ভিনিউজ ডেস্ক: সরকারবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ফ্রান্স। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারের বিভিন্ন নীতির প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছেন শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাজধানী প্যারিস, নিস, লিলসহ একাধিক শহর ও অঞ্চলে আংশিক কারফিউ এবং রাতের বেলায় জনসমাগমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ফরাসি প্রশাসন। সপ্তাহান্তে বিক্ষোভের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি কঠোর অবস্থান নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সোমবার থেকে কার্যকর হওয়া বিধিনিষেধ অনুযায়ী, প্যারিসের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা প্লাস দে লা রিপাবলিক এবং লে আল এলাকায় রাত ১১টা থেকে পরদিন ভোর ৬টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হয়েছে। এসব সময়ে সাধারণ মানুষের চলাচল ও জমায়েতের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ফ্রান্সের কয়েকটি অঞ্চলে রাত ৮টার পর বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের নিস ও মার্সেই শহরেও আংশিকভাবে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। লিলসহ অন্যান্য শহরেও পরিস্থিতি বিবেচনায় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের প্রধান অভিযোগ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাপন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। বাড়িভাড়া, খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও দৈনন্দিন সেবার ব্যয় বৃদ্ধির চাপে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ দিশেহারা। শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। এসব অসন্তোষ একত্র হয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। আন্দোলনকারীরা সরকারের কাছে কার্যকর পদক্ষেপ এবং সাধারণ মানুষের আর্থিক চাপ কমানোর দাবি জানাচ্ছেন।
সপ্তাহান্তে বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের তীব্রতা বাড়লে কোথাও কোথাও সংঘাত ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। জননিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষার বিষয়টি সামনে রেখে প্রশাসন রাতের বেলায় চলাচল ও জমায়েত সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরিস্থিতির কারণে জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের ফ্রান্স ভ্রমণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। পর্যটন নির্ভর অর্থনীতির জন্য এটি নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে প্যারিস, নিস ও মার্সেইয়ের মতো জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে বিক্ষোভের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে ফ্রান্সের বাইরেও ইউরোপের কয়েকটি দেশে বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। আলবেনিয়ায় সরকারবিরোধী আন্দোলনের একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা একটি পুলিশ স্টেশনে আগুন ধরিয়ে দেন। এ ঘটনায় দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সোমবার প্রধানমন্ত্রী এডি রামা বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেন, আন্দোলনের নামে সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি লেখেন, ‘প্রতিবাদ করা মানুষের অধিকার। কিন্তু অশান্তি ছড়ানো অপরাধ।’
অন্যদিকে, ইতালির মিলানেও সপ্তাহান্তে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দাঙ্গাসদৃশ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি কারফিউ জারির বিষয়টি বিবেচনা করছেন বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সরকারের প্রতি অসন্তোষ জনমনে চাপ তৈরি করছে। ফ্রান্স, আলবেনিয়া ও ইতালির সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই অসন্তোষেরই বহিঃপ্রকাশ। তবে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের পাশাপাশি জনগণের অর্থনৈতিক সংকট নিরসনে সরকারগুলো কতটা কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারে, তার ওপরই পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে।
সূত্র: এপি, এএফপি, ডিপিএ ও রয়টার্স।




