বিশেষ ফিচার :
ভিনিউজ ডেস্ক: চাঁদের দক্ষিণ মেরুকে ঘিরেই এত দিন মহাকাশ গবেষণার পরিকল্পনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে এসেছেন বিজ্ঞানীরা। সেখানে বরফের আকারে পানির অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা এবং সূর্যের আলো না পৌঁছানো স্থায়ী ছায়াচ্ছন্ন গহ্বরগুলো গবেষণার জন্য বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করেছে। তবে এবার চাঁদে মানুষের গবেষণার পরিধি আরও বিস্তৃত করার প্রস্তাব সামনে এসেছে। দক্ষিণ মেরুর বাইরে চাঁদের আরও চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে গবেষণাকেন্দ্র ও ঘাঁটি গড়ে তোলার সম্ভাবনা দেখছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের আশা, এসব জায়গায় দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা শুধু চাঁদের অজানা ইতিহাস উন্মোচন করবে না, ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর প্রস্তুতিকেও এগিয়ে নেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাকাডেমিস অব সায়েন্সেস, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড মেডিসিনের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে চাঁদের চারটি সম্ভাবনাময় অঞ্চল চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো ভাবা ক্রেটার, মোনস হ্যাডলি, ওরিয়েন্টাল বেসিন এবং অ্যারিস্টারকাস প্লেটো। প্রতিটি অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য আলাদা। ফলে সেখানে গবেষণার মাধ্যমে চাঁদের জন্ম, গঠন, আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ এবং মহাকাশের প্রতিকূল পরিবেশে মানুষের বসবাসের নানা দিক সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া সম্ভব।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চাঁদে গবেষণার ক্ষেত্র শুধু পানি অনুসন্ধান বা বসতি স্থাপনের উপযোগিতা যাচাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। বরং চাঁদকে ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানের পরীক্ষাগার হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে মঙ্গল অভিযানে নভোচারীদের দীর্ঘ সময় মহাকাশে অবস্থান, বিকিরণ মোকাবিলা, খাদ্য উৎপাদন এবং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার প্রযুক্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে চাঁদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চারটি স্থানের মধ্যে ভাবা ক্রেটার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চাঁদের পৃথিবী থেকে আড়ালে থাকা অংশে অবস্থিত এই অঞ্চল থেকে প্রাচীন শিলার নমুনা সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে। এসব শিলা পরীক্ষা করে চাঁদের প্রাথমিক ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি পৃথিবীর বেতার সংকেতের বাধা থেকে তুলনামূলকভাবে মুক্ত থাকায় সেখানে রেডিও ও অপটিক্যাল জ্যোতির্বিদ্যার গবেষণারও বিশেষ সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে, অ্যাপোলো ১৫ অভিযানের অবতরণস্থলের কাছাকাছি অবস্থিত মোনস হ্যাডলি। এই অঞ্চলে চাঁদের পৃষ্ঠে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা যন্ত্রপাতির অবস্থা পরীক্ষা করে মহাকাশের প্রতিকূল পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। সৌর বিকিরণ ও মহাকাশের আবহাওয়ার প্রভাব এবং চাঁদের মাটি কীভাবে বিকিরণ থেকে সুরক্ষা দিতে পারে, তা নিয়েও পরীক্ষা চালানোর সুযোগ রয়েছে।
ওরিয়েন্টাল বেসিন চাঁদের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বিশাল কোনো সংঘর্ষের ফলে সৃষ্টি হওয়া এই অববাহিকায় চাঁদের অভ্যন্তরীণ স্তরের শিলা উন্মুক্ত অবস্থায় রয়েছে। ফলে চাঁদের গভীরের গঠন, বিভিন্ন স্তরের উপাদান এবং প্রাচীন সংঘর্ষের ইতিহাস সম্পর্কে গবেষকদের নতুন ধারণা দিতে পারে এই অঞ্চল।
অন্যদিকে, অ্যারিস্টারকাস প্লেটো চাঁদের আগ্নেয়গিরির ইতিহাস অনুসন্ধানের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। একসময় চাঁদের অভ্যন্তর থেকে কীভাবে ম্যাগমা বেরিয়ে এসে পৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড়েছিল, কোথায় লাভা জমা হয়েছিল এবং কীভাবে ভূপ্রকৃতির পরিবর্তন ঘটেছিল, তা এখানে গবেষণা করে বোঝা সম্ভব। এ অঞ্চলে মহাকাশের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্র স্থাপনেরও সম্ভাবনা রয়েছে।
পার্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যানিয়েল ডাম্বাচের মতে, এসব অঞ্চলে গবেষণার মাধ্যমে চাঁদের মাটিতে উদ্ভিদ জন্মানোর সম্ভাবনাসহ ভবিষ্যৎ মানববসতির বিভিন্ন দিক পরীক্ষা করা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের কাছে চাঁদ এখন আর কেবল পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ নয়; এটি হয়ে উঠছে গভীর মহাকাশ অভিযানের প্রস্তুতিকেন্দ্র। সেখানে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান, খাদ্য ও পানির ব্যবস্থা, বিকিরণ থেকে সুরক্ষা এবং নতুন প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাই করা গেলে মঙ্গল অভিযানের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। ফলে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর বাইরেও গবেষণার নতুন ক্ষেত্র খুঁজে বের করার এই উদ্যোগ ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিতে পারে।




