বিশেষ ফিচার
ভিনিউজ : পোষ্য প্রাণী মানুষের জীবনের পরিচিত এক অংশ। কেউ সঙ্গী হিসেবে কুকুর-বিড়াল পোষেন, কেউ নিরাপত্তা বা কাজের প্রয়োজনে প্রাণী পালন করেন, আবার কারও কাছে পোষ্য পরিবারেরই সদস্য। কিন্তু অন্য প্রাণীরাও কি ভিন্ন প্রজাতির প্রাণীকে নিজের কাছে রেখে আদর-যত্ন করতে পারে? সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, শুধু মানুষ নয়, বানর জাতীয় প্রাণীদের মধ্যেও এমন প্রবণতা রয়েছে। এমনকি মানুষের পোষ্য রাখার অভ্যাসের শিকড় বহু প্রাচীন এবং এর সঙ্গে আমাদের বিবর্তনেরও যোগ থাকতে পারে।
উগান্ডার জঙ্গলে দুই ছোট শিম্পাঞ্জি ইশে ও ডেম্বেকে দীর্ঘদিন ধরে পর্যবেক্ষণ করছিলেন একদল গবেষক। একদিন গাছের ডালে খেলার সময় তাদের কাছে এসে দাঁড়ায় একটি রেড-টেইলড হনুমান। গবেষকদের আশঙ্কা ছিল, শিম্পাঞ্জি দু’টি হয়তো অপরিচিত প্রাণীটিকে আক্রমণ করবে। কিন্তু ঘটল সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা। তারা হনুমানটিকে আঘাত না করে বরং আদর করতে শুরু করে। ঘটনাটি গবেষকদের নজর কাড়ে এবং অন্য প্রাণীর প্রতি বানর জাতীয় প্রাণীদের সামাজিক ও যত্নশীল আচরণ নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করে।
এই ধরনের আচরণের আরও বহু উদাহরণ রয়েছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী সিরিল গ্রুয়েটার সাংহাইয়ের একটি চিড়িয়াখানায় একটি স্ত্রী উল্লুককে একটি ছোট ইঁদুরকে ধরে আদর করতে দেখেছিলেন। আশ্চর্যের বিষয়, ইঁদুরটিও ভয় না পেয়ে উল্লুকটির সান্নিধ্য উপভোগ করছিল। ওই ঘটনা থেকেই গ্রুয়েটারের মনে প্রশ্ন জাগে-মানুষ কেন ভিন্ন প্রজাতির লোমশ প্রাণীকে এত সহজে নিজের পরিবারের অংশ করে নেয়? এই আচরণ কি শুধু মানুষের বৈশিষ্ট্য, নাকি এর বিবর্তনীয় শিকড় আরও গভীরে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গ্রুয়েটার ও তাঁর সহকর্মীরা ৮৮টি বানরজাতীয় প্রাণীর আচরণ বিশ্লেষণ করেন। গবেষণায় দেখা যায়, বন্দিদশায় থাকা প্রাণীর পাশাপাশি জঙ্গলে বসবাসকারী বানরদের মধ্যেও অন্য প্রজাতির প্রাণীকে কাছে টেনে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। টিকটিকি, পাখি, কাঠবিড়ালি কিংবা মুরগির মতো প্রাণীকেও কখনও কখনও তারা যত্ন করতে দেখা গেছে। কোথাও কোনও শিশু প্রাণীকে বানরদের সঙ্গে খেলতে দেখা গেছে, আবার কোথাও স্ত্রী বানরকে অন্য প্রজাতির প্রাণীকে লালন করতে দেখা গেছে।
একটি ঘটনায় একটি বানরের খাঁচায় ঢুকে পড়েছিল একটি মুরগি। বানরটি মুরগিটিকে তাড়িয়ে না দিয়ে বরং মাসের পর মাস তার যত্ন নেয়। এই ধরনের ঘটনা গবেষকদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে বোঝা যায়, অন্য প্রজাতির প্রাণীর প্রতি যত্নশীল আচরণ কেবল খাবার, শিকার বা তাৎক্ষণিক সুবিধার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এর পেছনে সামাজিকতা, সঙ্গের প্রয়োজন কিংবা পরিচর্যার স্বাভাবিক প্রবণতাও কাজ করতে পারে।
ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট অব অ্যানিম্যাল বিহেভিয়ারের গবেষক জো গোল্ডসবরোর মতে, প্রাচীনকালে মানুষ পোষ্য রাখত শিকার ধরতে সাহায্য পাওয়া, আত্মরক্ষা কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনের কারণে। তবে মানুষের মধ্যে জীবন্ত প্রাণীর যত্ন নেওয়ার একটি স্বাভাবিক প্রবণতাও রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সেই প্রবণতা বদলে গিয়ে পোষ্যকে শুধু কাজের সহযোগী নয়, বরং পরিবারের সদস্য হিসেবেও গ্রহণ করার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।
প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণও এই ধারণাকে কিছুটা সমর্থন করে। প্রায় ১৪ হাজার বছর আগে জার্মানিতে একটি কবর থেকে এক নারী ও এক পুরুষের দেহাবশেষের সঙ্গে একটি কুকুরের দেহাবশেষ পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, প্রিয় পোষ্যের সঙ্গেই ওই দম্পতিকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। তবে এরও আগে মানুষ পোষ্য রাখত কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।
পশু আচরণ বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পোষ্য রাখার প্রবণতার সঙ্গে একাকিত্ব দূর করার বিষয়টিও জড়িত হতে পারে। মানুষ যেমন প্রাণীর সঙ্গ পেয়ে মানসিক স্বস্তি অনুভব করে, তেমনই কিছু বানরজাতীয় প্রাণীও অন্য প্রজাতির প্রাণীর উপস্থিতিতে সামাজিক সঙ্গ খুঁজে পেতে পারে। অবশ্য সব বানর একই আচরণ করে না। কিছু পুরুষ বানর অপরিচিত প্রাণী দেখলে আক্রমণাত্মকও হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ বিষয়টি সর্বজনীন নিয়ম নয়; প্রাণীর ব্যক্তিত্ব, বয়স, লিঙ্গ, পরিবেশ ও পরিস্থিতির ওপর আচরণ বদলে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে গবেষণাটি মানুষের পোষ্যপ্রেমকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ দিয়েছে। পোষ্য রাখা হয়তো কেবল আধুনিক সভ্যতার তৈরি কোনও অভ্যাস নয়। অন্য প্রাণীর যত্ন নেওয়া, সঙ্গ খোঁজা এবং ভিন্ন প্রজাতির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার প্রবণতা হয়তো বিবর্তনের অনেক পুরোনো অধ্যায়। মানুষ সেই প্রবণতাকে ঘর, পরিবার ও আবেগের সঙ্গে যুক্ত করে একটি বিশেষ সংস্কৃতিতে রূপ দিয়েছে। আর বানরদের আচরণ যেন মনে করিয়ে দেয়-ভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর প্রতি মমতা দেখানোর গল্পটি শুধু মানুষের নয়, প্রকৃতির আরও অনেক প্রাণীর মধ্যেই তার চিহ্ন রয়েছে।




