জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গঠিত বোর্ড অব পিস বা শান্তি পরিষদ গাজা পুনরুদ্ধারের জন্য ২ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এই অর্থ ছয় মাসে ৬৬টি কর্মসূচিতে ব্যয় করা হবে। এর মধ্যে থাকবে—আবাসন, ডিজেলচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন, বর্জ্য অপসারণসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাত। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
তবে বোর্ড স্বীকার করেছে, এখনো বড় অঙ্কের অনুদান প্রয়োজন। এ পর্যন্ত ১৮ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেলেও বাস্তবে হস্তান্তর করা হয়েছে মাত্র ২৮০ মিলিয়ন ডলার। বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, আগামী এক দশকে গাজার পূর্ণ পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনে প্রায় ৭১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে।
বোর্ড অব পিসের বর্ধিত অংশ ‘গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ডে’র সদস্য এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার স্বীকার করেছেন, প্রকল্পটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা ধরনের বিলম্বের মুখে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে, বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের বিলম্ব হয়েছে।’ বোর্ডের সদস্য ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের বৈঠকে কুশনার বলেন, ‘আজকের মূল লক্ষ্য ছিল আসলে আপনাদের দেখানো যে, এটি বাস্তবায়নে আমরা পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
নিউইয়র্কে তাঁর সঙ্গে ছিলেন মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। তিনি বলেন, গত এক বছরে এই গোষ্ঠী ‘বাস্তব অগ্রগতি’ করেছে। উইটকফ আরও বলেন, ‘সব জিম্মি বাড়ি ফিরে গেছে। একটি যুদ্ধবিরতি রয়েছে, সেটি যতই অসম্পূর্ণ হোক না কেন, এটি এখনো কার্যকর আছে। মানবিক প্রচেষ্টা ঐতিহাসিক ফলাফল অর্জন করেছে। জরুরি প্রয়োজন মেটানো এবং পুনরুদ্ধারের দীর্ঘমেয়াদি কাজকে সমর্থন করার জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অনুদান দেওয়া ও দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে।’
তবে তহবিল সংগ্রহের পাশাপাশি পরিকল্পনাটিকে আরও বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে গাজায় কাজ করা ব্যক্তিদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থার সংস্কার কীভাবে করা হবে এবং ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের মধ্যে কীভাবে ঐকমত্য তৈরি করা হবে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বুধবার পৃথক এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘বেশ কয়েকটি দেশ এগিয়ে এসে আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, বোর্ড ‘আরও দেশকে এতে অংশ নেওয়ার জন্য আগ্রহী।’
বোর্ড অব পিসের ইসরায়েলি-আমেরিকান সদস্য মাইকেল আইজেনবার্গ বিবিসির ‘নিউজআওয়ার’ অনুষ্ঠানে পরবর্তী পদক্ষেপগুলো কী হতে পারে, তা ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ‘এটি যেহেতু একটি যুদ্ধক্ষেত্র, তাই প্রথমে অবিস্ফোরিত অস্ত্র সরিয়ে ফেলতে হবে। এরপরও গাজার মাটির নিচে শত শত কিলোমিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গ রয়েছে, সেগুলোও ধ্বংস করতে হবে।’ আইজেনবার্গ বলেন, ‘এসব কাজ শেষ হওয়ার পর গাজার মানুষ আবার পুনর্গঠনের কাজে ফিরতে পারবেন। তা হতে পারে আবাসন নির্মাণ, উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো।’
আগস্টে ‘বোর্ড অব পিস’-এর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিকোলায় ম্লাদেনভ গাজায় ইসরায়েলের চলমান বিমান হামলার পাশাপাশি হামাসের কর্মকাণ্ডেরও সমালোচনা করেছিলেন। আগস্টে ম্লাদেনভ সতর্ক করে বলেছিলেন, গত বছরের অক্টোবরে শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়লে তা এই অঞ্চলের জন্য ‘ফিরে আসার পথহীন এক পরিস্থিতি’ তৈরি করবে।
গাজায় হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১ হাজার ৩৮১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৩০০ শিশু রয়েছে। জাতিসংঘ এই পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য বলে মনে করে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে তাদের পাঁচজন সেনা যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। এছাড়া ‘অপারেশনাল দুর্ঘটনায়’ একজন ঠিকাদার নিহত হয়েছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছরের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে যৌথভাবে যে ২০ দফা গাজা শান্তি পরিকল্পনা প্রকাশ করেছিলেন, তার অংশ হিসেবেই ‘বোর্ড অব পিস’ গঠন করা হয়। গাজায় আটক থাকা অবশিষ্ট ৪৮ জিম্মিকে ইসরায়েলি কারাগারে থাকা ফিলিস্তিনি বন্দি ও গাজার আটক ব্যক্তিদের বিনিময়ে মুক্তি দিতে হামাস সম্মত হয়েছিল। পাশাপাশি গাজার শাসনভার ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটদের হাতে তুলে দেওয়ার ধারণাতেও তারা সম্মতি জানিয়েছিল।
জুলাইয়ে হামাস বলেছিল, তারা গাজাকে নিরস্ত্রীকরণের একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর আওতায় তারা নিজেদের অস্ত্র সমর্পণ করবে, তবে শর্ত ছিল ইসরায়েলকে ‘সব ধরনের আগ্রাসন’ বন্ধ করতে হবে এবং গাজা থেকে নিজেদের বাহিনী প্রত্যাহার করতে হবে।
তবে পরে নেতানিয়াহু এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, হামাসকে ‘সত্যিকার অর্থে’ নিরস্ত্রীকরণ না করা পর্যন্ত ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গাজায় অবস্থান করবে। প্রথমদিকে ধারণা করা হয়েছিল, ‘বোর্ড অব পিস’ হবে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, যার উদ্দেশ্য গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। তবে পরে এর পরিধি বাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংঘাতকেও এর আওতায় আনা হয়।




