওয়া ক্যাম্প। বিকেলে ঢাকার দিকে ফিরতি যাত্রা। আবার এক্সপ্রেসওয়ের মসৃন যাত্রার মুগ্ধতা। দেশে আমরা অনেক বড় বড় স্থাপনা, অবকাঠামো তৈরী করেছি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এগুলোর মান ধরে রাখতে পারিনি। এই সেতুটি আমাদের সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। গর্বের পদ্মা ব্রীজের মান আমাদের ধরে রাখতেই হবে। তাই নির্মান- পরবর্তী ব্যবস্থাপনা, সড়ক ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি নিয়ে এখন থেকেই ভাবতে হবে ও ব্যবস্থা নিতে হবে। সেতু তৈরী হওয়ায় অনেকের পেশা বদল করতে হবে। সরকার ও সমাজ যেন তাদের পাশে থাকে। ব্রিজ পারাপারের টোলের হারটি আরো সহনীয় করা যেতে পারে।

বিকেলের কনে দেখা আলোয় চারপাশের প্রকৃতি মুগ্ধতা ছড়ায়। খুব অল্প সময়ে পৌছে যাই পদ্মা থেকে বুড়িগঙ্গায়। সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী, ২৫ জুন, ২০২২ পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হবে। সেতুর উদ্বোধন অনুষ্ঠানটি আমাদের সবার অনাবিল আনন্দের।

আমাদের মধ্যে বিভাজন, বৈষম্য বাড়ছে। তাই আমাদের প্রয়োজন সেতু। বাঁধ, আর দেয়াল নয়। বৃটিশ কবি ফিলিপ লারকিন লিখেছেন- “একটি সেতুর দ্বারাই আমরা বাস করি”। কারন সেতুগুলোই আমাদের সংযোগের আকাংখাকে প্রতিনিধিত্ব করে। ব্রীজটি সমগ্র জনগণের সম্পদ। আমাদের অর্থায়নে তৈরী পদ্মা সেতু, দুই পারের মানুষের সেতু বন্ধন ঘটিয়েছে, একত্রিত করেছে। জাতীয় ও সামাজিক জীবনে এখন প্রয়োজন পদ্মা সেতুর মতোই সেতু বন্ধন, ঐক্য, সম্মিলন, সংযোগ বন্ধন। পদ্মা সেতুর এই স্পিরিট ভবিষ্যতে আমাদের পথ দেখাবে। সেতু নির্মানে জড়িত কর্মবীরদের অভিবাদন। শুভ হোক পদ্মা সেতুর উদ্বোধন। হ্যাপি গ্র্যান্ড ওপেনিং।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, গবেষক.