মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি: ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সবচেয়ে তীব্র’ হামলার প্রস্তুতি

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নতুন করে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে যাচ্ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন জানিয়েছে, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে আজই হতে পারে সবচেয়ে তীব্রতম দিন। একই সময় ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলায় পুরো অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে।

পেন্টাগনে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ইরানে চলমান সামরিক অভিযানে আজ সবচেয়ে বেশি যুদ্ধবিমান, বোমারু বিমান ও আক্রমণাত্মক সক্ষমতা ব্যবহার করা হবে। তার ভাষায়, “আজকের দিনটি হবে অভিযানের সবচেয়ে তীব্রতম ধাপ।”

তিনি আরও জানান, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গত ২৪ ঘণ্টায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমেছে। একই তথ্য তুলে ধরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বলেন, সংঘাতের শুরুর সময়ের তুলনায় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে। পাশাপাশি একমুখী ড্রোন হামলার হারও ৮৩ শতাংশ কমেছে বলে দাবি করেন তিনি।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই বক্তব্যের বিপরীতে ইরান বলছে, তারা যুদ্ধবিরতি চায় না এবং আগ্রাসনের জবাব দিতেই তাদের এই লড়াই অব্যাহত থাকবে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “আমরা যুদ্ধবিরতি চাই না। আগ্রাসনকারীদের এমন জবাব দেওয়া হবে যাতে ভবিষ্যতে তারা আর কখনো ইরানে হামলার কথা ভাবতে না পারে।”

তেহরানে নতুন করে বিমান হামলা
এদিকে ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা ইরানের রাজধানী তেহরানে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে। শহরের পূর্ব ও পশ্চিম অংশে বিস্ফোরণ ও ধোঁয়া দেখা গেছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, তাদের সামরিক অভিযানে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা “গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে”। তিনি বলেন, ইরানি জনগণকে “নিপীড়নমূলক শাসন থেকে মুক্ত করার” লক্ষ্যেই এই অভিযান চলছে।

অন্যদিকে ইরানের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটিতে নিহতের সংখ্যা এক হাজার ৩৩২ জনে পৌঁছেছে। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির সরকার। তেহরানের বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ইরান।

উপসাগরীয় অঞ্চলেও হামলার বিস্তার
এই সংঘাত শুধু ইরান ও ইসরায়েলেই সীমাবদ্ধ নেই; পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে। কাতারের রাজধানী দোহায় কয়েকটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করেছে।

এদিকে সৌদি আরব, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতও জানিয়েছে যে তারা ইরান থেকে আসা একাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে। বাহরাইনের রাজধানী মানামায় এক হামলায় একজন নারী নিহত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।

ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় শহর ইরবিলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কনস্যুলেটকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার ঘটনাও ঘটেছে, যদিও এতে কেউ হতাহত হয়নি।

আঞ্চলিক উত্তেজনা ও কূটনৈতিক তৎপরতা
এদিকে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়তে থাকায় বিভিন্ন দেশ কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ইরানকে সতর্ক করে বলেছেন, তুরস্কের আকাশসীমা লঙ্ঘনের কোনো ন্যায্যতা নেই। তিনি একই সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন।

অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা কমাতে কিছু তেল-সম্পর্কিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কথা বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি সংঘাত আরও বিস্তৃত হয় এবং হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হয়, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

মানবিক সংকটের আশঙ্কা
সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে মানবিক পরিস্থিতিও দ্রুত অবনতির দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। লেবাননসহ আশপাশের দেশগুলোতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হচ্ছে। বৈরুতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস তাদের নাগরিকদের দেশ ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের এই ত্রিমুখী সংঘাত যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে এটি মধ্যপ্রাচ্যে একটি বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে—যার প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে।

-বিবিসি / সিএনএন / আল জাজিরা অবলম্বনে

 

পূর্বের খবররেশনিং পদ্ধতির জ্বালানী ঈদযাত্রায় ভোগান্তি ও ভাড়া নৈরাজ্য উস্কে দিবে— যাত্রী কল্যাণ সমিতি
পরবর্তি খবরভারত থেকে পাইপলাইনে এলো ৫ হাজার টন ডিজেল
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!