জয়ন্ত আচার্য
সিনিয়র সাংবাদিক ও গবেষক প্রাচীন কালের দুর্গা প্রতিমা
সম্পাদকীয় কলাম
ভিনিউজ : শারদীয় দুর্গোৎসব বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, আবেগ ও আনন্দের এক অনন্য প্রকাশ। শরতের নীল আকাশ, সাদা কাশফুল, শিউলির সুবাস আর ঢাকের শব্দে বাংলার প্রকৃতি যখন উৎসবের সাজে সেজে ওঠে, তখন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মধ্যে তৈরি হয় এক ভিন্ন আবহ। হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা হলেও কালের বিবর্তনে এটি বাঙালির বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের মতো বহুধর্মীয় ও বহুসাংস্কৃতিক সমাজে দুর্গোৎসব তাই শুধু পূজা-অর্চনার আয়োজন নয়, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহাবস্থান ও সম্প্রীতিরও এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
দুর্গাপূজার ইতিহাসের শিকড় প্রাচীন ভারতীয় ধর্মীয় ও পৌরাণিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। দেবী দুর্গা শক্তি, সাহস ও অশুভ শক্তির বিনাশের প্রতীক। পৌরাণিক কাহিনিতে মহিষাসুরকে পরাজিত করে দেবতাদের রক্ষা করেছিলেন দেবী দুর্গা। সেই কাহিনির অন্তর্নিহিত শিক্ষা হলো অন্যায়, অশুভ ও অসুরত্বের বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়। শাস্ত্রীয় বিধানে বসন্তকালে দুর্গাপূজার প্রচলন থাকলেও রামচন্দ্রের শরৎকালে দুর্গার আরাধনার কাহিনি থেকে শারদীয় দুর্গোৎসবের বিশেষ জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছে। এই পূজাই পরিচিত হয়েছে অকালবোধন নামে। কৃত্তিবাসী রামায়ণে এই কাহিনির বিস্তৃত বর্ণনা বাংলার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরম্পরাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে।
বাংলায় দুর্গাপূজার ইতিহাসও বেশ সমৃদ্ধ। মধ্যযুগে রাজপরিবার ও জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্গাপূজার বিস্তার ঘটে। রাজশাহীর তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণের পূজা বাংলায় আড়ম্বরপূর্ণ দুর্গোৎসবের ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পরবর্তী সময়ে কলকাতার বনেদি পরিবারগুলোতে দুর্গাপূজার আয়োজন সামাজিক মর্যাদা ও প্রভাবের প্রতীক হয়ে ওঠে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই উৎসব রাজবাড়ি ও জমিদারবাড়ির সীমানা অতিক্রম করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ১৭৯০ সালে হুগলির গুপ্তিপাড়ায় বারোজনের সম্মিলিত উদ্যোগে বারোয়ারি পূজার যে প্রচলন শুরু হয়েছিল বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে, তা পরবর্তী সময়ে সর্বজনীন দুর্গাপূজার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই দুর্গোৎসব ক্রমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের উৎসবে পরিণত হয়।

দুর্গোৎসবের সঙ্গে বাংলার রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী ইতিহাসেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় দেবী দুর্গার শক্তির প্রতীকী রূপ জাতীয়তাবাদী চেতনাকে জাগ্রত করতে ব্যবহৃত হয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বন্দেমাতরম, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভারতমাতা এবং ঋষি অরবিন্দের দুর্গাস্তোত্রে মাতৃশক্তির যে প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে, তা স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে সাংস্কৃতিক ও আবেগিক শক্তি জুগিয়েছে। ফলে দুর্গাপূজা কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বাংলার সমাজ, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক জাগরণের ইতিহাসেও এর বিশেষ স্থান তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে দুর্গোৎসবের তাৎপর্য আরও ব্যাপক। এ দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে এটি সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হলেও উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে সব সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে। পূজামণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড়, আলোকসজ্জা, প্রতিমা নির্মাণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সংগীত, নৃত্য ও নানা আয়োজন ধর্মীয় সীমানা অতিক্রম করে সামাজিক মিলনমেলায় পরিণত হয়। অনেক জায়গায় সকল সম্প্রদায়ের মানুষ একে অন্যের উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেন। এই অংশগ্রহণই বাংলাদেশের সামাজিক সম্প্রীতির একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।
এ বছর সারা দেশে ত্রিশ হাজারের বেশি পূজামণ্ডপে দুর্গোৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। উৎসবকে কেন্দ্র করে পাঁচ দিনের সরকারি ছুটির ঘোষণাও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এটি শুধু একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উৎসবের স্বীকৃতি নয়, বরং রাষ্ট্রের বহুত্ববাদী সামাজিক কাঠামো ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান জানানোরও একটি প্রকাশ। তবে উৎসবের প্রকৃত সার্থকতা কেবল ছুটি, আলোকসজ্জা কিংবা মণ্ডপের সংখ্যায় নির্ধারিত হয় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং নির্বিঘ্নে নিজস্ব বিশ্বাস ও ঐতিহ্য পালনের অধিকার।
এখানেই রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। দুর্গোৎসবসহ সব ধর্মীয় উৎসব যাতে নির্বিঘ্নে পালিত হয়, সে জন্য প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে উৎসবকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের বিদ্বেষ, উসকানি কিংবা সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সুযোগ যেন কেউ নিতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ কিংবা সংখ্যালঘু পরিচয় নয়, নাগরিক হিসেবে সবার সমান মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠাই হওয়া উচিত আমাদের সামাজিক অঙ্গীকার।
দুর্গাপূজার মূল দর্শন অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভশক্তির প্রতিষ্ঠা। সেই দর্শনকে বাস্তব জীবনে ধারণ করাই হওয়া উচিত উৎসবের প্রধান শিক্ষা। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটলেও মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির বন্ধন যেন বিসর্জিত না হয়। উৎসবকে কেন্দ্র করে আমাদের প্রার্থনা হোক, সমাজ থেকে হিংসা, বিদ্বেষ, বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতা দূর হোক। ধর্ম যার যার, উৎসবের আনন্দ ও মানবিকতা সবার, এই চেতনাই হোক বাংলাদেশের পথচলার শক্তি। দুর্গোৎসব তাই শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি হোক সার্বজনীন মানবিকতা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল মেলবন্ধন।




