ক্যাপসুল সংগ্রহ ও সরবরাহে জটিলতার কারণে শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন আবারও পিছিয়ে গেছে। চলতি জুনের ১০ তারিখের মধ্যে দেশব্যাপী এই কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা থাকলেও সময়মতো ক্যাপসুল না পাওয়ায় তা সম্ভব হচ্ছে না। এতে টানা ১৪ মাসের বেশি সময় ধরে শিশুস্বাস্থ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই বিশেষ কর্মসূচিটি সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। যদিও নিয়ম অনুযায়ী বছরে দুবার এই ক্যাম্পেইন পরিচালনার কথা।
এদিকে পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘদিন ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকায় শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও পুষ্টি পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এতে রাতকানা, অপুষ্টি, হামসহ বিভিন্ন সংক্রমণজনিত রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের (আইপিএইচএন) পরিচালক ডা. মোহাম্মদ ইউনুস আলী বলেন, জুনের শুরুতে ক্যাপসুল পাওয়ার কথা ছিল। এখন ১৫ জুনের মধ্যে সরবরাহের আশ্বাস দিয়েছে ইউনিসেফ। সে অনুযায়ী আগামী ২৭ জুন ক্যাম্পেইন আয়োজনের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে সময়মতো সরবরাহ না মিললে কর্মসূচি আরও পিছিয়ে যেতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সর্বশেষ জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২৫ সালের মার্চে। এরপর গত বছরের সেপ্টেম্বর এবং চলতি বছরের মার্চে দুটি বিশেষ ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও তা আর আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। এই দীর্ঘ অচলাবস্থার কারণে দেশের প্রায় সোয়া দুই কোটি শিশু নিয়মিত ডোজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
যেভাবে তৈরি হলো এই সংকট
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুনে স্বাস্থ্য খাতের সর্বশেষ অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) শেষ হওয়ার পর নতুন কর্মপরিকল্পনা অনুমোদনে দীর্ঘ বিলম্ব হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল সংগ্রহের ওপর। প্রথমে দরপত্রের মাধ্যমে ক্যাপসুল কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে তিন দফায় দরপত্র আহ্বান করেও বাজারমূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দর এবং যথেষ্ট প্রতিযোগিতার অভাবে তা বাতিল হয়ে যায়।
পরবর্তীতে সংকট কাটাতে সরকার দরপত্র ছাড়াই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ইউনিসেফের মাধ্যমে ৭১ লাখ ক্যাপসুল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেয়। গত ১৮ মার্চ সংস্থাটিকে টিকা সংগ্রহের চিঠি এবং পরবর্তীতে ২৩ মে ১৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা বরাদ্দও দেওয়া হয়। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি ক্যাপসুল সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতেও দরপত্র ছাড়া ৪০৬ কোটি টাকার হামের টিকা ইউনিসেফের মাধ্যমে কেনার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই ভিটামিন
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ১৯ কোটি প্রাক-বিদ্যালয় বয়সী শিশু ভিটামিন ‘এ’ ঘাটতির ঝুঁকিতে রয়েছে। এই শিশুদের অধিকাংশই আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় বাস করে। ভিটামিন ‘এ’ এর অভাবে দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, রাতকানা এবং গুরুতর ক্ষেত্রে অন্ধত্ব হতে পারে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নবজাতক বিভাগের অধ্যাপক ডা. সঞ্জয় কুমার দে বলেন, ‘এক বছরের বেশি সময় ধরে ক্যাম্পেইন না হওয়ায় অনেক শিশু নির্ধারিত ডোজ পায়নি। এর প্রভাব বর্তমানে হামের সংক্রমণের ধরনেও প্রতিফলিত হতে পারে। হামে আক্রান্ত হলে শরীরের ভিটামিন ‘এ’-এর মজুত দ্রুত কমে যায়। আগে থেকেই শরীরে এই ভিটামিনের ঘাটতি থাকলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও অপুষ্টির মতো জটিলতা বাড়ে, যা শিশুর মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম মুশতাক হোসেন বলেন, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন নিয়মিত না হলে এর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা না গেলেও দীর্ঘ মেয়াদে শিশুদের পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর মারাত্মক আঘাত হানে। শিশুদের সুরক্ষায় নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্টেশন কার্যক্রম অবিলম্বে চালু করা জরুরি।
১৯৭৩ সাল থেকে শুরু
শিশুদের অন্ধত্ব ও পুষ্টিহীনতা দূর করতে ১৯৭৩ সাল থেকে দেশে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো শুরু হয়। এটি তখন জাতীয় রাতকানা রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম নামে পরিচিত ছিল। ১৯৯৫ সাল থেকে কার্যক্রমটি আরও শক্তিশালী করতে জাতীয় টিকাদান দিবসের সঙ্গে ভিটামিন ‘এ’ যুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে ২০০৩ সাল থেকে এর নাম দেওয়া হয় ‘জাতীয় ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন’। ২০১১ সালে এটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় পুষ্টিসেবা (এনএনএস) কার্যক্রমের অধীনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
প্রসঙ্গত, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ৬ থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুদের এক লাখ আইইউ এবং এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের ২ লাখ আইইউ ডোজের ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। এর সঙ্গে সাধারণত জাতীয় কৃমিনাশক সপ্তাহ পালন করা হয়ে থাকে। কারণ শরীরে কৃমি থাকলে ভিটামিন ‘এ’-র পূর্ণ শোষণ বাধাগ্রস্ত হয়। তবে গত দুই বছর ধরে নিয়মিত কৃমিনাশক সপ্তাহও পালন করা হয়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনের নতুন সম্ভাব্য তারিখ ২৭ জুন নির্ধারণ করা হয়েছে। সময়মতো ক্যাপসুল সরবরাহ পাওয়া গেলে ওই দিনই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কর্মসূচিটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে।




