ইসরায়েলের নির্বাচন: ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াইয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে নেতানিয়াহু

জয়ন্ত আচার্য
সিনিয়র সাংবাদিক -গবেষক

আন্তর্জাতিক সংবাদ বিশ্লেষণ

ভিনিউজ ডেস্ক

ইসরায়েলের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিয়েছে ২৭ অক্টোবরের জাতীয় নির্বাচন। ভোটের প্রাথমিক চিত্রে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের ক্ষমতার ভিত যে দুর্বল হয়েছে, তার স্পষ্ট আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরও এখন পর্যন্ত সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি। ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টা পর্যন্ত পাওয়া আন্তর্জাতিক সংবাদ অনুযায়ী, নির্বাচনে কোনো পক্ষেরই নিরঙ্কুশ বিজয় আসেনি। ফলে ইসরায়েলে ক্ষমতার পরিবর্তন হবে, নাকি রাজনৈতিক অচলাবস্থা আরও দীর্ঘায়িত হবে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রধান আলোচ্য বিষয় ।

রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), আল জাজিরা এবং ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের পর প্রকাশিত বুথফেরত জরিপে নেতানিয়াহুর জোট ৫০ থেকে ৫২টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরের সম্ভাব্য আসন ৫১ থেকে ৫৩। ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। অর্থাৎ দুই শিবিরের কেউই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের অবস্থানে নেই।

এপি জানিয়েছে, বুধবার ভোরে ভোট গণনার প্রায় ৪০ শতাংশ শেষ হওয়ার পর নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি পেয়েছে ২১ দশমিক ৭০ শতাংশ ভোট এবং আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টি পেয়েছে ১৫ দশমিক ৭২ শতাংশ । তবে ফলাফল আংশিক গণনার তথ্য; চূড়ান্ত আসনসংখ্যা নয়।

ইসরায়েল হায়োমের ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনী বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পূর্ণাঙ্গ সরকারি ফল প্রকাশের সম্ভাব্য তারিখ ৪ নভেম্বর। তবে তার আগেই ভোট গণনার অগ্রগতি থেকে কোন দল বা জোট এগিয়ে রয়েছে, সে সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে। পূর্ণাঙ্গ ফল প্রকাশের পরও সরকার গঠনের জন্য রাজনৈতিক আলোচনা চলবে। এপি জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন সেই নেতাকে, যাঁর পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাকে সরকার গঠনের জন্য ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত সময় দেওয়া হতে পারে। ব্যর্থ হলে অন্য কাউকে সুযোগ দেওয়া অথবা নতুন নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ফলে ৪ নভেম্বরের পরও ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তা নির্ধারণে কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে।

রয়টার্সের বিশ্লেষণে এবারের নির্বাচনকে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের ওপর জনগণের আস্থার পরীক্ষা হিসেবে দেখা হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতা, গাজায় দীর্ঘ সামরিক অভিযান, জিম্মিদের মুক্তি, ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্য, সবকিছুই ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।

বিরোধীদের অভিযোগ, ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতার রাজনৈতিক দায় নেতানিয়াহু এড়িয়ে যেতে পারেন না। তার দীর্ঘ শাসনামলে ইসরায়েল নিরাপদ হয়নি; বরং দেশটি একাধিক যুদ্ধ ও আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। বিচারব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে বিতর্ক এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ বিভাজনও তাঁর জনপ্রিয়তায় চাপ সৃষ্টি করেছে।

অন্যদিকে নেতানিয়াহুর সমর্থকদের যুক্তি, ইরান ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। তারা মনে করেন, বর্তমান অস্থিতিশীল আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে অভিজ্ঞ নেতৃত্বের বিকল্প নেই। নেতানিয়াহুও নির্বাচনের পর শক্তিশালী ডানপন্থী সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। আইজেনকোট বলেছেন, জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে এবং নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান হওয়া উচিত।

আল জাজিরার বিশ্লেষণে নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নেতানিয়াহুর দল একক দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি আসন পেতে পারে, কিন্তু সেটি সরকার গঠনের নিশ্চয়তা নয়। ইসরায়েলের সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী নির্ধারিত হয় দলগুলোর জোট ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে। তাই সবচেয়ে বড় দল হওয়া এবং সরকার গঠন করতে পারাদুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।

এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সম্ভাব্য সাফল্য। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বুথফেরত জরিপে তাদের সম্মিলিত আসন ১৭ থেকে ১৮ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। টাইমস অব ইসরায়েল বলেছে, এটি আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর জন্য উল্লেখযোগ্য নির্বাচনী অগ্রগতি।

এই আসনগুলো বিরোধী শিবিরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সমস্যা হলো, আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন কয়েকটি দল আরব দলগুলোর সঙ্গে সরাসরি সরকার গঠনের বিষয়ে রাজনৈতিক আপত্তি জানিয়েছে। অন্যদিকে নেতানিয়াহুও আরব দলগুলোর সমর্থননির্ভর সরকার গঠনের বিরোধিতা করেছেন। ফলে যে দলগুলো সরকার গঠনে নির্ণায়ক ভূমিকা রাখতে পারে, তাদের সঙ্গে জোটের প্রশ্নেই দুই পক্ষের রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।

এখানে একটি সম্ভাবনা রয়েছে, আরব দলগুলো সরাসরি সরকারে যোগ না দিয়েও বিরোধী শিবিরকে বাইরে থেকে সমর্থন দিতে পারে অথবা সংসদে অনুপস্থিত থেকে সরকার গঠনের পথ সহজ করতে পারে। তবে এ ধরনের সমঝোতা কতটা বাস্তবসম্মত, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এ কারণেই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, নির্বাচনে নেতানিয়াহুবিরোধী ভোট বেশি হলেও তাঁর বিকল্প সরকার গঠন করা সহজ হবে না।

নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৮ অক্টোবর প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুর পুনর্নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নেন। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে নেতানিয়াহুর ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি তার প্রতি সমর্থন জানান। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এই সমর্থনকে নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

কিন্তু ট্রাম্পের সমর্থন নির্বাচনী সমীকরণ পাল্টে দিতে পারেনি। এপি জানিয়েছে, নির্বাচনের ফল নিয়ে ট্রাম্পও সতর্ক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তার বক্তব্যে নেতানিয়াহুর ভালো করার ইঙ্গিত থাকলেও ফলাফল সম্পর্কে আগাম সিদ্ধান্ত না দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট ছিল।

ওয়াশিংটনের কাছে নেতানিয়াহু শুধু একজন মিত্র নন; ইরান, গাজা, লেবানন ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কৌশলে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ কেবল একজন নেতার ওপর নির্ভরশীল নয়। নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালেও ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক, গোয়েন্দা ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় থাকার সম্ভাবনাই বেশি। তবে নতুন সরকার এলে গাজা যুদ্ধ, ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং আঞ্চলিক কূটনীতির কৌশলে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে।

বাংলাদেশের মানুষের কাছে ইসরায়েলের নির্বাচন নিছক একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঘটনা নয়। গাজায় দীর্ঘ যুদ্ধ, বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, শিশুদের দুর্ভোগ, বাস্তুচ্যুতি এবং ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রীয় অধিকার নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ ও সংহতি রয়েছে। এ কারণে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বাংলাদেশের জনপরিসরেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ মনে করে, গাজায় মানবিক বিপর্যয়ের জন্য নেতানিয়াহু সরকারের রাজনৈতিক ও সামরিক নীতির জবাবদিহি হওয়া প্রয়োজন। তবে একই সঙ্গে এটিও গুরুত্বপূর্ণ যে, ইসরায়েলের সরকার পরিবর্তন হলেই ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ইসরায়েলের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ এবং গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর মতপার্থক্য রয়েছে।

বাংলাদেশের সরকারি অবস্থান ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে। তাই নতুন ইসরায়েলি সরকার গঠিত হলে ফিলিস্তিন প্রশ্নে তাদের নীতি কী হবে, সেটিও বাংলাদেশের মানুষের আগ্রহের বিষয় হয়ে থাকবে।

সব মিলিয়ে, এবারের নির্বাচন নেতানিয়াহুর তাৎক্ষণিক বিদায় নিশ্চিত করেনি, আবার তার ক্ষমতায় থাকার পথও নিরাপদ রাখেনি। ৪ নভেম্বরের সম্ভাব্য পূর্ণাঙ্গ ফল প্রকাশ, পরবর্তী জোট আলোচনা এবং প্রেসিডেন্টের সরকার গঠনের উদ্যোগ ইসরায়েলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে। সমঝোতা না হলে নতুন নির্বাচনও অসম্ভব নয়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ইসরায়েলের জনগণ কি নিরাপত্তা ও যুদ্ধের রাজনীতিকে অগ্রাধিকার দেবে, নাকি নেতৃত্বের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায় শুরু করবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি, ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ এবং যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক কৌশলের ওপরও প্রভাব ফেলবে।

পূর্বের খবরভুয়ো তথ্য ও অনলাইন হেনস্থার অভিযোগে সাইবার অপরাধ দমন শাখার দ্বারস্থ বিজয়-রশ্মিকা
error

Enjoy this blog? Please spread the word :)

RSS
Follow by Email
Copy link
URL has been copied successfully!