ডয়েসে ফেলে প্রতিবেদন : ইরান যুদ্ধ হতে পারে বিশ্বব্যাপী তীব্র খাদ্য সংকটের কারণ

 

বিশেষ প্রতিবেদন : ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-র ট্যাঙ্কার কিভাবে চলাচল করবে সেই চিন্তায় সারা বিশ্বই এখন নিমজ্জিত৷ এমন দুশ্চিন্তা খুবই স্বাভাবিক, কারণ, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিশ্বের অন্যান্য এলাকায় অপরিশোধিত তেল এবং এলএনজির মোট রপ্তানির প্রায় এক পঞ্চমাংশ ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ এ জলপথের ওপর নির্ভরশীল৷

তবে যে পণ্য পরিবহণ আরো শঙ্কার মুখে, তা হলো সার৷ প্রায় সারা বিশ্বের খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে এর একটা সম্পর্ক আছে৷ অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন এবং সৌদি আরবের মতো আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর খাদ্য আমদানিও এর ওপর নির্ভরশীল৷

সিগনাল গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, অ্যামোনিয়া, ফসফেট এবং সালফারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সারের বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যের ২০% উপসাগরীয় দেশগুলোর নির্ভরশীল৷ব্লুমবার্গ ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় অর্ধেক ইউরিয়া যায় উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে, যার মধ্যে এক-দশমাংশ যায় কাতার থেকে৷

গত সপ্তাহে ইরানের হামলার পর বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি এবং সারের কেন্দ্রস্থল রাস লাফান- এ উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে কাতারএনার্জি৷ এর ফলে লক্ষ লক্ষ টন সারের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে৷

করোনা মহামারি এবং রাশিয়া ইউক্রেনের শস্য রপ্তানির জন্য ব্যবহৃত কৃষিজমি এবং বন্দর দখল করার পর গত ছয় বছরের মধ্যে ইরানের কারণে যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা তৃতীয় বড় ঝুঁকির হুমকি৷ ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সারের দাম ১০ থেকে ৩০% বেড়েছে৷ তবে রাশিয়ার ট্যাঙ্ক ইউক্রেনে প্রবেশের পরের সপ্তাহগুলোর তুলনায় এখনো অবশ্য তা প্রায় ৪০% কম৷

সারের ঘাটতি ফসল উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে

জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলন আঙ্কটাড-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সারের ঘাটতি দেখা দিলে বৈশ্বিক ফসল উৎপাদনে তার ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে৷ প্রতি মাসে হরমুজ দিয়ে প্রায় ১.৩৩ মিলিয়ন টন সার রপ্তানি করা হয়৷ তাই ৩০ দিন হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখা হলে ভুট্টা, গম এবং চালের মতো নাইট্রোজেননির্ভর ফসলের ঘাটতি এবং ফলনের ঝুঁকি বাড়তে পারে৷

ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইএফপিআরআই)-এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো জোসেফ গ্লাউবার ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘উচ্চ মূল্য ফসল নির্বাচনের বিষয়টিকে প্রভাবিত করবে৷”

তিনি মনে করেন, ‘‘এর ফলে কৃষকরা খুব বেশি নাইট্রোজেন সার দরকার হয় এমন ফসল বাদ দিয়ে কম নাইট্রোজেন সার লাগে এমন ফসল বেছে নিতে পারেন৷” গ্লাউবার আরো মনে করেন, সারের ঘাটতি তীব্র হলে বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলোর কৃষকরা এমনকি সামগ্রিক সারের ব্যবহার কমিয়েও দিতে পারেন, যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ফসলের উৎপাদন৷

বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালী যত বেশি দিন বাণিজ্যিক পরিবহন থেকে দূরে থাকবে, বিশ্বব্যাপী সার সরবরাহ তত বেশি ব্যাহত হবে এবং তাতে সংকটও বাড়তে থাকবে৷

ডাচ ব্যাংক আইএনজি চলতি মাসের শুরুতে এক গবেষণা প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেছে, ‘‘(সরবরাহের) দীর্ঘস্থায়ী ব্যাঘাত ব্রাজিল, ভারত, দক্ষিণ এশিয়া এবং ইইউর কিছু অংশের মতো আমদানিনির্ভর অঞ্চলে সারের প্রাপ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করবে৷”

রাশিয়া, চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং মরক্কোর মতো দেশেরও সার উৎপাদনের ক্ষমতা সীমিত৷ সুতরাং সেসব দেশেও খাদ্য উৎপাদনে সংকট দেখা দিতে পারে৷ চীন ইতিমধ্যে ফসফেট এবং নাইট্রোজেন সার আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে৷ ইরান যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের চাপ বাড়তে পারে৷

 

তেলের প্রভাব খাদ্যপণ্য, কৃষি যন্ত্রপাতি, ফসল পরিবহনকারী ট্রাক থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্ট পর্যন্ত সবকিছুতেই পড়তে পারে৷

যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে ডিজেলের দাম গত দুই সপ্তাহে ১৪% বেড়ে প্রতি গ্যালনের দাম ৪.৬৯ ডলারে পৌঁছেছে৷ জার্মানিতে ডিজেলের দাম মাত্র কয়েক দিনে এক-পঞ্চমাংশ বেড়ে প্রতি লিটার ২.১০ ডলার ছাড়িয়েছে৷ চীন, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উপসাগরীয় তেলের সিংহভাগের আমদানিকারক এশীয় দেশেও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে৷

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা গত সপ্তাহে ব্লুমবার্গকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সতর্ক করে বলেছেন, এক বছর জ্বালানির দামে ১০% বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি ০.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে এবং এর ফলে বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ০.২% পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে৷

আমদানিনির্ভর দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে

ইরান যুদ্ধের কারণে ভারত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তদের কাতারে রয়েছে, কারণ, তারা তাদের নাইট্রোজেন সার আমদানির দুই-তৃতীয়াংশের জন্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল৷ তার মধ্যে ইউরিয়ার একটি বড় অংশও রয়েছে৷ সারের ঘাটতি দেখা দিলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে পর্যাপ্ত রোপণ শঙ্কার মুখে ফেলবে, পরিণামে তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাবে চাল, গম এবং ১৪৫ কোটি মানুষের অন্যান্য প্রধান খাদ্যপণ্যের উৎপাদন খরচ৷

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কৃষি রপ্তানিকারক দেশ ব্রাজিল নাইট্রোজেন চাহিদার প্রায় ৪০% পায় উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে৷ সার সরবরাহ ব্যাহত হলে দক্ষিণ আমেরিকার দেশটিতে সয়া এবং ভুট্টার উৎপাদন বড় হুমকির মুখে পড়বে৷

ব্লুমবার্গ বলছে, যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই ইরানে মুদ্রাস্ফীতি ৪০%-এরও বেশি ছিল৷ এখন খাদ্যের দাম আরো বেড়েছে৷ আমদানি, জ্বালানি খরচ এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ইরানে মুদ্রাস্ফীতি আরো বাড়াতে পারে এবং সেরকম হলে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে দুর্দশা আরো ব্যাপকভাবে বাড়তে পারে৷
সাব সাহারান আফ্রিকাও এই মুহূর্তে গুরুতর ঝুঁকির মুখোমুখি৷ আফ্রিকার অনেক দেশের কৃষকরা ফলনের জন্য প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কম সার ব্যবহার করেন৷ তাই সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও ক্ষুদ্র চাষীদের সারের ব্যবহার আরো কমাতে বাধ্য করতে পারে৷ তাতে ফসলের ক্ষতিবৃদ্ধি এবং খাদ্যসংকট আরো তীব্র করতে পারে৷

ইরান যুদ্ধের কারণে ইরানও পড়তে পারে মহাসংকটে৷ ব্লুমবার্গ বলছে, যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই ইরানে মুদ্রাস্ফীতি ৪০%-এরও বেশি ছিল৷ এখন খাদ্যের দাম আরো বেড়েছে৷ আমদানি, জ্বালানি খরচ এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ইরানে মুদ্রাস্ফীতি আরো বাড়াতে পারে এবং সেরকম হলে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে দুর্দশা আরো ব্যাপকভাবে বাড়তে পারে৷

উপসাগরীয় দেশগুলো প্রয়োজনীয় খাদ্যের ৮০ থেকে ৯০%-ই আমদানি করে৷ শস্য, মাংস থেকে শুরু করে দুগ্ধ এবং উদ্ভিজ্জ তেল – সবই আছে সেই তালিকায়৷ এসব পণ্যের জন্য উপসাগরীয় দেশগুলো হরমুজ প্রণালীর ওপরই নির্ভরশীল৷

 

পূর্বের খবরঢাকার সন্ধ্যায় বজ্রসহ শিলাবৃষ্টি
পরবর্তি খবরখারগ দ্বীপে শক্তিশালী বোমা হামলা চালালো যুক্তরাষ্ট্র, তেলের স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা