ভিনিউজ ডেস্ক : গত বছর ভারতে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তটি তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল এককভাবে নিয়েছিলেন বলে জানিয়েছে এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি। দীর্ঘ কয়েক মাসের তদন্ত শেষে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ২২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তিন সদস্যের কমিটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলোচনা বা পরামর্শ করা হয়নি।
ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব একেএম ওয়ালিউল্লাহ, জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমন এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীরকে নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি বিভিন্ন ক্রিকেটার, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) বর্তমান সভাপতি তামিম ইকবাল এবং কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলেছে। তবে তৎকালীন বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল এবং ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে কমিটি।
নিরাপত্তা শঙ্কার কারণ দেখিয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে ভারতে অনুষ্ঠেয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলকে পাঠানো হয়নি। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের চারটি ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল—তিনটি কলকাতায় এবং একটি মুম্বাইয়ে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় বিসিবি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের কাছে ভেন্যু পরিবর্তনের অনুরোধ করেছিল। আইসিসি সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করার পর বাংলাদেশ দলকে ভারতে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। বিসিবিও সরকারি সিদ্ধান্ত মেনে নেয়।
তদন্ত কমিটির সদস্য একেএম ওয়ালিউল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে বিসিবিকে চিঠি দিয়ে বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছিল। সে সময় আসিফ নজরুল ক্রীড়া উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকায় চিঠিটি তার নির্দেশেই দেওয়া হয়েছিল বলে ধরে নেওয়া যায়। কমিটির আরেক সদস্য ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর আরও স্পষ্ট করে বলেন, প্রতিবেদনে যে একজন ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, তিনি তৎকালীন ক্রীড়ার দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রিকেটাররা বিশ্বকাপ খেলার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। তদন্ত কমিটির মত, নিরাপত্তা ও অন্যান্য বাস্তবতা বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল। কোনো একক ব্যক্তির ইচ্ছায় এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া সমীচীন নয়। ক্রিকেটারদের ভবিষ্যৎ এবং দেশের কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর প্রত্যাশাকেও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আসিফ নজরুলের বক্তব্যের মধ্যেও অসঙ্গতি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ২২ জানুয়ারি তিনি জানিয়েছিলেন, নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকারই ক্রিকেট দলকে ভারতে পাঠাচ্ছে না। কিন্তু ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রীয় মাঠ উন্নয়নে বিসিবির অনুদান প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি দাবি করেন, বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিসিবি ও ক্রিকেটাররা। সেই সিদ্ধান্তের কোনো অনুশোচনা বা প্রশ্নের সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেছিলেন তিনি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এই দুই বক্তব্যের পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে।
তদন্ত কমিটি অবশ্য সরাসরি কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার বদলে ভবিষ্যতের জন্য বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। ক্রিকেটকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা, বিসিবিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও স্বাধীনতা দেওয়া, সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রশাসনিক বা কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে ভবিষ্যতে যেন কোনো ক্রিকেটার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে খেলোয়াড়দের স্বার্থ, ক্রিকেটের বাস্তবতা এবং দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের প্রত্যাশাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তদন্ত কমিটি।
সব মিলিয়ে তদন্ত প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য হলো-বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তটি ক্রিকেটার বা বিসিবির স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত ছিল না; তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টার নির্দেশে ক্রীড়া মন্ত্রণালয় বিসিবিকে দল না পাঠানোর কথা জানিয়েছিল এবং বিসিবি সেই সরকারি নির্দেশই পালন করেছিল।




