নিজস্ব প্রতিবেদক
ভিনিউজ : উজানের ভারী বৃষ্টিপাত ও দেশের ওপর সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আবারও বন্যার শঙ্কায় পড়েছে দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও কিছু মধ্যাঞ্চল। ইতোমধ্যে সিলেট ও সুনামগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর দুটি পয়েন্টে পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানিও বিপদসীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। এতে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামসহ অন্তত পাঁচ জেলার নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে কুশিয়ারা নদীর পানি ইতোমধ্যেই বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পাশাপাশি সুরমা নদীর ছাতক এবং মৌলভীবাজারের শেরপুরে কুশিয়ারা নদী সতর্কসীমায় রয়েছে। আগামী তিন দিনে এসব নদীর পানি আরও বাড়তে পারে এবং নতুন কয়েকটি স্থানে বিপদসীমা অতিক্রম করার সম্ভাবনা রয়েছে।
উত্তরাঞ্চলেও পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বাড়তে থাকায় সংশ্লিষ্ট এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, এখনো কোনো নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম না করলেও ভারতের আসামে অব্যাহত ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। একই ধরনের তথ্য দিয়েছে রংপুর ও গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডও।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ব্রহ্মপুত্র-যমুনার পানি বাড়লেও তা আপাতত বিপদসীমা অতিক্রম করার সম্ভাবনা কম। তবে আগামী কয়েক দিন নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে এবং নিম্নাঞ্চলের চর ও তীরবর্তী এলাকায় পানি ঢুকে পড়তে পারে।
চলতি মাসের শুরুতেই গাইবান্ধার চরাঞ্চল বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছিল। গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে চলে যায়। এবারও একই ধরনের পরিস্থিতির আশঙ্কায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি ইতোমধ্যে প্রস্তুতি সভা করেছে।
বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী পাঁচ দিনে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকার নদীগুলোর পানি আরও বাড়বে। একই সময়ে গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার নদীগুলোর পানিও বৃদ্ধি পেলেও সেগুলো বিপদসীমা অতিক্রম করার সম্ভাবনা কম।
এদিকে নওগাঁর আত্রাই ও ছোট যমুনা নদীর পানি কিছুটা কমলেও কয়েকটি পয়েন্টে এখনো সতর্কসীমায় রয়েছে। নেত্রকোনার কলমাকান্দায় সোমেশ্বরী নদী বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে জামালপুর ও বগুড়ার কিছু এলাকায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানি সতর্কসীমার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে, ফলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
রাজধানী ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর মধ্যে ধলেশ্বরীর পানি কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও টঙ্গী খালের পানি স্থিতিশীল রয়েছে। আগামী তিন দিনে এসব নদীর অবস্থার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই।
অন্যদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী পাঁচ দিন দেশের প্রায় সব বিভাগেই বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে। মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে প্রবল অবস্থায় থাকায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির পাশাপাশি কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে। বিশেষ করে রংপুর বিভাগে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে, যা উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীর পানি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
দক্ষিণাঞ্চলেও অস্বাভাবিক জোয়ারের কারণে কয়েকটি জেলার চরাঞ্চল, রাস্তাঘাট ও হাটবাজার প্লাবিত হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, রোববার পর্যন্ত জোয়ারের এই প্রভাব অব্যাহত থাকতে পারে।
উল্লেখ্য, চলতি মাসের শুরুতে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবানসহ অন্তত সাতটি জেলা ভয়াবহ বন্যার মুখে পড়ে। পাহাড়ধস ও বন্যাজনিত বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ৫৮ জনের প্রাণহানি ঘটে। সেই অভিজ্ঞতার পর নতুন করে বৃষ্টি ও উজানের ঢলের পূর্বাভাসকে কেন্দ্র করে ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নদীর পানির উচ্চতা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে এবং স্থানীয় প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।




