ব্রাজিলের নির্বাচনের ফলাফল : লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক গতিপথেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে

ব্রাজিলের নির্বাচনের ফলাফল : লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক গতিপথেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে

বিশেষ প্রতিবেদন :

ভিনিউজ : ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে দেশটির রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে নতুন মেরুকরণ। একদিকে বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা, অন্যদিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারো। রোববারের দ্বিতীয় দফার ভোটে এই দুই নেতার লড়াই শুধু ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণ করবে না, বরং লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক গতিপথেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে অঞ্চলজুড়ে ডানপন্থী রাজনীতির উত্থানের মধ্যে ব্রাজিল কোন দিকে ঝুঁকবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

৮০ বছর বয়সী লুলা চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। কয়েক দশক ধরে ব্রাজিলের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে আসা এই নেতা প্রথম দিকে জনমত জরিপে এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু প্রথম দফার ভোটে প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল করে সবাইকে চমকে দেন ৪৫ বছর বয়সী ফ্লাভিও বলসোনারো। ফলে সরাসরি জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় দুই প্রার্থীকে দ্বিতীয় দফার লড়াইয়ে নামতে হয়েছে।

ব্রাজিলের সুপিরিয়র ইলেক্টোরাল কোর্টের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দফায় লুলার চেয়ে প্রায় ২২ লাখ ভোট বেশি পেয়েছিলেন ফ্লাভিও। এই ফল লুলার নির্বাচনী অবস্থানের দুর্বলতা যেমন সামনে এনেছে, তেমনি সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর রাজনৈতিক প্রভাব যে এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী, সেটিও স্পষ্ট করেছে। ২০২২ সালের নির্বাচনে পরাজয় মেনে নিতে না চাওয়ায় বর্তমানে কারাবন্দি রয়েছেন জাইর বলসোনারো। তবে তার রাজনৈতিক অনুসারীরা এখনো সক্রিয়।

নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে অপরাধ, দুর্নীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়। সেপ্টেম্বরের কোয়েস্ট/প্যাক্স জরিপে ২৮ শতাংশ ব্রাজিলীয় সহিংসতাকে দেশের প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। দুর্নীতিকে প্রধান সমস্যা বলেছেন ২২ শতাংশ এবং অর্থনীতিকে ১৯ শতাংশ।

অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ফ্লাভিও। তিনি বড় অপরাধী চক্রগুলোকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা, কারাগারের সংখ্যা বাড়ানো এবং অপরাধের দায়ে বিচারের ক্ষেত্রে বয়সসীমা ১৮ থেকে কমিয়ে আনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বিপরীতে লুলা অপরাধীদের পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্ব দিলেও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার দাবির মুখে তাকে অবস্থান পরিবর্তন করতে হচ্ছে। নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধমূলক দায়বদ্ধতার বয়স ১৮ থেকে ১৬ বছরে নামানোর বিষয়ে তাঁর সমর্থনের ইঙ্গিত রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

অর্থনীতিও লুলার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তার প্রথম দুই মেয়াদে পণ্য রপ্তানির অনুকূল পরিস্থিতি ও সামাজিক কর্মসূচির কারণে লাখো মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছিল। এবার বেকারত্ব কমা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসার মতো ইতিবাচক সূচক থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। অনেকের ধারণা, অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুফল তাদের জীবনে যথেষ্ট প্রতিফলিত হচ্ছে না।

নির্বাচনে নারী ভোটাররাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। ব্রাজিলের মোট নিবন্ধিত ভোটারের প্রায় ৫৩ শতাংশ নারী। ১৫ অক্টোবরের দাতাফোলহা জরিপে নারীদের মধ্যে লুলা ৪৯ শতাংশ এবং ফ্লাভিও ৪০ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন। অন্যদিকে পুরুষ ভোটারদের মধ্যে ফ্লাভিও ৫২ শতাংশ এবং লুলা ৪০ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন।

নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও নারীহত্যার ঘটনাও নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। ব্রাজিলিয়ান ফোরাম অন পাবলিক সেফটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটিতে ১ হাজার ৫৭১টি নারীহত্যার ঘটনা ঘটেছে, যা ২০১৫ সালে অপরাধটি আইনে সংজ্ঞায়িত হওয়ার পর সর্বোচ্চ।

সব মিলিয়ে ব্রাজিলের এবারের নির্বাচন হয়ে উঠেছে দুই ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শনের পরীক্ষা। লুলা তার সামাজিক উন্নয়ন ও কল্যাণমূলক রাজনীতির উত্তরাধিকার ধরে রাখতে চান। অন্যদিকে ফ্লাভিও বাবার রাজনৈতিক ভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে ডানপন্থী শক্তির নতুন বিজয় নিশ্চিত করতে চাইছেন। এই নির্বাচনের ফল ব্রাজিলের পাশাপাশি লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতেও নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে

পূর্বের খবরবঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’: উপকূলে বাড়ছে বৃষ্টির আশঙ্কা
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!