১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর : কেমন ছিল ঢাকা

 

জয়ন্ত আচার্য

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে ঢাকা ছিল এক অদ্ভুত নগরী । একই সঙ্গে বিজয়ের উল্লাসে মুখর, আবার গভীর শোক ও ক্ষতের ভারে নত। এটি ছিল এমন একটি শহর, যেখানে সকাল শুরু হয়েছিল অনিশ্চয়তা নিয়ে, দুপুর গড়িয়েছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আত্মসমর্পণের ঘোষণায়, আর সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে জন্ম নিয়েছিল একটি নতুন রাষ্ট্রের রাজধানী। এই ঢাকা কোনো সাধারণ দিনের ঢাকা নয়; এটি ছিল যুদ্ধশেষে দাঁড়িয়ে থাকা এক আহত কিন্তু বিজয়ী নগর, যার অলিগলিতে তখনও শুকায়নি রক্ত, যার আকাশে তখনও ভাসছিল বারুদের গন্ধ, অথচ যার মানুষের চোখে জ্বলছিল স্বাধীনতার দীপশিখা।

১৬ ডিসেম্বরের আগের কয়েক সপ্তাহ ঢাকা ছিল কার্যত একটি অবরুদ্ধ শহর। পাকিস্তানি সামরিক শাসনের শেষ দিনগুলোতে রাজধানী ঢাকায় ছিল কারফিউ, খাদ্যসংকট, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং সর্বব্যাপী ভয়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী জানত, তাদের পরাজয় অনিবার্য; ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর যৌথ আক্রমণে পূর্ববাংলার প্রায় সব জেলা মুক্ত হয়ে গেছে। ঢাকা তখন একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ চারদিক থেকে ঘিরে ধরা, আকাশপথে অবরুদ্ধ, নদীপথে নিয়ন্ত্রিত। ঢাকাবাসী বুঝতে পারছিল, বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে, কিন্তু কখন এবং কীভাবে কেউ নিশ্চিতভাবে জানত না।

সেদিন ঢাকার রাস্তাঘাট ছিল অস্বাভাবিক নীরব। দোকানপাট বন্ধ, যানবাহন সীমিত, মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রিত। পাকিস্তানি সেনাদের টহল ছিল চোখে পড়ার মতো, কিন্তু তাদের চেহারায় আগের মতো দম্ভ ছিল না; বরং ছিল ক্লান্তি ও পরাজয়ের ছাপ। অনেক জায়গায় দেখা যায়, তারা তড়িঘড়ি করে কাগজপত্র পোড়াচ্ছে, সামরিক সরঞ্জাম গুছিয়ে নিচ্ছে, কিছু ক্ষেত্রে লুটপাটও করছে। শহরের বিভিন্ন সরকারি ভবন, সামরিক স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে তারা শক্ত অবস্থান নিলেও মনোবল ভেঙে পড়েছিল।

এই ঢাকা কয়েক মাস আগেও দেখেছে ভয়াবহ গণহত্যা। ২৫ মার্চের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, পুরান ঢাকা, মিরপুর, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের স্মৃতি তখনও তাজা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো, বিশেষ করে জগন্নাথ হল, ইকবাল হল ও রোকেয়া হলের আশপাশ ছিল গণহত্যার নীরব সাক্ষী। বহু শিক্ষক, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী শহীদ হয়েছেন। সেই স্মৃতির ভার নিয়েই ঢাকা পৌঁছেছিল ডিসেম্বরের মাঝামাঝি।

১৬ ডিসেম্বরের সকাল শুরু হয় চাপা উত্তেজনা দিয়ে। শহরের মানুষ রেডিওর দিকে কান পেতে ছিল। পাকিস্তানি বেতার কেদ্র থেকে তখনও বিভ্রান্তিকর ঘোষণা আসছিল, কিন্তু বিদেশি বেতার ও গোপন সূত্রে খবর ছড়াচ্ছিল আত্মসমর্পণের আলোচনা চলছে। রামনা রেসকোর্স ময়দানে কিছু একটা ঘটবে এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। যদিও সাধারণ মানুষ সেখানে যাওয়ার সুযোগ পায়নি, তবু শহরের বাতাসে ছিল এক ধরনের অপেক্ষা।

দুপুরের দিকে যখন আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর নিশ্চিত হয়, তখন ঢাকা যেন এক মুহূর্তে বদলে যায়। দীর্ঘ নয় মাসের আতঙ্ক, দমন-পীড়ন ও অনিশ্চয়তার পর মানুষ প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। অনেকেই ঘর থেকে বের হয়ে আসে, কেউ কাঁদে, কেউ আল্লাহর কাছে সিজদায় পড়ে, কেউ আবার রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপরিচিত মানুষকে জড়িয়ে ধরে। এই আবেগ ছিল অকল্পনীয় , ছিল গভীর, ছিল নিয়ন্ত্রণহীন।

রামনা রেসকোর্সে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ কে নিয়াজি যখন আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন, তখন ঢাকার মানুষ সরাসরি সেই দৃশ্য দেখতে না পেলেও এর অভিঘাত শহরের প্রতিটি ইট-পাথরে ছড়িয়ে পড়ে। এটি ছিল উপনিবেশিক ও সামরিক শাসনের দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি। ঢাকা আর পূর্ব পাকিস্তানের প্রদেশিক রাজধানী নয়; ঢাকা এখন স্বাধীন বাংলাদেশের হৃদয়।

তবে এই বিজয়ের মুহূর্তে ঢাকার চিত্র ছিল দ্বৈত। একদিকে আনন্দের ঢল, অন্যদিকে শোকের পাহাড়। বহু পরিবার তখনও তাদের প্রিয়জনের খোঁজ পায়নি। অসংখ্য মানুষ নিখোঁজ, বন্দি, নির্যাতিত। হাসপাতালগুলোতে ভর্তি ছিল আহত মুক্তিযোদ্ধা ও বেসামরিক মানুষ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতালসহ বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে তখনও যুদ্ধের ক্ষত বহন করা মানুষদের ভিড়। ওষুধের সংকট, চিকিৎসকের অভাব, বিদ্যুৎ বিভ্রাট—সব মিলিয়ে চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল নাজুক।
ঢাকার অবকাঠামোও ছিল ক্ষতিগ্রস্থ অনেক সড়ক ভাঙাচোরা, কিছু সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্থ রেল যোগাযোগ আংশিকভাবে অচল। বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিয়মিত, পানির সংকট প্রকট। যুদ্ধের শেষ দিকে পাকিস্তানি বাহিনী পরিকল্পিতভাবে কিছু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল, যাতে নতুন রাষ্ট্রের প্রসাশনের দুর্বল হয়ে পড়ে। টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছিল। প্রশাসনিক নথি নষ্ট বা সরিয়ে ফেলা হয়েছিল অনেক জায়গায়।

১৬ ডিসেম্বরের ঢাকায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ছিল চ্যালেঞ্জিং। পাকিস্তানি প্রশাসন কার্যত ভেঙে পড়েছিল, আর নতুন প্রশাসনিক কাঠামো তখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনী যৌথভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছিল। কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্ন লুটপাট বা বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটলেও সামগ্রিকভাবে শহরের মানুষ শৃৃখলা বজায় রাখার চেষ্টা করেছিল, কারণ তারা জানত এই স্বাধীনতা সহজে আসেনি।
এই দিনের ঢাকায় নারীদের অভিজ্ঞতা ছিল বিশেষভাবে বেদনাদায়ক। যুদ্ধকালে নির্যাতিত অসংখ্য নারী তখনও মানসিক ও শারীরিক ক্ষত নিয়ে বেঁচে ছিলেন। অনেক নারী পরিবার ও সমাজের ভয়ে চুপ করে ছিলেন, কেউ কেউ আশ্রয় নিয়েছিলেন শরণার্থী শিবির বা আত্মীয়ের বাড়িতে। ১৬ ডিসেম্বর তাদের জন্যও মুক্তির দিন, কিন্তু সেই মুক্তির সঙ্গে ছিল গভীর লজ্জা, ভয় ও অনিশ্চয়তা। পরবর্তী সময়ে ‘বীরাঙ্গনা’ শব্দটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলেও, সেই মুহূর্তে ঢাকায় তাদের জীবন ছিল নিঃসঙ্গ ও জটিল।
ঢাকার বুদ্ধিজীবী সমাজের জন্য ১৬ ডিসেম্বর ছিল অসম্পূর্ণ বিজয়ের দিন। মাত্র দু’দিন আগে, ১৪ ডিসেম্বর, শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, লেখকসহ বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়। রায়েরবাজার ও মিরপুর বধ্যভূমিতে পাওয়া যায় তাদের নিথর দেহ। এই ক্ষতি ঢাকার মেধাবী সমাজকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিজয়ের আনন্দের মাঝেও এই শোক ঢাকার আকাশকে ভারী করে রেখেছিল।

শহরের অর্থনৈতিক জীবন তখন প্রায় স্থবির। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ, ব্যাংকিং ব্যবস্থা অচল, বাজারে দ্রব্যমূল্যের অস্থিরতা। বহু মানুষ চাকরি হারিয়েছিল, বহু পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছিল। শরণার্থী হিসেবে ভারতে আশ্রয় নেওয়া প্রায় এক কোটির মতো মানুষ ধীরে ধীরে ফিরতে শুরু করলে ঢাকার ওপর চাপ আরও বাড়ে। বাসস্থান, খাদ্য, কর্মসংস্থান সবকিছুর সংকট প্রকট হয়ে ওঠে।

তবু এই সব সংকটের মাঝেও ১৬ ডিসেম্বরের ঢাকা ছিল আশার শহর। মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল, তারা নিজেদের রাষ্ট্র গড়বে, নিজেদের মতো করে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে। শহরের দেয়ালে দেয়ালে লেখা হতে থাকে স্বাধীনতার শ্লোগান, বাংলাদেশের নাম। লাল-সবুজ পতাকা ধীরে ধীরে উড়তে শুরু করে বিভিন্ন বাড়ির ছাদে, দোকানের সামনে, গাড়িতে। এই পতাকা শুধু একটি রাষ্ট্রের চিহ্ন নয়; এটি ছিল ঢাকার মানুষের আত্মমর্যাদার প্রতীক।

এদিন সন্ধ্যা নামার পর ঢাকার আকাশে আতশবাজি নয়, কিন্তু ছিল মানুষের কণ্ঠের উচ্ছ্বাস। কেউ মিছিল করেছে, কেউ ঘরে বসে প্রার্থনা করেছে, কেউ শহীদদের কথা স্মরণ করে নীরব থেকেছে। শহরটি যেন নতুন করে নিজেকে চিনতে শুরু করেছিল। দীর্ঘদিন ধরে যে ঢাকা ছিল দখলদার বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে, সেই ঢাকা এবার নিজের মালিকানায় ফিরে আসছে এই অনুভূতিই ছিল সবচেয়ে বড়।

১৬ ডিসেম্বরের ঢাকা তাই শুধু একটি তারিখ বা একটি ঘটনার নাম নয়। এটি একটি রূপান্তরের মুহূর্ত, যেখানে একটি ্উপনিবেশিক-সামরিক নগরী রূপ নেয় স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজধানীতে। এই রূপান্তর ছিল রক্তে লেখা, যন্ত্রণায় গড়া, কিন্তু স্বপ্নে ভরা। সেই দিনের ঢাকায় আনন্দ ও বেদনা পাশাপাশি হেঁটেছে, ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।

আজ পেছন ফিরে তাকালে বোঝা যায়, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এর ঢাকা ছিল আধুনিক বাংলাদেশের জন্মক্ষণের সাক্ষী। এই শহরই পরবর্তীকালে বহন করেছে স্বাধীনতার সব অর্জন ও ব্যর্থতা, সব আশা ও হতাশা। কিন্তু সেই দিনের ঢাকায় যা সবচেয়ে প্রবল ছিল, তা হল মানুষের অটুট বিশ্বাস, যে তারা আর কখনো পরাধীন হবে না। এই বিশ্বাসই ১৬ ডিসেম্বরের ঢাকাকে ইতিহাসের পাতায় অমর করে রেখেছে।

পূর্বের খবরমেহেরপুর জেলা প্রেসক্লাবে পঞ্চম বারের মতো সভাপতি পদে তোজাম্মেল, চতুর্থবারের মতো সম্পাদক পদে মাহবুব চান্দু বিজয়ী
পরবর্তি খবরআইপিএল : সকলকে হারাল কলকাতা নাইট রাইডার্স,