ইউরোপের প্রতিষ্ঠানগুলোর চীন ভীতি : চলে যাচ্ছে চীন ছেড়ে ভিয়েতনামে

99

ছেড়ে

ভিনিউজ ডেস্ক -গত কিছুদিনে ইউরোপের কিছু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান চীন ছেড়ে  ভিয়েতনামের দিকে ঝুঁকেছে। এর কারণ কী? এ কারণে চীনের অর্থনীতিতে কি বিপর্যয় নামতে পারে?করোনা মহামারির কারণে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এ সময়েও ভিয়েতনাম ছিল উজ্জ্বল ব্যাতিক্রম। এশিয়ার একমাত্র দেশ হিসেবে মহামারির সময়েও খুব উল্লেখযোগ্য হারে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে তাদের। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটির জিডিপি এ বছর শতকরা ৫.৫ ভাগ বাড়বে বলে বিশ্ব ব্যাংকের ধারণা।

করোনা মহামারির আগেই অবশ্য ভিয়েতনামের অর্থনীতির পালে হাওয়া লাগে। মহামারির সময়ে উন্নতির ধারা অব্যাহত থাকায় ইউরোপের কিছু বড় বড় ফার্ম সে দেশে ব্যবসা করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। জার্মানির গাড়ির যণ্ত্রাংশ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ব্রোজের ১১টি কারখানা রয়েছে চীনে। কিন্তু তারা ঠিক করেছে আগামীতে পণ্য উৎপাদনের ঠিকানা হিসেবে ভিয়েতনাম এবং থাইল্যান্ডকে বেছে নেবে।গত ডিসেম্বরে ডেনমার্কের লেগো কোম্পানি জানিয়েছে তারাও এক বিলিয়ন ডলারের কারখানা খুলবে ভিয়েতনামের সবচেয়ে বড় শহর হো চি মিন সিটির দক্ষিণের বাণিজ্যিক অঞ্চলে।

ইউরোপের বাণিজ্যে চীনবিমুখতার ইঙ্গিত কেন?
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউরোপের কিছু প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ চীন থেকে সরে যাওয়ার কারণ আসলে কমপক্ষে তিনটি।প্রথম কারণ অবশ্যই পণ্যের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি। এক সময় যে দেশের প্রতি ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহী হওয়ার প্রধান কারণ ছিল শ্রমিকের স্বল্প মজুরি এবং সেই সুবাদে অল্প উৎপাদন-ব্যয়, সেই চীনে গত ১০ বছর ধরে শ্রমিকের মজুরি বাড়ছে। মুডি’জ অ্যানালিটিক্স-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে চীনে শ্রমিকের বার্ষিক মজুরি ছিল মাত্র পাঁচ হাজার ১২০ ইউরো, ২০২০ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১৩ হাজার ৬৭০ ইউরো। শ্রমিকের মজুরির এই উল্লম্ফনের ফলে পণ্যের উৎপাদন-ব্যয়ও বেড়েছে। এ কারণে শুধু ইউরোপ নয়, বিশ্বের অনেক দেশই আরো কম খরচে পণ্য তৈরি হয় এমন দেশের দিকে ঝুঁকছে।

দ্বিতীয় কারণ হিসেবে ইউরোপের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের অবনতির বিষয়টির উল্লেখ করছেন বিশ্লেষকেরা। শিনজিং প্রদেশে সংখ্যালঘু উইগুর মুসলমানদের নির্যাতনের কারণে চীনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এর পাল্টা ব্যাবস্থা হিসেবে চীনও ইইউ-র কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে দু পক্ষের সম্মতিতে হওয়া বিনিয়োগ বিষয়ক চুক্তিকেও হিমঘরে পাঠিয়ে দেয়। বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ মনে করেন, ইইউ-এর সঙ্গে সম্পর্কের এই অবনতির প্রভাবও চীনের সঙ্গে বাণিজ্যে পড়েছে।

চীনের দিক থেকে ইউরোপের কিছু প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ ভিয়েতনাম বা অন্য কোনো দেশের দিকে সরে যাওয়ার তৃতীয় কারণ তাদের ‘জিরো কোভিড’ নীতি। উহানে কোভিড-১৯-এর প্রাদূর্ভাবের পর থেকেই মহামারি রোধে সর্বাত্মক প্রয়াস শুরু করে চীন। কোভিড পরিস্থিতি মোটামুটি স্থিতিশীল হওয়ার পর ধীরে ধীরে স্বাভাবিকতা ফিরছিল। তবে সম্প্রতি আবার কোভিড সংক্রমণ দেখা দেয়ায় আবার বিভিন্ন শহরে লকডাউন শুরু হয়। এমনকি রাজধানী বেইজিংয়েরও বড় একটা অংশ লকডাউনের কারণে অবরুদ্ধ ছিল কয়েক মাস। ফলে জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই দেশের অর্থনীতিতে মহামারির প্রভাব ব্যাপকভাবেই পড়েছে।

বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চীনের স্বাভাবিক বার্ষিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫.৫ হলেও চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে তা কমে ৪.৮-এ নেমেছে। ফিচ সলিউশনের ‘এশিয়া কান্ট্রি রিস্ক’-এর প্রধান রাফায়েল মক মনে করেন, মূলত এসব কারণেই চীন থেকে সরে ভিয়েতনাম এবং ভিয়েতনামের মতো স্বল্প খরচে পণ্য উৎপাদনে সক্ষম দেশগুলোর দিকে ঝুঁকছে ইউরোপের কিছু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান।

চীনের অর্থনীতির এই খারাপ সময়ে ভিয়েতনাম এগিয়েছে তরতরিয়ে। বেশ কয়েকটি কারণে বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হয়েছে তাদের প্রতি। ভিয়েতনামে শ্রমিকের মজুরি এখনো চীনের চেয়ে অনেক কম। গত কয়েক বছরে সে দেশের সমাজতান্ত্রিক সরকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন-ব্যয়ও অনেকটা বাড়িয়েছে। এসব কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নও দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যে আগের তুলনায় অনেক বেশি আগ্রহী। ২০২০ সালে ভিয়েতনামের সঙ্গে মুক্ত-বাণিজ্য চুক্তি করে ইইউ। নয় কোটি ৬২ লাখ মানুষের দেশটিতে ইউরোপের কিছু ফার্মের বিনিয়োগে আগ্রহী হওয়ার এটিও অন্যতম কারণ। ২০১২ সালে ইইউ-ভিয়েতনাম যৌথ বাণিজ্য ছিল ২০.৮ বিলিয়ন ডলারের, ২০২১ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৪৯ বিলিয়ন ডলার।
-ডয়চে ভেলে