চিকিৎসায় নোবেল: স্নায়ুকোষ নিয়ন্ত্রণের রহস্য ভেদ করে তিন বিজ্ঞানীর বাজিমাত

আলোর সাহায্যে জীবিত মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ এবং মানব মস্তিষ্কের জটিল রহস্য উন্মোচনের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী অবদানের জন্য এ বছর চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিন বিজ্ঞানী। সুইডেনের কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের নোবেল অ্যাসেমব্লি গতকাল সোমবার এ মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের বিজয়ী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের একজন ও জার্মানির দুজন গবেষকের নাম ঘোষণা করে। পুরস্কারপ্রাপ্ত তিন বিজ্ঞানী হলেন যুক্তরাষ্ট্রের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও স্নায়ুবিজ্ঞানী কার্ল ডাইসেরথ এবং জার্মানির বিজ্ঞানী পিটার হেগেমান ও গেওর্গ নাগেল। এমন অর্জনে বিস্ময় ও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তারা জানিয়েছেন, এ বিশেষ সম্মাননা তাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের।

বিজয়ী তিন বিজ্ঞানী নোবেল পুরস্কার বাবদ মোট ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা (প্রায় ৯ লাখ পাউন্ড বা ১২ লাখ মার্কিন ডলার) অর্থ পুরস্কার পাবেন। নোবেল কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তিন বিজয়ী এ মোট পুরস্কারের অর্থ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেবেন।

কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের নোবেল অ্যাসেমব্লির ঘোষণায় বলা হয়েছে, অপ্টোজেনেটিক্স ও লাইট-গেটেড আয়ন চ্যানেল সংক্রান্ত আবিষ্কারের স্বীকৃতি হিসেবে এ বছর তিন বিজ্ঞানীকে যৌথভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। পদ্ধতিটি সম্পর্কে নোবেল অ্যাসেমব্লির জেনারেল সেক্রেটারি থমাস পার্লম্যান জানান, অপ্টোজেনেটিক্সের মাধ্যমে জীবিত মস্তিষ্কের একক স্নায়ুকোষের কার্যক্রম চালু বা বন্ধ (অন বা অফ) করা সম্ভব হয়। এ প্রযুক্তিতে শৈবাল থেকে পাওয়া একটি বিশেষ প্রোটিন ব্যবহার করে আলোর সাহায্যে কোষের বৈদ্যুতিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা হয়। গবেষণাটির সূচনা হয়েছিল ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে, যখন পিটার হেগেমান চ্যানেলরোডোপসিন নামক শৈবালের ওপর কাজ করে আলোর প্রতি প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন। পরবর্তী সময়ে গেওর্গ নাগেল ব্যাঙের ডিমে শৈবালের জিন ইনজেক্ট করে চ্যানেলরোডোপসিন-২ আবিষ্কার করেন, যা আলোতে খুলতে পারে। ২০০৩ সালে তারা জানান, আলো ব্যবহার করে মানব ও হ্যামস্টার কোষে বৈদ্যুতিক স্পন্দন তৈরি সম্ভব। এরপর ২০০৫ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্ল ডাইসেরথ ইঁদুরের স্নায়ুকোষে প্রযুক্তিটি সফলভাবে প্রয়োগ করেন এবং এর এক বছর পর এ পদ্ধতির নাম দেওয়া হয় অপ্টোজেনেটিক্স।

বর্তমানে অপ্টোজেনেটিক্স চিকিৎসা শাস্ত্রে ব্যাপক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা রোগের কারণে দৃষ্টিশক্তি হারানো মানুষদের ক্ষেত্রে চোখে আলোকসংবেদী প্রোটিন যুক্ত করে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে। পাশাপাশি ককলিয়ার ইমপ্লান্ট উন্নত করে কানের শ্রবণ স্নায়ুকে আরও নিখুঁতভাবে উদ্দীপিত করার গবেষণাও এগিয়ে চলেছে।

ঐতিহ্যগতভাবে ফিজিওলজি বা চিকিৎসাবিজ্ঞানে পুরস্কারজয়ীদের নাম ঘোষণার মধ্য দিয়েই প্রতি বছর নোবেল পুরস্কারের সূচনা হয়। সেই রীতি মেনে গতকাল সোমবার ঘোষণা করা হয় চিকিৎসাবিজ্ঞানে চলতি বছর নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীদের নাম। এর ধারাবাহিকতায় আগামী ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, সাহিত্য, শান্তি ও অর্থনীতি এবারের নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে।

পুরস্কারের অংশ হিসেবে একটি করে ডিপ্লোমা, স্বর্ণপদক এবং প্রায় ১২ লাখ ডলারের চেক দেওয়া হয়। কোনো বিভাগে একাধিক বিজয়ী থাকলে পুরস্কারের অর্থ ভাগাভাগি করে নেন।

১৮৯৫ সালে সুইডিশ উদ্ভাবক ও শিল্পপতি আলফ্রেড নোবেলের ইচ্ছাপত্র বা উইলের ভিত্তিতে সৃষ্ট এ পুরস্কার প্রথম দেওয়া শুরু হয় ১৯০১ সালে। রয়্যাল ফ্যামিলির উপস্থিতিতে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মাধ্যমে আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আগামী ১০ ডিসেম্বর সুইডেনের স্টকহোমে বিজয়ী বিজ্ঞানীদের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে এ পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।

পূর্বের খবরহত্যা মামলায় সাবেক এমপি নাঈমুজ্জামান ভূঁইয়া গ্রেপ্তার
পরবর্তি খবরপূজার আগে শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!