যুদ্ধবিরতি সাময়িক স্বস্তির কারণ হলেও দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে

 

-জেরেমি বোয়েন
-আন্তর্জাতিক সম্পাদক

ভিনিউজ : ইরানের সভ্যতা ‘আজ রাতেই ধ্বংস হয়ে যাবে’ এমন হুমকি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এর এক দিনের মধ্যেই সেখান থেকে সরে গিয়ে পাকিস্তানে আলোচনার জন্য ইরানের দশ দফা পরিকল্পনাকে ‘কার্যকর’ ভিত্তি হিসেবে ঘোষণা করেন তিনি।

এই যুদ্ধবিরতি মূলত মধ্যপ্রাচ্যের সেই সব বেসামরিক নাগরিকদের জন্য স্বস্তি নিয়ে এসেছে, যারা ২৮ শে ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে লাগাতার হামলার মধ্যে ছিল।

তবে লেবাননের জনগণকে এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। যুদ্ধবিরতি লেবাননের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বলে দাবি করে সেখানে বড় পরিসরে প্রাণঘাতী বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। এই স্বস্তি অন্যত্রও হয়তো বেশিদিন টিকবে না।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র, দু’পক্ষেরই যুদ্ধ শেষ করার জোরালো কারণ রয়েছে। কিন্তু প্রকাশ্যে তাদের অবস্থানের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ রয়েছে। পরস্পরকে বিশ্বাস না করা এমন দুটি পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টার জন্য হাতে দুই সপ্তাহ সময় রয়েছে।

বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ফলো করতে এখানে ক্লিক/ট্যাপ করুন

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর তেহরানের ইনকিলাব স্কয়ারে ইরানিদের প্রতিক্রিয়াছবির উৎস,Getty Images
ছবির ক্যাপশান,যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর তেহরানের ইনকিলাব স্কয়ারে ইরানিদের প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে.ডি. ভ্যান্স এই যুদ্ধবিরতিকে ‘ভঙ্গুর সমঝোতা’ বলে বর্ণনা করেছেন। এটিকে বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন বলা যায়। দুই পক্ষই একই সাথে নিজেদের বিজয় দাবি করছে, যা ততটা বাস্তবসম্মত নয়।

 

তার ভাষায়, “বিশ্বের শীর্ষ পর্যায়ের সন্ত্রাসে পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র নিজেদের, তাদের জনগণ বা ভূখণ্ড রক্ষা করতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে”। অন্যদিকে তেহরান থেকেও একই ধরনের জোরালো দাবি করা হচ্ছে। সেখানেও শাসকগোষ্ঠীও এই সংঘাতে নিজেদের বড় বিজয় দাবি করছে।

ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, “বিশ্ব ক্ষমতার এক নতুন কেন্দ্রকে স্বাগত জানিয়েছে, এবং ইরানের যুগ শুরু হয়েছে”।

ট্রাম্পের সমর্থকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা তাদেরকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করেছে। তাদের দাবি, প্রেসিডেন্টের বক্তব্য ছিল আলোচনার জন্য কৌশলগত চাপ তৈরি করার অংশ। তবে তার কিছু হুমকি এমনও ছিল, যা যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে বিবেচিত হতে পারত।

অন্যদিকে ইরানিরা বিশ্বাস করে যে, মার্কিন ও ইসরায়েলি শক্তির বিরুদ্ধে তাদের শাসকগোষ্ঠীর দৃঢ়তা ও প্রতিরোধ, পাশাপাশি এখনো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করতে পারা এবং ও হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা আমেরিকাকে তাদের দশ-দফা পরিকল্পনার ভিত্তিতে আলোচনায় আসতে বাধ্য করেছে।

এই পরিকল্পনায় এমন কিছু শর্ত রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মেনে নেওয়া কঠিন, ঠিক যেমন ইরানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের শর্তগুলো মেনে নেওয়া কঠিন।

ইরানের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সামরিক নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি, ক্ষতিপূরণের দাবি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করা।

দুই পক্ষ ইসলামাবাদে গেলে পাকিস্তান একটি স্থায়ী চুক্তি করাতে পারবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে এই যুদ্ধ ও এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে নতুনভাবে বদলে দিচ্ছে।

ইরানের ওপর হামলার নির্দেশ দেওয়ার সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, দুজনই বলেছিলেন যে ইরানে শাসন পরিবর্তন আসছে। কিন্তু তা বাস্তবে ঘটেনি।

যদিও ট্রাম্প ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যাকে নতুন শাসনের সূচনা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন। ইরানের অভ্যন্তরে যারা তাদের শাসকদের পতনের আশা করছিল, তারা যুদ্ধের সম্ভাব্য এই পরিণতিতে আশ্বস্ত হবে না।

যে শাসনব্যবস্থার পতন হবে বলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বলেছিল, সেটিই এখন তাদের সাথে আলোচনায় পূর্ণ অংশীদার হতে যাচ্ছে। ইরান এই সুযোগে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করবে। অথচ মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও ট্রাম্প ওই শাসনব্যবস্থার নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ দাবি করেছিলেন।

ইসলামাবাদের আলোচনা জেনেভার আগেকার আলোচনা থেকে কতটা ভিন্ন হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। জেনেভায় যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আলোচনার অগ্রগতি হচ্ছে বলে মনে হচ্ছিলো, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় হামলা শুরু করে।

জেনেভায় মূলত পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে নতুন চুক্তির বিষয়ে আলোচনা হচ্ছিল, যার মধ্যে ছিল ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদের ভবিষ্যৎ, যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে।

ইসলামাবাদের আলোচনায় এখন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে হরমুজ প্রণালি। এটি এখন ইরানের জন্য প্রতিরোধের ও কৌশলগত চাপের নতুন হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি আবার যুদ্ধে জড়ায়, ইরান দেখিয়ে দিয়েছে যে তারা সহজেই তা রুখে দিতে পারে, যা বিশ্বের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা সৃষ্টি করতে সক্ষম।

পূর্বের খবরশেরপুর-৩ উপ নির্বাচন : জাল ভোটের অভিযোগ তুলে জামায়াত প্রার্থীর ভোট বর্জন
পরবর্তি খবরসানেমের গবেষণা : জ্বালানির ধাক্কায় মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে ৪ শতাংশ
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!