ডয়েসে ভেলে প্রতিবেদন : যুদ্ধে বেশি বিপর্যস্ত আফগান শরণার্থী ও দরিদ্র ইরানিদের জীবন

 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকে ইরানে বসবাসরত হাজার হাজার আফগান শরণার্থী স্বদেশে ফেরার চেষ্টা করছে৷ এ পর্যন্ত, কতজন ফিরতে পেরেছে তার প্রকৃত সংখ্যা এখনো জানা যায়নি৷

হেরাত প্রদেশের ইসলাম কালা সীমান্ত পারাপার অঞ্চলে ইরান থেকে ফেরা আফগানদের সঙ্গে কথা বলছেন আফগানিস্তানে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর প্রতিনিধি আরাফাত জামাল ।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, চলমান যুদ্ধের কারণে ইরানের অভ্যন্তরে ৩২ লক্ষ মানুষ অস্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে৷ এই ৩২ লক্ষ মানুষ আনুমানিক ছয় লক্ষ থেকে ১০ লক্ষ পরিবারের সদস্য বলেও জানিয়েছে ।

ইসলাম কালা-র মতো সীমান্ত পারাপারের এলাকায় প্রতিদিনই আসছে অনেক আফগান শরণার্থীর পরিবার৷ ইরানের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে সীমান্তে পৌঁছানো ক্লান্ত মানুষদের নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করছেন মাঠ পর্যায়ের সাংবাদিকরা৷

৪৮ বছর বয়সি মোহাম্মদ কবির নাজারি গত ১১ মাস তেহরানে নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে কাজ করেছেন৷ বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি বলেন, ২০২৫ সালের জুনে যে ১২ দিনের যুদ্ধ হয়েছিল সেই সময় রাজধানী তেহরানে যে হামলাগুলো দেখেছেন সাম্প্রতিক সময়ের হামলাগুলো তার চেয়ে ‘৫০ গুণ খারাপ’৷ তেহরানে নিজের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে মোহাম্মদ কবির নাজারি আরো বলেন, ‘‘প্রতিদিন, চারদিক থেকে রকেট আসছিল,” তিনি বলেন৷ সেখানে আফগানদের জন্য কোনও সুরক্ষা ছিল না৷ পরিস্থিতি খুবই খারাপ ছিল৷”

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক তহবিল ইউনিসেফ জানাচ্ছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে শিশুরা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছে৷ অনেক পরিবার আফগানিস্তানের এমন এলাকায় ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছে, যেখানে সম্পদ খুব সীমিত৷এ কারণে সেখানে বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি এবং নিরাপত্তাহীনতা দ্রুত বাড়তে পারে, বিশেষ করে কম বয়সি শিশুদের পাশাপাশি অন্তঃসত্ত্বা ও স্তন্যদায়ী নারীদেররও অপুষ্টি এবং রোগ-ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে৷

গত ১০ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে আফগানিস্তানে ইউনিসেফের প্রতিনিধি ড. তাজুদ্দিন ওয়েওয়ালে বলেন, ‘‘ইসলাম কালা দিয়ে ফিরে আসা পরিবারগুলো এমন জনগোষ্ঠীর মাঝে চলে যাবে, যেখানে মৌলিক পরিষেবাগুলোর সুবিধা এমনিতেই কম৷” তিনি আরো বলেন, ‘‘ফিরে আসা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লে শিশু এবং তাদের পরিবার যেসব স্বাস্থ্য, পুষ্টি, পানি, শিশু সুরক্ষা পরিষেবার উপর নির্ভরশীল, সেগুলোর উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে৷”

ইউনিসেফ আরো সতর্ক করে বলেছে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি সরবরাহ-শৃঙ্খলকে বাধাগ্রস্ত করছে, যার ফলে মৌলিক পরিষেবাগুলো পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে৷ এ কারণে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুরা প্রায়ই সময়মতো জীবন রক্ষাকারী খাবার বা পথ্যও পায় না বলেও জানিয়েছে ইউনিসেফ৷

হেরাত প্রদেশের ইসলাম কালা সীমান্ত পারাপার অঞ্চল দিয়ে ইরান থেকে দেশে ফিরছেন কয়েকজন আফগান হেরাত প্রদেশের ইসলাম কালা সীমান্ত পারাপার অঞ্চল দিয়ে ইরান থেকে দেশে ফিরছেন কয়েকজন আফগান
উনিসেফ আরো সতর্ক করে বলেছে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি সরবরাহ-শৃঙ্খলকে বাধাগ্রস্ত করছে, যার ফলে মৌলিক পরিষেবাগুলো পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে৷ এ কারণে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুরা প্রায়ই সময়মতো জীবন রক্ষাকারী খাবার বা পথ্যও পায় না বলেও জানিয়েছে ইউনিসেফ৷
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকে অনেকে আফগান শরণার্থী না পারছেন নিশ্চিন্তে সেখানে থাকতে, না পারছেন নির্ভয়ে নিজের দেশে ফিরতে৷

নেদারল্যান্ডসভিত্তিক সংস্থা এডাব্লিউএ লিগ্যাল অ্যান্ড সোশাল ফাউন্ডেশনের প্রধান জাহরা সেপের ডয়চে ভেলেকে বলেন, তেহরানে আটকা পড়া আফগান শরণার্থীদের মধ্যে যাদের সেখানে থাকার বৈধ কাগজপত্র নেই, তারা শহর ছেড়ে যেতে পারছেন না৷

স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, তেহরান ছাড়তে গেলে ধরে নিতে হবে যে, কেউ-না-কেউ রাস্তায় আটকাবে এবং বেশ কয়েকবার তল্লাশির মুখোমুখি হতে হবে৷ পথে আর কেউ না থাকলেও ইরান সরকারের প্রতি অত্যন্ত অনুগত স্বেচ্ছাসেবীদের সংগঠন বাসিজ আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যরা থাকবেই৷

এডাব্লিউএ লিগ্যাল অ্যান্ড সোশাল ফাউন্ডেশনের প্রধান জাহরা সেপের জানান, ইরানে আটকে পড়ায় ‘‘নারী অধিকার কর্মী, মানবাধিকার কর্মীদের পাশাপাশি একা থাকছেন এমন নারী ও কম বয়সি মেয়েদের ওপর বিশেষভাবে (যুদ্ধের) প্রভাব পড়ছে৷” তিনি আরো জানান, তাদের অনেকেই জরুরি সহায়তার জন্য তার সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন৷ নিরাপত্তা হুমকির কারণে, তারা আফগানিস্তানে ফিরতে পারছেন না, বাধ্য হয়ে তারা ইরানে অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে জীবনযাপন করছেন৷

হেরাত প্রদেশের ইসলাম কালা সীমান্তের চেকপোস্টে আফগানদের পাসপোর্ট পরীক্ষা করছেন তালেবান নিরাপত্তা কর্মীরা ।হেরাত প্রদেশের ইসলাম কালা সীমান্তের চেকপোস্টে আফগানদের পাসপোর্ট পরীক্ষা করছেন তালেবান নিরাপত্তা কর্মীরা আফগানিস্তানে ইউনিসেফের প্রতিনিধি ড. তাজুদ্দিন ওয়েওয়ালে বলেন, ‘‘ইসলাম কালা দিয়ে ফিরে আসা পরিবারগুলো এমন জনগোষ্ঠীর মাঝে চলে যাবে, যেখানে মৌলিক পরিষেবাগুলোর সুবিধা এমনিতেই কম৷’
ইরানের বড় বড় শহরগুলোতে এখনো অনেকেই নিজের নাম, প্রকাশ করতে চাচ্ছেন না৷ এমন পরিস্থিতিতেও অবৈধভাবে কাজ করছেন তারা৷ প্রায়ই কম বেতনের চাকরি, যেমন, পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা ছোট ওয়ার্কশপ বা টেক্সটাইল কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন৷

প্রাণ যায় বেসামরিক নাগরিকের, ধ্বংস হয় অবকাঠামো

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস ইন ইরান (এইচআরএএনএ)-র তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানে মোট এক হাজার ২৭৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে৷ এক হাজার ২৭৬ জনের মধ্যে কমপক্ষে ২০৫ জন শিশু৷ এছাড়া নিহতদের মধ্যে ১৯৭ জন সামরিক বাহিনীর সদস্য৷ অবশিষ্ট ৩৫২ জনের পরিচয় না জানায় তারা বেসামরিক নাগরিক, নাকি সামরিক বাহিনীর সদস্য সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি৷

২৮ ফেব্রুয়ারিতে ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল৷ তারপর থেকে হামলা-পাল্টা হামলার ধরন বদলালেও যুদ্ধবিরতির কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি৷

ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ইরান বিষয়ক প্রতিনিধিদলের চেয়ারপার্সন হান্না নিউমান ডয়চে ভেলেকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘‘ইইউর উচিত বেসামরিক অবকাঠামোতে যেন সামরিক হামলা না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করা৷”

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্রের পানির লবণাক্ততা দূর করার প্ল্যান্ট ধ্বংসের ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি এ কথা বলেন৷ হামলায় ধ্বংস হওয়া প্ল্যান্টটি ২০টির মতো গ্রামে পানীয় জল সরবরাহ করতো৷

পূর্বের খবরহাদির হত্যাকারীদের পালাতে ‘সহায়তাকারী’ ফিলিপ সাংমাও পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তার
পরবর্তি খবরত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু, রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ৫০ ঘণ্টা আলোচনা