বেসরকারি বিনিয়োগ ও রপ্তানি কমে যাওয়া, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার কারণে দেশে দারিদ্র্য এবং আয়বৈষম্য দুই-ই বেড়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’-এর অক্টোবর ২০২৬ সংস্করণে দেশের অর্থনীতির এই সার্বিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ‘মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনটি আজ মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশের কাছাকাছি স্থবির থাকতে পারে, যা বিগত এক দশকের গড় প্রবৃদ্ধির (৫ দশমিক ৬ শতাংশ) তুলনায় অনেক কম।
প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগে স্থবিরতা
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। এর আগের ২০২২-২৩ অর্থবছরে যা ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং পরবর্তী দুই অর্থবছরে যথাক্রমে ৪ দশমিক ২ ও ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নামে। গত অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি নেমেছিল ২ দশমিক ২ শতাংশে, যা করোনা মহামারির পর সর্বনিম্ন।
প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে মূলধনি বিনিয়োগের সংকোচনকে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। গত অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ ০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ০ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে পণ্য ও সেবার প্রকৃত রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।
উন্নয়ন ব্যয় কমার পেছনে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়নে ঐতিহাসিক ধীরগতি, বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর পুনর্মূল্যায়ন এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার ঘাটতিকে দায়ী করা হয়েছে।
ব্যাংক খাতে রেকর্ড খেলাপি ঋণ ও ঝুঁকিপূর্ণ তারল্য
ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অন্যতম গুরুতর ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেছে বৈশ্বিক এই উন্নয়ন সংস্থাটি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে। বিশেষ করে ইসলামি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে তা ৪৩ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছায়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক মূলধন পর্যাপ্ততার হার (সিএআর) নেমে দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে, যেখানে আন্তর্জাতিক ন্যূনতম হার ১০ শতাংশ।
এ ছাড়া চলতি বছরের জুনে ব্যক্তি ও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে, যা গত ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। তবে একই সময়ে সরকারের ব্যাংক ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক মনে করে, সরকার অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ নেওয়ায় বেসরকারি খাত ঋণপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং বিনিয়োগ সংকুচিত হচ্ছে।
২৪ লাখে পৌঁছাল দারিদ্র্য, মূল্যস্ফীতির চাপ
টানা চতুর্থ বছরের মতো দেশে জাতীয় দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মডেল অনুযায়ী, গত এক বছরে আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে নতুন প্রায় ২১ লাখ মানুষ।
গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭ শতাংশে নামলেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় উঁচুতে অবস্থান করছে। আগস্ট মাসে কম আয়ের শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি ঋণাত্মক পর্যায়ে চলে গেছে, ফলে তাঁদের ক্রয়ক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সরকারের বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও তা প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে পৌঁছাতে পারছে না এবং অনেক সচ্ছল পরিবার সুবিধা পাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে ঘাটতি
জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ২ শতাংশে। গত অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন ০ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে, যা মহামারির পর শিল্প খাতের প্রথম সংকোচন।
গ্যাস ও বিদ্যুতের অপ্রতুলতার কারণে বেশ কিছু কারখানা উৎপাদন ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে, কর্মঘণ্টা কমিয়েছে কিংবা কর্মী ছাঁটাই করেছে। স্থবির অর্থনীতির প্রভাবে শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে; বিশেষ করে শিল্প ও সেবা খাতে চাকরি হারিয়ে অনেক নারী শ্রমবাজার থেকে ছিটকে পড়েছেন।
আশার আলো প্রবাসী আয়, কমেছে এফডিআই
অর্থনীতির সামগ্রিক চাপের মধ্যেও ইতিবাচক ধারা বজায় রেখেছে প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স)। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে এর বিপরীতে নিট বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) ১৫ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে, এবং নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ কমেছে ৭০ দশমিক ৩ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের তিন সুপারিশ
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে অবিলম্বে সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক:
১. ব্যাংক খাত: দ্রুত সম্পদের মান পর্যালোচনা শেষ করা, দুর্বল ব্যাংক নির্ধারণ করে ব্যাংকের মালিকদের লোকসানের দায় বহন নিশ্চিত করা এবং পর্যায়ক্রমে নিয়ন্ত্রক ছাড় তুলে নেওয়া।
২. জ্বালানি খাত: দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও এলএনজি অবকাঠামো জোরদার করা এবং বিদ্যুৎ কেনায় স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র বজায় রাখা।
৩. রাজস্ব খাত: করনীতি ও কর প্রশাসনকে পৃথক করা, কর ফাঁকি রোধ করা এবং ঢালাও করছাড় কমিয়ে আনা।




