বিশেষ আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন
ভিনিউজ : মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানি হামলার আশঙ্কার মধ্যেও বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ সচল রাখতে নতুন কৌশল নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মধ্যপ্রাচ্যের মিত্ররা। সামরিক নিরাপত্তার আওতায় রাতের অন্ধকারে ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে তেলবাহী ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করছে। পরে ওমান উপসাগরে অপেক্ষমাণ অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তর করে তা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হচ্ছে।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই কৌশল সাময়িক হলেও ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে এবং বিশ্ববাজারে তেলের বড় ধরনের সংকট এড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ গ্রিক মালিকানাধীন সুপারট্যাংকার কিকু। গত জুলাইয়ের শেষ দিকে কাতারের মেসাইয়িদ তেল রপ্তানি টার্মিনাল থেকে অপরিশোধিত তেল নিয়ে জাহাজটি হরমুজ প্রণালির দিকে রওনা হয়। প্রণালি অতিক্রমের সময় জাহাজটি তার এআইএস ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে দেয়। এই যন্ত্রের মাধ্যমে জাহাজের অবস্থান, গতি ও পরিচয় জানা যায়। ফলে আন্তর্জাতিক জাহাজ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় কিকু কার্যত অদৃশ্য হয়ে যায়।
পরদিন জাহাজটির সংকেত আবার দেখা যায় হরমুজ প্রণালির অপর পাশে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ উপকূলের কাছে। সেখানে আরেকটি গ্রিক ট্যাংকারের সঙ্গে কয়েক দিন ধরে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর করা হয়। পরে দ্বিতীয় জাহাজটি চীনের উদ্দেশে রওনা দেয়, আর কিকু আবার পারস্য উপসাগরে ফিরে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সহায়তায় সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল কোম্পানিগুলো এই পদ্ধতি ব্যবহার করছে। এর ফলে বাণিজ্যিক জাহাজ মালিকদের ওপর হামলা ও বিমা ঝুঁকির চাপ কমছে। একই সঙ্গে সামরিক সুরক্ষার দায়িত্ব নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র এবং তেল উৎপাদক দেশগুলো।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ৯ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহন করা হচ্ছে। জাহাজের ট্রান্সপন্ডার তথ্যের ভিত্তিতে যে পরিমাণ তেল চলাচলের হিসাব পাওয়া যায়, প্রকৃত পরিমাণ তার প্রায় দ্বিগুণ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই কৌশলের পাশাপাশি সৌদি আরব আরও বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। পারস্য উপসাগর দিয়ে পাঠানোর পরিবর্তে দেশটি প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে পাঠাচ্ছে। অন্য মধ্যপ্রাচ্যের উৎপাদকরাও হরমুজ প্রণালির বিকল্প পথে আরও প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করছে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশও উৎপাদন বাড়িয়ে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে। ব্রাজিল, গায়ানা ও ভেনেজুয়েলা মিলিয়ে প্রতিদিন ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি অতিরিক্ত তেল বাজারে সরবরাহ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রও দৈনিক কয়েক লাখ ব্যারেল উৎপাদন বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত তেল মজুত থেকে প্রায় ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছেড়েছে। চীনও নিজস্ব বিশাল মজুতের ওপর নির্ভর করছে এবং অপরিশোধিত তেল আমদানি কমিয়েছে। উচ্চমূল্যের কারণে বিশ্বব্যাপী তেলের চাহিদাও কিছুটা কমে এসেছে, যা বাজারে ভারসাম্য আনতে সহায়তা করেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। যুদ্ধের সময় বিশ্বজুড়ে তেলের মজুত প্রায় ১৯০ কোটি ব্যারেল কমে গেছে। এই মজুত পুনরায় পূরণ না করা গেলে ভবিষ্যতে নতুন সংকট দেখা দিতে পারে।
শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, ডিজেল, জেট ফুয়েল ও অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানির বাজারেও চাপ বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানিও কমেছে এবং চীন নিজস্ব চাহিদা মেটাতে জ্বালানি রপ্তানি সীমিত করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়েছে।
ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবার ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের দিকে এগোচ্ছে। তবু যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের এই নতুন কৌশল এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহ সংকটকে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করা থেকে কিছুটা হলেও ঠেকিয়ে রেখেছে।




